হোম > সাহিত্য সাময়িকী > মুসলিম বিশ্বের ইতিহাস

মধ্যযুগের মিনিয়েচার শিল্পে জীবন ও সংস্কৃতি

শাহ আহমাদ রেজা

ষোলো-সতেরো শতকের ফারসি বা মোগল পাণ্ডুলিপি চিত্র দেখলে মনে বিস্ময় জাগে। হাতের তালুর চেয়ে সামান্য বড় কাগজের টুকরোয় ফুটে আছে গোটা একটি পৃথিবী। এক পাতায় দরবারে সিংহাসনে বসে আছেন বাদশাহ, চারপাশে দূত ও অভিজাতের সারি; পরের পাতায় বাগানের ছায়ায় কবিতা পাঠ করছেন কবি; আরেক পাতায় ঘোড়সওয়ারের দল ছুটে চলেছে যুদ্ধের ময়দানে। এই আর্টকে আমরা মিনিয়েচার নামে চিনি।

একটি মিনিয়েচারকে মনে হয় কয়েক শতাব্দী আগের সমাজের খোলা জানালা। তবে সেই জানালা দিয়ে সময়ের অভ্যন্তরে তাকানোর সময় সতর্কতা জরুরি। কারণ মিনিয়েচার কোনো আলোকচিত্র নয়, বাস্তব দৃশ্যের সরাসরি অনুলিপিও নয়। এর কোনোটি আঁকা হয়েছে সাহিত্যকর্মের ভিত্তিতে, কোনোটি রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষকতায়, আবার কোনোটি শিল্পীর কল্পনা ও প্রচলিত নান্দনিকতায়। তাই মিনিয়েচার ছবিতে কী দেখা যাচ্ছে, তার পাশাপাশি জানতে হয়—কেন তা এভাবে দেখানো হয়েছে। এই সতর্কতা মাথায় রাখলে মিনিয়েচার হয়ে ওঠে ইতিহাসের দৃশ্যমান ভাষা। পোশাকের গড়ন, প্রাসাদের খিলান বা বাগানের নকশায় ধরা পড়ে, একটি সময়ের মানুষ পৃথিবীকে কীভাবে দেখত এবং অন্যের সামনে তা কীভাবে তুলে ধরতে চাইত।

ছোট ছবি, পূর্ণাঙ্গ শিল্পজগৎ

‘মিনিয়েচার’ শব্দটির ব্যবহার ব্যাপক। তবে মধ্যযুগ ও প্রাক্-আধুনিক মুসলিম পাণ্ডুলিপিচিত্রকে শুধু ‘ছোট ছবি’ হিসেবে বোঝা যথেষ্ট নয়। একটি পাণ্ডুলিপির কাগজ, ক্যালিগ্রাফি, অলংকরণ, চিত্র, বাঁধাই ও পাঠ—সব মিলেই তৈরি হতো একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পকর্ম। এই শিল্পজগতের নির্দিষ্ট কোনো গণ্ডি ছিল না। তেরো থেকে সতেরো শতকের মধ্যে ইরান, ইরাক, সিরিয়া, আনাতোলিয়া, মধ্য এশিয়া ও বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বতন্ত্র ধারা বিকশিত হয়। তিমুরীয় হেরাত, ষোলো শতকের বুখারা, সাফাভি ইরান, উসমানি ইস্তাম্বুল ও মোগল ভারত—এদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ থাকলেও তাদের শিল্পধারা ছিল ভিন্ন।

দরবারের ছবিতে ক্ষমতার ভাষা

মিনিয়েচারের সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্য হলো রাজদরবার। সম্রাট বা বাদশাহ সাধারণত দৃশ্যের কেন্দ্রে থাকতেন; চারপাশে আমির-ওমারা, দূত, সৈনিক, পরিচারক ও অন্যান্য দরবারিরা থাকত। সম্রাটের উঁচু আসন, ছত্রী, অলংকৃত স্থাপনা, নত হয়ে দাঁড়ানো দূত ও অপেক্ষমাণ কর্মকর্তারা মিলে ক্ষমতার একটি দৃশ্যমান বিন্যাস তৈরি করত। পোশাক, দেহভঙ্গি, দূরত্ব ও অবস্থান ছিল সেই বিন্যাসের ভাষা।

দরবারের বাইরের সমাজ

রাজা-বাদশাহ, আমির-ওমারা ছাড়া মিনিয়েচারের বিস্তার ছিল অনেক ব্যাপক। মোগল পাণ্ডুলিপিচিত্রে বাজার, রাস্তা, কারিগর, ব্যবসায়ী, পরিচারক, পথিক ও সাধারণ মানুষের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখা যায়। আকবরের আমলে তৈরি সচিত্র হামজানামার একটি চিত্রে মিসবাহ নামের মুদি দোকানিকে গুপ্তচর পররানের সঙ্গে দেখা যায়। দুজন হামজার অপহৃত পুত্রকে উদ্ধারের পরিকল্পনা করছিল। দৃশ্যটি কল্পিত হলেও এর ভেতর দিয়ে সেকালের পেশা, নগরজীবন ও সামাজিক যোগাযোগের একটি পরিসর দৃশ্যমান হয়। চিত্রটি আনুমানিক ১৫৭০ সালের এবং মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টে সংরক্ষিত।

পোশাকের ভাঁজে সমাজের পরিচয়

মিনিয়েচার আর্টে পোশাক একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। পাগড়ি, টুপি, জামা, চাদর, কোমরবন্ধ, অলংকার, জুতা কিংবা অস্ত্রের ধরন অনেক সময় সামাজিক পরিচয় প্রকাশ করে। কে অভিজাত, কে সৈনিক, কে দূত, কে পরিচারক—পোশাক, দেহভঙ্গি ও অবস্থানের মাধ্যমে তাদের পৃথক করা হয়েছে।

মিনিয়েচারে নারী: দৃশ্যমানতা ও সীমাবদ্ধতা

মিনিয়েচারে রাজপরিবারে, প্রাসাদের অভ্যন্তরে, বাগানে অবসরে, সংগীত আয়োজনে, বিয়ে কিংবা প্রেমকাহিনিতে নারীর উপস্থিতি দেখা যায়। কিন্তু ‘নারীর চিত্রায়ণ’ এবং ‘নারীর বাস্তব জীবন’ এক বিষয় নয়। রাজদরবারের শিল্পে যাদের দেখা যায়, তারা সাধারণত রাজপরিবার ও অভিজাত ঘরের নারী, অথবা লায়লা-মজনু কিংবা খসরু-শিরিনের মতো প্রেম-কাহিনির চরিত্র। সাধারণ ঘরের নারীর শ্রম ও দৈনন্দিন জীবন সেখানে তুলনায় কমই ধরা পড়ে।

বই, ক্যালিগ্রাফি ও জ্ঞানের জগৎ

মুসলিম পাণ্ডুলিপি-সংস্কৃতির কেন্দ্রে ছিল ক্যালিগ্রাফি। কোরআনের পাণ্ডুলিপিতে সাধারণত থাকত লিপির সৌন্দর্য আর জ্যামিতিক বা লতাপাতার নকশায় অলংকরণ; মানুষের ছবি সেখানে প্রায় দেখা যায় না। কিন্তু সাহিত্য, ইতিহাস ও বিজ্ঞানের গ্রন্থে মানুষ ও প্রাণীর ছবির ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। তাই মুসলিম পাণ্ডুলিপি শিল্পে ‘কোনো ছবি ছিল না’ এবং ‘সব পাণ্ডুলিপিতেই ছবি ছিল’—দুটিই ভুল। ফারসি-সাহিত্য জগতে ফেরদৌসি, সাদি, নিজামি ও জামীর রচনা পাণ্ডুলিপিচিত্রের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এসব সাহিত্যকর্ম শিল্পীদের গল্প, চরিত্র ও নৈতিক ভাবনাকে দৃশ্যমান করে তোলার সুযোগ দিয়েছিল।

মোগলশাসিত উপমহাদেশে পাণ্ডুলিপি শুধু বই ছিল না, ছিল দুই ঐতিহ্যের মিলনস্থল। সংস্কৃত মহাভারতের ফারসি অনুবাদ রজমনামা এর ভালো উদাহরণ। এই গ্রন্থের পাতায় দেখা যায়, মোগল দরবারে ভারতীয় ও ইরানি জ্ঞান-সংস্কৃতি কীভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

যুদ্ধ, শিকার ও প্রকৃতি

যুদ্ধের মিনিয়েচারে ঘোড়া, তলোয়ার, তীর-ধনুক, বর্ম, দুর্গ ও সৈন্যদল চোখে পড়ে। কিন্তু যুদ্ধচিত্রে শুধু ‘কী ঘটেছিল’ তা নয়; বরং বিজয়ীকে কীভাবে বিজয়ী হিসেবে দেখানো হয়েছে, তাও প্রকাশ করে।

ষোলো শতকের সাফাভি আমলের বিখ্যাত সচিত্র পাণ্ডুলিপি ‘শাহ তাহমাসপের শাহনামা’ এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ফেরদৌসির মহাকাব্য রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অসাধারণ চিত্রভাষা পেয়েছিল। এর একটি চিত্রে শিকারে বের হওয়া বাহরাম গুরকে এক তীরেই দুটি বন্য গাধা বিদ্ধ করতে দেখা যায়।

সীমান্ত পেরিয়ে শিল্পের যাত্রা

মধ্যযুগ ও প্রাক্-আধুনিক মুসলিম বিশ্বের পাণ্ডুলিপিচিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সাংস্কৃতিক বিনিময়। পারস্য, মধ্য এশিয়া, চীন, ভারত, আনাতোলিয়া এবং পরে ইউরোপের সঙ্গে যোগাযোগ শিল্পীদের শুধু বিষয় নয়, আঁকার ভঙ্গিও বদলে দিয়েছে।

মঙ্গোল সাম্রাজ্যের বিস্তার ও সিল্ক রোডের যোগাযোগের মাধ্যমে চীনা শিল্পরীতির বিভিন্ন উপাদান পারস্য চিত্রকলায় প্রবেশ করে।

মেঘ, পাহাড়ি দৃশ্য, পদ্মফুল ও অন্যান্য মোটিফের রূপান্তর এর দৃশ্যমান নিদর্শন।

এই সাংস্কৃতিক যাত্রাকে তিনটি পাণ্ডুলিপির মাধ্যমে বিশেষভাবে বোঝা যায়। ‘শাহনামায়ে শাহ তাহমাসপ’ সাফাভি ইরানের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সাহিত্য-শিল্পের সম্পর্ক দেখায়। সাদির ‘বুস্তাঁ’ হেরাত ও বুখারার সাংস্কৃতিক সংযোগের সাক্ষ্য দেয়। আর আকবরের ‘হামজানামা’ ইরানি ও উপমহাদেশীয় শিল্পীদের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা মোগল চিত্রভাষার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

মিনিয়েচার কি ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য দলিল

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। মিনিয়েচার কি ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য দলিল? উত্তর হলো, শর্তসাপেক্ষে হ্যাঁ।

পোশাক-পরিচ্ছদ, স্থাপত্য, অস্ত্র, যানবাহন, দরবার, খাদ্য, বিনোদন, পেশা ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে মিনিয়েচার থেকে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু কোনো একটি ছবিকে ঐতিহাসিক সত্য ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই।

মিনিয়েচার সমাজের হুবহু প্রতিচ্ছবি নয়। কারণ শিল্পী নিজের সময়ের বাস্তবতা থেকে ছবি আঁকতেন, পৃষ্ঠপোষকের রুচি ও আদর্শের ছাপ ছবিতে থাকত। সাহিত্যের কাহিনি আর বাস্তব জীবনের দৃশ্য প্রায়ই মিলেমিশে যেত। সেখানে দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষ জায়গা পেতেন তুলনামূলকভাবে কম।

বিচ্ছিন্ন পাণ্ডুলিপির অন্য ইতিহাস

আজ জাদুঘরে আমরা বিচ্ছিন্ন মিনিয়েচার দেখি। কিন্তু শিল্পী যখন সেটি এঁকেছিলেন, তখন হয়তো পূর্ণ পাণ্ডুলিপির অংশ ছিল। পরবর্তী শতাব্দীতে বহু পাণ্ডুলিপি বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে, পাতা আলাদা হয়েছে, চিত্র সংগ্রাহকদের হাতে গেছে এবং বিভিন্ন দেশের সংগ্রহশালায় ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে একটি ছোট্ট ছবি দেখার সময় একাধিক ইতিহাস আমাদের বিবেচনা করতে হয়—শিল্পীর ইতিহাস, পৃষ্ঠপোষকের ইতিহাস, পাণ্ডুলিপির ইতিহাস, সংগ্রাহকের ইতিহাস এবং আধুনিক জাদুঘরের ইতিহাস।

ক্ষুদ্র ছবির ভেতর বিশাল পৃথিবী

একটি মিনিয়েচারের আয়তন ছোট। কিন্তু তার ভেতরের পৃথিবী ছোট নয়। সেখানে সুলতান আছেন, তার পাশে পরিচারকও আছেন। সম্রাটের সিংহাসন আছে, আবার বাজারের পথও আছে। যুদ্ধের ঘোড়া আছে, আবার বাগানে অবসর কাটানো মানুষও আছে। রাজকীয় পোশাক আছে, আছে কারিগরের কাজ। সাহিত্যিক প্রেমের গল্প আছে, আছে নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার প্রশ্ন; আছে বই, শিক্ষা, কূটনীতি, খাদ্য, সংগীত, শিকার, প্রাণী ও প্রকৃতি। এই বৈচিত্র্যই মিনিয়েচার শিল্পের প্রকৃত শক্তি।

কাশ্মীরের ৬০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বিয়ের ভোজ

আধুনিক অপটিকস, ইবনুল হাইসাম ও নতুন যুগের সূচনা

পর্দার জৌলুস বনাম ইতিহাসের বাস্তবতা

সেপ্টেম্বর-রবিউস সানি-আশ্বিন: মুসলিম বিশ্বের ইতিহাস ক্যালেন্ডার

খলিফা ওমরের অর্থ ব্যবস্থাপনায় বায়তুল মাল

কৃষিকাজ ও সেচব্যবস্থার আধুনিকায়ন

আইনে জালুতের যুদ্ধ: পাল্টে দিয়েছিল ইতিহাসের গতিপথ

কৃষিকাজ ও সেচব্যবস্থার উন্নয়ন

সেপ্টেম্বর-রবিউস সানি-আশ্বিন: মুসলিম বিশ্বের ইতিহাস ক্যালেন্ডার

খলিফা ওমর (রা.)-এর অর্থব্যবস্থা ও সংস্কার