ঢাকার হেঁশেলে একসময় এমন একটি পদ রান্না হতো, যা মাসের পর মাস সংরক্ষণ করে রাখা যেত। ফ্রিজ, ওভেন আসার অনেক অনেক আগে দীর্ঘযাত্রাপথে বাখরখানির সঙ্গী হতো সেই পদ। সেই পদ আবার যেকোনো জিনিস দিয়ে তৈরি হতো না; রান্না করা হতো গরুর মাংস দিয়ে। নাম তার জাহাজি কালিয়া। আজ এই নাম শুনলে অনেক ঢাকাবাসীই অবাক হন। অথচ একসময় এটি ছিল দূরযাত্রীর বিশ্বস্ত সঙ্গী এবং ঢাকার খানদানি রসনার এক অনন্য নিদর্শন।
জাহাজি কালিয়ার জন্ম দূরপথের যাত্রার প্রয়োজনে। কাঠের জাহাজে, উটের কাফেলায় কিংবা ঘোড়ার পিঠে চড়ে যাদের মাসের পর মাস পথ চলতে হতো, তারা এই কালিয়া সঙ্গে নিয়ে বের হতেন। হজযাত্রীদের কাছে এর কদর ছিল সবচেয়ে বেশি। সেকালে ঢাকা থেকে মক্কা, মদিনা ও আরাফাতে গিয়ে ফিরে আসতে কমপক্ষে প্রায় পাঁচ মাস সময় লাগত। এত দীর্ঘ পথে তাজা খাবারের আশা করা বৃথা। তাই টেকসই এই কালিয়াই হয়ে উঠেছিল ভরসা।
ঢাকা-গবেষক হাশেম সুফির বর্ণনা অনুযায়ী, ১৮৫৮ ও ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দের আগে তার দাদা-দাদির মা-বাবা ও পূর্বপুরুষরা উটের কাফেলার সঙ্গে সুদূর আরবে হজে যাওয়ার সময় জাহাজি কালিয়া অবশ্যই বহন করতেন। অর্থাৎ, এটি শুধু একটি শৌখিন পদ ছিল না, ছিল যাত্রার অপরিহার্য প্রস্তুতির অংশ।
কালিয়াটির গুরুত্ব বুঝতে হলে বাংলার হজযাত্রার ইতিহাসের দিকে একবার তাকানো দরকার। জাহাজ আসার আগে মানুষ হেঁটে, উটে কিংবা গাধার পিঠে হজে যেতেন। স্থলপথে উত্তর-পশ্চিম ভারতের ভেতর দিয়ে যাত্রা ছিল দীর্ঘ, কঠিন ও বিপজ্জনক। অন্যদিকে, আরব বণিকরা পালতোলা জাহাজে সমুদ্রপথে ব্যাপক যাতায়াত করতেন। ঐতিহাসিক আবদুল হক চৌধুরীর বরাত দিয়ে জানা যায়, সুলতানি আমলে (১৩৪০-১৫৩৮ খ্রিষ্টাব্দ) বাংলা ও পূর্ব ভারতের হজযাত্রীরা চট্টগ্রাম বা সাতগাঁও থেকে জাহাজে জেদ্দা পৌঁছাতেন। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর, আরব সাগর ও এডেন উপসাগর পেরিয়ে সেই পথ ছিল প্রায় ৫ হাজার ৬৩৩ নটিক্যাল মাইল।
পরে ব্রিটিশ আমলে বোম্বে (মুম্বাই) হয়ে ওঠে হজযাত্রার প্রধান কেন্দ্র। সে সময় ঢাকা থেকে নদীপথে, রেলে কিংবা স্থলপথে বন্দরে পৌঁছে তারপর জাহাজে ওঠার ধকলও যোগ হতো যাত্রার সঙ্গে। এমন পথে কোথায় তাজা রান্নার ব্যবস্থা, কোথায় বা বিশ্বাসযোগ্য খাবার! সেই শূন্যতা পূরণ করেছিল ঢাকার রসুইঘরের এই উদ্ভাবন।
হেকিম হাবিবুর রহমান তার ঢাকা পাচাস বারাস পাহলে গ্রন্থে লিখেছেন, জাহাজি কালিয়ার আলোচনা না করলে ঢাকার বর্ণনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। গোশত ও মাছ—দুটিই এই কালিয়ায় পাক হতো জলপাই বা জয়তুনের তেলে। এর বিশেষত্ব ছিল, মাসের পর মাস গরম না করেও এটি ভালো থাকত। তার মতে, জয়তুনের তেলের বদলে ঘি বা সাধারণ তেল দিলে কালিয়ার আয়ু কমে যেত। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, এই তেলের কারণেই দীর্ঘ যাত্রায় কালিয়া জমে যেত না এবং বারবার গরম করার দরকার হতো না।
জলপাই তেল বাংলার নিজস্ব উৎপাদন নয়। আরব ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের এই তেল ঢাকার রান্নাঘরে ব্যবহার হতো। এটি সেকালের ঢাকার বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও রসনার আন্তর্জাতিক ছোঁয়ার ইঙ্গিত দেয়।
তবে শুধু তেলই যথেষ্ট ছিল না। সংরক্ষণেও মানতে হতো কড়া নিয়ম। কালিয়া পাক করা হতো চীনামাটির বয়ামে এবং সেই বয়ামেই বহন করা হতো। এতে হাত লাগানো চলত না; কাঠের চামচ ছাড়া অন্য কোনো চামচও ব্যবহার করা যেত না। ভেতরের কালিয়া রাখতে হতো শুকনো, আর পাত্রটি থাকত আগুনের আঁচ থেকে দূরে। আজকের খাদ্যবিজ্ঞানের ভাষায় বললে, দূষণ ও আর্দ্রতা এড়ানোর এই সতর্কতাই ছিল সংরক্ষণের মূল শর্ত। এসব নিয়ম মেনে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে এই কালিয়া খাওয়া যেত।
হেকিম হাবিবুর রহমান নিজেও এই কালিয়ার স্বাদ নিয়েছেন। তার স্মৃতিতে সেটি ছিল ‘খুবই মজাদার’। কিন্তু তার লেখায় আক্ষেপও স্পষ্ট। তিনি লিখেছেন, ভ্রমণের প্রয়োজনীয়তা থেকেই এই কালিয়ার উদ্ভব, আর এখন সেই প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। লোকে এর নাম পর্যন্ত ভুলে গেছে। তার আশঙ্কা ছিল, পুরো শহরে হাতেগোনা দু-একটি পরিবার ছাড়া আর কেউ এটি রাঁধতে পারবে না। ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত গ্রন্থে যদি এই আশঙ্কা থাকে, তবে ২০২৬ সালে এসে এই রেসিপি যে বিলুপ্তির পথে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
পুরোনো রেসিপি থেকে যতটুকু জানা যায়, এক কেজি গরুর গোশত নিয়ে তার সঙ্গে লবণ, লেবুর রস, জিরা গুঁড়া, ধনে গুঁড়া, শুকনা মরিচ গুঁড়া ও কেওড়াজল—সবই এক টেবিল চামচ করে মেশানো হতো। যোগ হতো তিন টেবিল চামচ শাহি গরম মসলা, চারটি কাঁচামরিচ বাটা, এক কাপ জলপাই তেল, এক কাপ টকদই এবং এক চা-চামচ করে হলুদ গুঁড়া ও চিনি। সব উপকরণ ভালো করে মাখিয়ে দুই ঘণ্টা ঢেকে রাখতে হতো। তারপর কম আঁচে রান্না চলত আরো দুই ঘণ্টা। গোশত সেদ্ধ হয়ে এলে ভেজে ভেজে ঝরঝরে করে নেওয়া হতো, যাতে কালিয়াটি শেষ পর্যন্ত শুকনো শুকনো হয়।
এখানে লক্ষ করার বিষয়, টকদই, লেবুর রস ও শুকনো করে নেওয়ার পদ্ধতি স্বাদের পাশাপাশি সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখত বলে ধারণা করা যায়। রেসিপিতে কেওড়াজলের ব্যবহার সেই পদের খানদানি ঢাকাই চরিত্রের পরিচয় দেয়। তবে এই পরিমাপ আধুনিক রান্নার ভাষায় লেখা পুরোনো রেসিপির রূপান্তর। আদি পদ্ধতি যে ঠিক এমন ছিল, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারের তালিকা যখনই নতুন করে সাজানোর কথা উঠবে, বিস্মৃতির আড়াল থেকে এই কালিয়াকে তুলে আনা হবে আমাদের সাংস্কৃতিক দায়িত্ব। প্রবীণ রাঁধুনিদের কাছ থেকে আদি পদ্ধতি সংগ্রহ করা, গবেষণায় তা লিপিবদ্ধ করা এবং সম্ভব হলে নতুন প্রজন্মকে সেই স্বাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া দরকার। নইলে হেকিম হাবিবুর রহমানের সেই আশঙ্কা পুরোপুরি সত্যি হতে আর বেশি দেরি নেই।