ইবনে রুশদ ছিলেন মুসলিম গোল্ডেন এজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বহুমুখী প্রতিভা। তার জ্ঞানচর্চা দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, ভাষাতত্ত্বসহ নানা শাখায় বিস্তৃত ছিল। আন্দালুসে জন্ম নেওয়া এই মনীষী দর্শন, আইন, চিকিৎসা, গণিতসহ বিভিন্ন বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেন। অ্যারিস্টটলের ব্যাখ্যার জন্যই তিনি সর্বাধিক খ্যাতি অর্জন করেন, যা পরে ইউরোপে ‘আভেরোয়েসবাদ’-এর জন্ম দেয়। জীবদ্দশায় তিনি যেমন সম্মান পেয়েছেন, তেমনি তীব্র বিতর্কেরও সম্মুখীন হয়েছেন।
শিক্ষাজীবন
মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে রুশদ—আরব জগতে যিনি ইবনে রুশদ এবং পাশ্চাত্যে ‘আভেরোয়েস’ নামে পরিচিত। তিনি ১১২৬ সালের ১৪ এপ্রিল কর্ডোবার শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ইবনে রুশদ বহুমাত্রিক শিক্ষায় পারদর্শিতা অর্জন করে। দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, আইনশাস্ত্র, চিকিৎসাবিজ্ঞানসহ নানা বিষয় তিনি সমকালের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের অধীনে অধ্যয়ন করেন। শিক্ষার বিস্তৃতি এবং শিক্ষকদের প্রাজ্ঞতা তাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে। পরবর্তী জীবনে তিনি যখন সেভিলে (বর্তমান সেভিয়া) যান, তখন কবি, দার্শনিক ও চিকিৎসকদের সমাবেশে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে থাকেন। এই পরিশীলিত বৌদ্ধিক পরিবেশ তার চিন্তার বিকাশে সহায়ক হয়।
ইবনে তোফায়েলের সঙ্গে সাক্ষাৎ
১১৫৩ সালে মারাকেশে ইবনে তোফায়েলের সঙ্গে ইবনে রুশদের সাক্ষাৎ হয়। ইবনে তোফায়ল ছিলেন আন্দালুসের এক বহুমুখী প্রতিভা এবং মুওয়াহহিদ খলিফা আবু ইয়াকুব ইউসুফের প্রধানমন্ত্রী ও চিকিৎসক। ১১৬৯ সালে তিনিই ইবনে রুশদকে খলিফার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।
ইবনে রুশদের মেধা ও বিশ্লেষণ-শক্তিতে খলিফা প্রভাবিত করে। অ্যারিস্টটলের গ্রন্থগুলো ব্যাখ্যা লেখার দায়িত্ব ইবনে রুশদকে দেওয়ার জন্য তিনি ইবনে তোফায়েলকে নির্দেশ দেন। এভাবেই তিনি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অ্যারিস্টটলের দর্শনের ব্যাখ্যা রচনা শুরু করেন।
ইবনে রুশদের স্বর্ণযুগ
অল্প সময়ের মধ্যেই ইবনে রুশদ সেভিলের কাজি (বিচারক) নিযুক্ত হন এবং পরে কর্ডোবার কাজির দায়িত্বও পালন করেন। পরে তিনি দাদার মতো কর্ডোবার প্রধান কাজির পদে অধিষ্ঠিত হন এবং ১১৮১ সালে ইবনে তোফায়েলের স্থলাভিষিক্ত হয়ে খলিফার প্রধান চিকিৎসক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
এ সময়ে তিনি নানা শাস্ত্রে বহু গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থগুলো তার মৃত্যুর পরও শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে। খলিফার সমর্থন তাকে যেমন স্বাধীনভাবে চিন্তা ও গবেষণার সুযোগ দেয়, তেমনি রক্ষণশীল সমাজের বিরূপ প্রতিক্রিয়া থেকেও এক ধরনের সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
সবকিছুই যখন অনুকূলে চলছিল, তখন তার ভাগ্যের চাকা বিপরীত দিকে ঘুরতে শুরু করে।
ইবনে রুশদের পতনকাল
ইবনে রুশদের মতাদর্শিক অবস্থান সমসাময়িক অন্যান্য ফকিহ ও ধর্মতত্ত্ববিদদের রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির তুলনায় ব্যতিক্রমধর্মী ছিল। তিনি ইবনে সিনা ও আলফারাবির নব্য-প্লেটোনিক মতবাদকে প্রত্যাখ্যান করেন। পাশাপাশি, তিনি আলগাজালির বিখ্যাত গ্রন্থ তাহাফুত আল-ফালাসিফা (تهافت الفلاسفة)-এর কঠোর সমালোচনা করে তাহাফুতুত তাহাফুত (تهافت التهافت) গ্রন্থ রচনা করেন।
তিনি মতপ্রকাশ করেন, যদি ধর্মগ্রন্থের কোনো বর্ণনা যুক্তির সঙ্গে আপাতবিরোধী মনে হয়, তবে তা রূপক বা আলংকারিক অর্থে ব্যাখ্যা করা উচিত। তার এই মতবাদ সে সময়ে খুবই ধর্মবিরোধী ও আপত্তিকর বলে গণ্য হয়। আর তিনি যখন বলেন, ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যার অধিকার শুধু দার্শনিকদেরই থাকা উচিত, তখন তাকে ঘিরে বিতর্ক ও সমালোচনা আরো বৃদ্ধি পায়।
আবার অনুগ্রহপ্রাপ্তি ও ইন্তেকাল
আন্দালুসে কালামপন্থি ধর্মতাত্ত্বিকদের গভীর প্রভাব ছিল, ফলে রাজনৈতিক কারণে খলিফা ইবনে রুশদের সঙ্গ ত্যাগ করেন। তখন যুদ্ধের আশঙ্কায় তিনি জনসমর্থন হারাতে চাননি। এই প্রেক্ষাপটে ১১৯৫ সালে কর্ডোবায় ইবনে রুশদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে বিচারসভা বসে।
খলিফার সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে তিনি এই বিচারে পরাজিত হন এবং তার মতাদর্শ প্রত্যাখ্যাত ঘোষিত হয়। তাকে লুসেনায় নির্বাসনে পাঠানো হয়। কয়েক বছরের মধ্যে খলিফা মারাকেশে ফিরে আসেন এবং নির্বাসিত দার্শনিককে আবার দরবারে ডেকে নেন।
ইবনে রুশদ আবার রাজকীয় অনুগ্রহ লাভ করেন। এর অল্প কিছুদিন পর ১১৯৮ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাকে প্রথমে মারাকেশে দাফন করা হয়, কিন্তু পরে তার দেহ কর্ডোবায় পারিবারিক কবরস্থানে স্থানান্তর করা হয় এবং তার দ্বিতীয় দাফন সম্পন্ন হয়।
(দ্য কালেক্টর অবলম্বনে)