হোম > সাহিত্য সাময়িকী > বইপত্র

বাঁকবদলের ক্রান্তিলগ্নে হাত বাড়িয়ে

শাহাদাৎ সরকার

বাংলাদেশের ইতিহাসে শরীফ ওসমান বিন হাদি একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পরে হাদি বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে ফ্যাসিবাদের কবল থেকে মুক্ত করার জন্য লড়াই করেছিলেন। আধিপত্যবাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলেছেন। তিনি বাংলার সংস্কৃতিকে রক্ষার জন্য গড়ে তুলেছিলেন ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার’; ছিলেন রাজনীতির মাঠেও সরব। আধিপত্যবাদী শক্তি তার কালচারাল পলিটিকস মেনে নিতে পারেনি। ফলে ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পরে নির্বাচনি প্রচারণাকালে প্রকাশ্যে গুলি করে তাকে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তিনি ইন্তেকাযল করেন। হাদির ইন্তেকাল আমাদের শোকাহত করে। শোকাভিভূত অবস্থার মধ্যে তাকে নিয়ে, বিশেষ করে তার সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের ওপর বিদগ্ধজনেরা বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় কলাম লেখেন। সেই কলামগুলোর মধ্য থেকে গুরুত্ব ও বিষয় বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ লেখাগুলো নিয়ে লেখক ও গবেষক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন ও লেখক ও সম্পাদক সীমান্ত আকরাম ‘আধিপত্যবাদবিরোধী লড়াই: শহীদ ওসমান হাদি ও আগামীর বাংলাদেশ’ শীর্ষক বইটি সম্পাদনা করেছেন। এই সংকলনটি সময়ের দলিল, একটি জাতির জাগরণের ইশতেহার এবং এক অকুতোভয় বিপ্লবীর রেখে যাওয়া নকশা।

শরীফ ওসমান হাদি (১৯৯৩-২০২৫) গ্রামবাংলার ধুলোমাখা পথ থেকে উঠে আসা এক অসামান্য তরুণের নাম, যিনি তার স্বল্পদৈর্ঘ্য জীবনে আমাদের শিখিয়ে গেছেন—কীভাবে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে হয়। চব্বিশের মহাবিপ্লবের অব্যবহিত পরে, যখন সুবিধাবাদ আর আপসের চোরাবালিতে বিপ্লবের মূল স্পিরিট হারিয়ে যেতে বসেছিল, তখন ওসমান হাদি হয়ে উঠেছিলেন পথহারা মানুষের ধ্রুবতারা। এই গ্রন্থটি সেই ধ্রুবতারার আলোয় আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণের একটি তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক রূপরেখা।

এই গ্রন্থটি মহান বিপ্লবী শহীদ ওসমান হাদির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানানো এবং তার চিন্তাকে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে সংকলন করা হয়েছে। এখানে যে লেখাগুলো সংকলিত হয়েছে, তা বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত। দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মীরা হাদির আদর্শ ও দর্শন নিয়ে এই লেখাগুলো লিখেছেন। তবে গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গতা ও প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা করে সম্পাদকদ্বয় দু-তিনটি নতুন লেখাও এতে যুক্ত করেছেন। লেখা নির্বাচনের ক্ষেত্রে তারা কয়েকটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছেন। প্রথমত, সমাজের সেইসব গুণীজনের লেখাকে স্থান দিয়েছেন, যারা সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং যাদের বিশ্লেষণ হাদির দর্শনকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। দ্বিতীয়ত, যেসব লেখার মধ্যে সরাসরি হাদির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চিন্তার দর্শন উঠে এসেছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তৃতীয়ত, একই বিষয়বস্তুর ওপর একাধিক লেখা থাকলে যে লেখাটি বেশি তথ্যবহুল ও বিশ্লেষণধর্মী, সেটিকেই বেছে নিয়েছেন। এই সংকলনটির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, ওসমান হাদির লেখা, তার বিভিন্ন সময়ে দেওয়া সাক্ষাৎকার এবং টকশোগুলোর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অংশ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, পাঠক যেন সরাসরি হাদির জবানিতে তার চিন্তার ক্রমবিকাশ ও গভীরতা অনুধাবন করতে পারেন। একজন চিন্তক ও বিপ্লবী হিসেবে তিনি কীভাবে ধাপে ধাপে নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন এবং কীভাবে তিনি সময়ের প্রয়োজনে জ্বলে উঠেছিলেন, তা এই লেখা পাঠ করলে বোঝা যাবে। গ্রন্থের নান্দনিকতা ও দালিলিক মূল্য বৃদ্ধির জন্য প্রতিটি প্রবন্ধের শুরুতে হাদির বিভিন্ন সময়ের আন্দোলন ও লড়াইয়ের দুর্লভ ছবি সংযোজন করা হয়েছে। এই ছবিগুলো কেবল অলংকরণ নয়, এগুলো একেকটি ইতিহাসের সাক্ষী। রাজপথে পুলিশের ব্যারিকেডের সামনে, মিছিলে স্লোগানরত অবস্থায়, কিংবা গভীর চিন্তামগ্ন হাদির এই ছবিগুলো পাঠকদের সেই উত্তাল দিনগুলোয় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।

এই সংকলনটি প্রকাশের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্পাদকদ্বয় মন্তব্য করেন, ‘কেবল একজন ব্যক্তিকে স্মরণ করা নয়, বরং তার আদর্শিক চেতনা এবং আধিপত্যবাদবিরোধী দর্শনকে আগামী প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা চাই, এই বইটি পাঠ করে তরুণ প্রজন্ম উদ্বুদ্ধ হোক, তারা চিনুক তাদের প্রকৃত নায়কদের। ওসমান হাদি যে ‘ইনসাফ’-ভিত্তিক বাংলাদেশ কায়েমের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন যেন আমাদের তরুণদের চোখেও বাসা বাঁধে। ন্যায়বিচার, সাম্য ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের পথে এই বইটি যদি সামান্যতম অবদানও রাখতে পারে, তবেই আমাদের শ্রম সার্থক হবে বলে মনে করি। ওসমান হাদি আমাদের দেখিয়ে দিয়ে গেছেন, গ্রামের সাধারণ ঘর থেকে উঠে এসেও কীভাবে একজন মানুষ তার সততা, সাহস ও দেশপ্রেম দিয়ে একটি জাতির আইকন হয়ে উঠতে পারে। তিনি প্রমাণ করেছেন, বিপ্লব কেবল বইয়ের পাতায় থাকে না, বিপ্লব থাকে মানুষের মজ্জায়, তার সাহসে। আজকের বাংলাদেশে যখন চতুর্দিকে হতাশার কালো মেঘ, যখন আধিপত্যবাদী শকুনরা আবারও আমাদের আকাশ ঢেকে ফেলতে চাইছে, তখন ওসমান হাদির জীবন ও কর্ম আমাদের জন্য এক অফুরন্ত প্রেরণার উৎস।’

এই সংকলনটি আমাদের তরুণ সমাজকে অনুপ্রাণিত করবে ইনসাফপূর্ণ বাংলাদেশ নির্মাণে— এই প্রত্যাশা রেখে বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।

বাংলার হারানো শহর খলিফাতাবাদ

মাহমুদুর রহমানের নতুন বই ‘আত্মপরিচয়ের বর্মে হেজেমনি মোকাবেলা’

‘হোয়াই নেশনস ফেইল’

সামাজিক ও রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের উপাখ্যান

তরুণ কবি এমদাদ হোসেনের নতুন বই ‘বেদনার দুর্দিনে তুমি আমার প্রার্থনা হও’

‘আবদুল্লাহ্‌’ ও বাঙালি মুসলমান সমাজ

নাদিয়া কিলানির প্রথম কবিতার মৌসুম

এক ‘তথৈবচ’ সন্ধ্যা

‘আওয়ামী শাসনে আলেম নিপীড়ন’ বই প্রকাশ

ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রথম আন্দোলন বা শেষ প্রহরের গল্প