বাংলার ইতিহাসের কথা উঠলে আমাদের মনে আসে ধান, মসলিন, নদী কিংবা সোনার বাংলার প্রাচুর্যের কথা। আর এই বাংলারই আরেকটি পরিচয় ইতিহাসের আড়ালে পড়ে থাকে। সেটি হলো জাহাজ নির্মাণ শিল্প। একসময় বাংলার নদী ও সমুদ্রবন্দর ঘিরে গড়ে উঠেছিল জাহাজ নির্মাণের এক সমৃদ্ধ শিল্প। চট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপের কারিগরদের তৈরি জাহাজ শুধু বাংলার নদী ও বঙ্গোপসাগরেই চলাচল করত না; এর খ্যাতি ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যপথ পেরিয়ে দূর পশ্চিম এশিয়াতেও পৌঁছেছিল।
নদী, সমুদ্র, বন ও দক্ষ কারিগর—এই চার উপাদানের সমন্বয়ে বাংলায় জাহাজ নির্মাণ শিল্পের বিকাশ ঘটেছিল। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার অসংখ্য শাখা-প্রশাখা বাংলার জনপদগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। নদী ছিল যোগাযোগ ও বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম। আবার এসব নদী বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে। ফলে অভ্যন্তরীণ নৌপথ ও আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের মধ্যে বাংলার একটি স্বাভাবিক সংযোগ গড়ে উঠেছিল।
এর সঙ্গে যুক্ত ছিল পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার বনজ সম্পদ। সুন্দরবনসহ বিভিন্ন বনাঞ্চল থেকে পাওয়া শক্ত ও টেকসই কাঠ ছিল জাহাজ নির্মাণের প্রধান কাঁচামাল। জাহাজ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় মালসামান নদীপথে সহজেই স্থানে পরিবহন করা যেত। ফলে বাংলার ভূগোল ও প্রাকৃতিক সম্পদই জাহাজশিল্পের বিকাশে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছিল।
ইবনে বতুতার চোখে বাংলা
চৌদ্দ শতকে বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য ও নৌ-অর্থনৈতিক গুরুত্বের একটি মূল্যবান সাক্ষ্য পাওয়া যায় মরক্কোর বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতার বিবরণে। ১৩৪৬ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তিনি বাংলায় এসে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছান। তার ভ্রমণবৃত্তান্তে বাংলার প্রাকৃতিক সম্পদ, বাণিজ্য ও জনজীবনের নানা চিত্র উঠে এসেছে।
ইবনে বতুতার চট্টগ্রাম সফর থেকে এ অঞ্চলের বন্দর ও সমুদ্রবাণিজ্যের গুরুত্বও বোঝা যায়। চট্টগ্রাম তখন বঙ্গোপসাগরীয় বাণিজ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। অন্যদিকে সোনারগাঁ নদী ও সমুদ্রপথের সংযোগের কারণে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
তখন বঙ্গোপসাগর ছিল বৃহত্তর ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারত ও আরব বিশ্বের বাণিজ্যিক যোগাযোগের সঙ্গে বাংলা যুক্ত ছিল। চীনা জাঙ্ক, আরব জাহাজ এবং স্থানীয় নৌযান এ বিস্তৃত বাণিজ্যপথে চলাচল করত।
ফেদেরিচির বিবরণে চট্টগ্রাম
ষোলো শতকে বাংলার বন্দর ও জাহাজ চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য পাওয়া যায় ভেনিসীয় বণিক সিজার ফেদেরিচির (Cesare Federici) ভ্রমণবৃত্তান্তে। ১৫৬৩ থেকে ১৫৮১ সালের মধ্যে পূর্বদেশে ভ্রমণকালে তিনি বাংলার সাতগাঁও, বেতড় ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যান।
১৫৬৭ সালে সাতগাঁওয়ে ফেদেরিচি প্রায় ৩০-৩৫টি বড় ও ছোট জাহাজের কথা উল্লেখ করেন। পরবর্তী সময়ে সাতগাঁওয়ের গুরুত্ব কমতে থাকলে চট্টগ্রাম পূর্ব বাংলার প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে উঠে আসে। ১৫৬৯ সালে ফেদেরিচি চট্টগ্রামকে ‘The Great Port of Bengala’ বলে উল্লেখ করেন এবং সেখানে বিভিন্ন আকারের ১৮টি পর্তুগিজ জাহাজ থাকার কথা জানান।
তার বিবরণ থেকে বোঝা যায়, ১৬ শতকের বাংলা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। চট্টগ্রাম, সাতগাঁও, সোনারগাঁও, ঢাকা, বাকলা ও অন্যান্য নদীবন্দর কেন্দ্র করে বিস্তৃত বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল।
চট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপের জাহাজশিল্প
বাংলার জাহাজশিল্পের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিকগুলোর একটি হলো এর আন্তর্জাতিক পরিচিতি। ১৭ শতকের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের জাহাজ নির্মাণকেন্দ্রে উসমানি সুলতানের জন্য যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করা হয়েছিল। বাংলাপিডিয়াতেও চট্টগ্রামের জাহাজ নির্মাণকেন্দ্র থেকে উসমানীয় সুলতানের জন্য যুদ্ধজাহাজ তৈরি করার কথা উল্লেখ রয়েছে। অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ Indrajit Ray-ও চট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের আন্তর্জাতিক গুরুত্বের কথা আলোচনা করেছেন।
সে সময় উসমানি সাম্রাজ্য ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ও শক্তিশালী সামুদ্রিক শক্তি। তাই বাংলার নির্মাণকেন্দ্রে তাদের জন্য যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের ঘটনা বাংলার কারিগরি দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
দক্ষ কারিগর ও উৎপাদনব্যবস্থা
বড় জাহাজ নির্মাণ হলো বহু মানুষের সমন্বিত শ্রমের ফল। কাঠমিস্ত্রিরা জাহাজের কাঠামো, খোল, ডেক ও মাস্তুল তৈরি করতেন। কামাররা তৈরি করতেন পেরেক, নোঙর, শিকলসহ বিভিন্ন ধাতব সরঞ্জাম। দড়ি ও পাল নির্মাতারা প্রস্তুত করতেন রিগিং ও পাল। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল কাঠ সংগ্রহ, পরিবহন, জাহাজ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ।
অর্থাৎ জাহাজ নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ছিল একটি বিস্তৃত উৎপাদনব্যবস্থা। বন থেকে কাঠ সংগ্রহ করে নদীপথে নির্মাণকেন্দ্রে আনা, বিভিন্ন উপকরণের সরবরাহ এবং নির্মাণের পর জাহাজের মেরামত—সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল।
ইন্দ্রজিৎ রায় বাংলার জাহাজ নির্মাণের কিছু কারিগরি বৈশিষ্ট্যের কথাও উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে সমতল ডেকের (flushed deck) ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। সমকালীন ইউরোপীয় জাহাজের কয়েক স্তরবিশিষ্ট উঁচুনিচু ডেকের (stepped deck) বিন্যাসের তুলনায় এটি ছিল ভিন্ন নির্মাণরীতি। বাংলার কিছু জাহাজ নির্মাণ প্রযুক্তি পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজ নির্মাণেও ব্যবহার করা হয়েছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
উৎপাদনের ব্যাপ্তি
বাংলার জাহাজশিল্পের বিস্তৃতি বোঝার ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানও গুরুত্বপূর্ণ। ১৬ ও ১৭ শতকে বাংলার জাহাজ নির্মাণশিল্পের বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ২৫০ টন পর্যন্ত পৌঁছেছিল বলে অনুমান করা হয়।