১৪৭২ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত বিদরের মাহমুদ গাওয়ানের মাদরাসার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এটি চরিত্রগতভাবে বেশ বিদেশি (অনন্য) এবং পার্সি ব্রাউনের মতে, এটি সরাসরি পারস্য বা ইরানি স্থাপত্য দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। ‘২০৫ ফুট বাই ১৮০ ফুট আয়তনের একটি আয়তাকার স্থান জুড়ে অবস্থিত এই মাদরাসার ঠিক মাঝখানে একটি ঐতিহ্যবাহী চতুষ্কোণ আঙিনা রয়েছে, যা থেকে এর চারপাশের হলরুম এবং কক্ষগুলোয় যাওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়েছে।’ [Percy Brown : Indian Architecture (Islamic Period), p. 70]
বাংলার অন্যান্য মাদরাসার মতো এটিও ইট-নির্মিত কাঠামো ছিল। এগুলোর কোনো সাধারণ বা একই উৎস ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। দিল্লির খিরকি (আনুমানিক ১৩৭৫ খ্রিষ্টাব্দ) এবং কালান (১৩৮০ খ্রিষ্টাব্দ) মসজিদ দুটিও মাদরাসা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, এই দুটি মসজিদই জাফর খান গাজীর মসজিদের মতো ছাদ-ঢাকা বহু-গম্বুজবিশিষ্ট (multi-domed) মসজিদ ছিল এবং এই তিনটি মসজিদই মাদরাসা হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
গৌড়ের (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) দরসবাড়ী মাদরাসার নকশা বা প্ল্যান বিবেচনা করে অনেকে মন্তব্য করেছেন, এর উৎপত্তি হয়েছিল বাংলার ‘বিহার’ (বৌদ্ধ বিহার) স্থাপত্যশৈলী থেকে। তবে এর বিপরীতে কিছু বিনীত যুক্তি বা মতামত নিচে দেওয়া হলো।
ক. মাদরাসায় মসজিদের (নামাজ পড়ার) ব্যবস্থা থাকে, কিন্তু বিহারগুলোতে এমন কোনো ব্যবস্থা বা আয়োজন নেই।
খ. বিহার ও মাদরাসার কোনাকৃতির কক্ষগুলোর (corner rooms) সজ্জা ও বিন্যাস সম্পূর্ণ আলাদা।
গ. বিহারে বারান্দা থাকে, কিন্তু মাদরাসাগুলোয় সাধারণত কোনো বারান্দা থাকে না।
ঘ. বিহারের কক্ষগুলো দেব-দেবীর মূর্তি বা প্রতীক রাখার কাজে ব্যবহৃত হতো, অন্যদিকে মাদরাসায় এই কক্ষগুলো আবাসিক উদ্দেশ্যে (থাকা-খাওয়ার জন্য) ব্যবহৃত হয়।
ঙ. বিহারগুলোয় বিভিন্ন ভাস্কর্য বা মূর্তি ব্যবহার করা হতো, কিন্তু মাদরাসাগুলোয় লতাপাতা (floral) ও জ্যামিতিক নকশার অলংকরণ ব্যবহার করা হয়।
চ. দরসবাড়ী মাদরাসার পোড়ামাটির (terracotta) ত্রিপত্র খিলানযুক্ত (trefoil arched) অলংকরণগুলোর সঙ্গে মধ্য এশিয়ার তোমান আগা (১৪০৫ খ্রিষ্টাব্দ) এবং শিরিন বিবি আগার (১৩৮৫ খ্রিষ্টাব্দ) সমাধিসৌধের গ্লেজড টালির (glazed tiles) নকশার মিল রয়েছে। নেত্রকোনা জেলার রোয়াইলবাড়ির গ্লেজড টালিতেও একই ধরনের অলংকরণ দেখতে পাওয়া যায়।
ছ. সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া মুসলিম বিশ্বজুড়েই এই উঠান বা আঙিনাভিত্তিক (courtyard type) মাদরাসার নকশা দেখতে পাওয়া যায়। সুতরাং এদিক থেকে দরসবাড়ী মাদরাসা কোনো ব্যতিক্রমী বিষয় নয়।
উপরিউক্ত পরিস্থিতিতে মঙ্গোল আক্রমণের পর যে মুসলিমরা এই দেশে অভিবাসী হিসেবে এসেছিলেন। তাদের আদি জন্মভূমির দিকে দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে। সেই অঞ্চলে এখনো অনেক প্রাচীন মাদরাসা (ছাদ-ঢাকা এবং আঙিনা-ভিত্তিক—উভয় প্রকারেরই) রয়ে গেছে। বিশ্বজুড়ে মুসলিম স্থাপত্যের একটি সাধারণ ও নিজস্ব ভাষা রয়েছে। মনে করা হয়, মধ্য এশিয়ার মাদরাসাগুলোর উৎপত্তি হয়েছিল সেখানকার বৌদ্ধ বিহার অথবা প্রাচীন ঘরবাড়ি থেকে। বার্টোল্ড (Bartol’d) প্রথম তত্ত্বটির (বৌদ্ধ বিহার থেকে উৎপত্তি) এবং আন্দ্রে গোদার্দ (Andre Godard) দ্বিতীয় তত্ত্বটির (প্রাচীন ঘরবাড়ি থেকে উৎপত্তি) প্রবক্তা। তবে মহানবীর (সা.) ঘর, যা একটি ‘দার’ (বাড়ি বা আঙিনা) থেকে তৈরি হয়েছিল, সেটিকেও এই মাদরাসাগুলোর আদি রূপ বা প্রোটোটাইপ (prototype) হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। মহানবীর (সা.) ঘর সম্পর্কে ক্রেসওয়েল (Creswell) লিখেছেন, “তাই তিনি (মুহাম্মদ) নিজের জন্য একটি বাসস্থান বা ‘দার’ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। সেই সময়ে আরবে ‘দার’ বলতে এমন কিছু ছোট ছোট কক্ষের সমষ্টিকে বোঝাত, যেগুলো কোনো একটি খোলা উঠান বা আঙিনাকে কেন্দ্র করে বেশ অনিয়মিত এবং এলোমেলোভাবে একসঙ্গে গড়ে উঠত। এই আঙিনাটি পরিবারের সদস্যসংখ্যা ও সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে কম-বেশি প্রশস্ত হতো। পরিবার ছোট হলে কক্ষগুলো সব একপাশে সারিবদ্ধ করা থাকত; কারণ একজন আরবের ব্যক্তিগত জীবনের জন্য চারদিক থেকে ঘেরা একটি ব্যক্তিগত আঙিনার প্রয়োজন হতো। সেখানে নারীরা বিভিন্ন গৃহস্থালি কাজ—যেমন বুনন, রান্না, ধোয়া-মোছা প্রভৃতি করতেন এবং কুকুর, গাধা ও হাঁস-মুরগির মতো গৃহপালিত পশু-পাখিও রাখা হতো। আঙিনার বাকি অংশটি একটি দেয়াল দিয়ে ঘেরা থাকত। এভাবে আঙিনাটি ছিল পরিবারের সবার মিলনস্থল এবং এই উপাদানগুলোর পারস্পরিক সংযোগ এতটাই নিবিড় ছিল যে, বাইরে যাওয়ার জন্য কেবল একটিমাত্র দরজা থাকত। বিয়ে বা পুত্র ও ভাতিজাদের জন্মের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেয়াল ঘেঁষে আরো নতুন কক্ষ তৈরি করা হতো। একপর্যায়ে পরিবারের ক্রমাগত বৃদ্ধির কারণে যখন সব ফাঁকা জায়গা অতিরিক্ত ভবনে ভরে যেত, তখন একটি নতুন ‘দার’ তৈরি করার প্রয়োজন হতো। এই ব্যবস্থাটি, যা আজও আরব, সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়ার অনেক দরিদ্র গ্রামে বিদ্যমান, মুহাম্মদ (সা.) গ্রহণ করেছিলেন। কারণ সেই সময়ে তিনি পরিবারের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির প্রত্যাশা করছিলেন এবং ফলস্বরূপ তার এমন একটি বড় আকারের ‘দার’ প্রয়োজন ছিল, যা কেবল তার নিজের স্ত্রীদের জন্যই নয়, বরং তার কন্যাসন্তান এবং তাদের স্বামীদের থাকার জন্যও যথেষ্ট বড় হয়।”
এ প্রসঙ্গে মাদরাসার উৎপত্তি এবং বিকাশ সম্পর্কে আরো বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতে পারে। এটি অত্যন্ত আগ্রহের একটি বিষয় যে, মহানবীর (সা.) মৃত্যুর পর কয়েক শতাব্দী পার হওয়ার আগে এবং আরব বিশ্বের মতো কোনো নিকটবর্তী স্থানে না হয়ে, মাদরাসা একটি পৃথক ভবন হিসেবে গড়ে উঠেছিল মধ্য এশিয়ার মতো একটি দূরবর্তী অঞ্চলে। এর আগে আরব বিশ্বে মাদরাসার জন্য কোনো আলাদা ভবন তৈরি করা হয়নি। উল্টো এটি তার উৎপত্তিস্থল (মধ্য এশিয়া) থেকে মধ্যপ্রাচ্যে আমদানি বা স্থানান্তরিত হয়েছিল। তাই এটি মহানবীর (সা.) ঘর কিংবা কোনো আদি মসজিদের (prototype mosque) প্রভাবের ফসল—এই দাবির বিরুদ্ধে যে কেউ যুক্তিসংগতভাবে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে নিচের যুক্তিগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে—
১. মুসলমানরা হজ ও অন্যান্য উদ্দেশ্যে বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ করতেন। তারা হয়তো সেই আদি বা মূল ধারার মসজিদগুলো লক্ষ করেছিলেন এবং সে অনুযায়ী মধ্য এশিয়ায় মাদরাসা নির্মাণ করেছিলেন।
২. মুসলমানরা নিজেদের ধর্মীয় উপাসনালয় বা ভবন নির্মাণের জন্য অন্য জাতির ধর্মীয় স্থাপত্য অনুকরণ করেননি। ইসলাম ধর্মে কোনো ক্ষেত্রেই অন্য ধর্মের অনুসারীদের অনুকরণ করার অনুমতি নেই। মহানবী (সা.) অন্য ধর্মের লোকদের অনুকরণ করার বিষয়ে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। সুতরাং তারা হয়তো বৌদ্ধ ধর্মীয় স্থাপত্যের নকল করেননি; বরং এর বিপরীতে মহানবীর (সা.) ঘর কিংবা কোনো আদি মসজিদের নকশাই অনুসরণ করেছিলেন।