আব্বাসি খেলাফতকালে বাগদাদ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। জ্ঞানের চর্চা ও বিকাশে নগরীটির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর উজ্জ্বল উদাহরণ বাগদাদের বিখ্যাত লাইব্রেরি বায়তুল হিকমাহ (হাউস অব উইজডম)। গ্রিক, ফারসি ও ভারতীয় জ্ঞানভান্ডারের সঙ্গে আরবি ভাষাভাষী পণ্ডিতদের পরিচয় ঘটাতে এবং প্রাচীন জ্ঞান সংরক্ষণ ও বিকাশে এই প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
স্বর্ণযুগে যুসলিম বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও আধুনিক জ্ঞানচর্চার ভিত্তি হিসেবে বাইতুল হিকমাহ তাই অনন্য এক নাম।
ইতিহাস ও ক্রমবিকাশ : বায়তুল হিকমাহর ইতিহাস জানতে হলে ফিরে যেতে হয় আব্বাসি খলিফা আলমানসুরের শাসনামলে। ৭৬২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বাগদাদকে আব্বাসি খেলাফতের নতুন রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। খলিফা আলমানসুর রাজকীয় গ্রন্থ সংগ্রহ ও পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। এই উদ্যোগই পরবর্তী সময়ে বায়তুল হিকমাহর বিকাশের ভিত্তি গড়ে দেয়।
খলিফা হারুনুর রশিদের (৭৮৬-৮০৯ খ্রিষ্টাব্দ) শাসনামলে রাজকীয় গ্রন্থাগারের সংগ্রহ আরো সমৃদ্ধ হয়। সাহিত্য, দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন গ্রন্থ সেখানে সংরক্ষিত হতে থাকে। পারস্যের সাহিত্য, উপকথা ও জ্যোতির্বিদ্যাবিষয়ক রচনা আরবিতে অনুবাদের উদ্যোগও গুরুত্ব পায়। ফলে রাজকীয় গ্রন্থাগারটি ধীরে ধীরে জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
বায়তুল হিকমাহর ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় খলিফা আলমামুনের শাসনামল (৮১৩-৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দ)। তার পৃষ্ঠপোষকতায় অনুবাদ, দর্শন, গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা বিশেষ গতি লাভ করে। গ্রিকসহ বিভিন্ন ভাষার বিজ্ঞান ও দর্শনের গ্রন্থ আরবিতে অনূদিত হয়। বিদ্বানেরা এসব গ্রন্থ অধ্যয়ন, বিশ্লেষণ ও গবেষণার সুযোগ পান।
বায়তুল হিকমাহর অর্জন ও অবদান : বায়তুল হিকমাহর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে জ্ঞানচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—অনুবাদ আন্দোলন। এ সময় গ্রিক দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের বহু গ্রন্থ আরবিতে অনূদিত হয়। ভারতীয় গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার জ্ঞানও আলেমদের গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করে। এভাবে প্রাচীন সভ্যতার জ্ঞানভান্ডার সংরক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি তা নতুন গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার পথও খুলে দেয়।
এই যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আলখাওয়ারিজমি। বীজগণিতের বিকাশে তার অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তার নামের লাতিন রূপ থেকেই ‘অ্যালগরিদম’ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানেও তার কাজ পরবর্তী গবেষকদের প্রভাবিত করে।
এছাড়া বনু মুসা ভ্রাতৃত্রয়—মুহাম্মদ, আহমদ ও হাসান গণিত ও যন্ত্রপ্রকৌশলের বিকাশে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। চিকিৎসক ও অনুবাদক হুনায়ন ইবনে ইসহাক গ্রিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ আরবিতে অনুবাদ করেন। সাবিত ইবনে কুররা ও আলকিন্দির মতো মনীষীরাও অনুবাদ, দর্শন, গণিতসহ বিজ্ঞানের নানা শাখায় অবদান রাখেন।
বায়তুল হিকমাহর সঙ্গে যুক্ত বৃহত্তর জ্ঞানচর্চার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বিভিন্ন সভ্যতার জ্ঞানকে একত্র করা। পণ্ডিতেরা শুধু প্রাচীন গ্রন্থ অনুবাদ করেই থেমে থাকেননি; তারা সেগুলোর ব্যাখ্যা, সমালোচনা, পর্যালোচনা ও সম্প্রসারণ করেছেন। এর ফলে গণিত, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও দর্শনের মতো বিষয়গুলোয় নতুন চিন্তার বিকাশ ঘটে। পরবর্তী সময়ে আরবি ভাষায় সংরক্ষিত ও বিকশিত বহু জ্ঞান ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয় এবং ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসকে প্রভাবিত করে।
ধ্বংস : বায়তুল হিকমাহর প্রভাব বাগদাদের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। জ্ঞানচর্চা, গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা ও অনুবাদের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। আন্দালুসের কর্ডোবা, টলেডো এবং মিসরের কায়রোর মতো নগরীও বিভিন্ন সময়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। কায়রোতে ১০০৫ খ্রিষ্টাব্দে ফাতিমি খলিফা আলহাকিম দারুল হিকমাহ প্রতিষ্ঠা করেন। আরবি থেকে লাতিনসহ অন্যান্য ভাষায় গ্রন্থ অনুবাদের মাধ্যমে প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় জ্ঞান ইউরোপের পাঠক ও গবেষকদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়।
তবে খলিফা আলমামুনের মৃত্যুর পর বায়তুল হিকমাহর কার্যক্রম কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সীমিত। আব্বাসি প্রশাসনের কেন্দ্র সামারায় স্থানান্তরিত হওয়ার পর বাগদাদের রাজকীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থানেও পরিবর্তন আসে। বায়তুল হিকমাহর গুরুত্ব ও কার্যক্রম সময়ের সঙ্গে বদলে গেলেও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্ঞানচর্চা ও অনুবাদ আন্দোলন অব্যাহত ছিল।
১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে মোঙ্গল শাসক হালাকু খানের বাহিনী বাগদাদ আক্রমণ করে। নগরীতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হয়, বহু মানুষ নিহত হন এবং অসংখ্য গ্রন্থাগার ও পাণ্ডুলিপি ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হয়। এই আক্রমণ মুসলিম বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে এক গভীর বিপর্যয় সৃষ্টি করে। বায়তুল হিকমাহর চূড়ান্ত ধ্বংসের সঙ্গে এ ঘটনার সম্পর্ক বহুল প্রচলিত হলেও প্রতিষ্ঠানটির শেষ পরিণতি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক তথ্য পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
বায়তুল হিকমাহর অস্তিত্ব আজ আর নেই। কিন্তু জ্ঞানচর্চা, অনুবাদ ও গবেষণার ইতিহাসে এর স্মৃতি আজও অম্লান। এর ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জ্ঞানের অগ্রযাত্রা কোনো একক সভ্যতার অর্জন নয়; বরং বিভিন্ন সভ্যতার জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও চিন্তার পারস্পরিক আদান-প্রদানের মধ্য দিয়েই তা সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। অতীতের জ্ঞানভান্ডার সংরক্ষণ, তাকে নতুন চিন্তা ও গবেষণার আলোকে সমৃদ্ধ করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মধ্যেই নিহিত রয়েছে একটি সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ভিত্তি। বায়তুল হিকমাহর গৌরবময় ইতিহাস তাই কেবল অতীতের অর্জন স্মরণের উপলক্ষ নয়; বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যও এক তাৎপর্যপূর্ণ প্রেরণা। সেই ঐতিহ্যের প্রকৃত উত্তরাধিকার বহন করতে হলে শিক্ষা, বিজ্ঞান, গবেষণা ও মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার প্রসারে আমাদেরও হতে হবে সচেষ্ট।