ইয়ামামা যুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শন
মুসলিম বাহিনীর প্রাথমিক বিপর্যয়ের পর যখন মুরতাদরা খালেদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর তাঁবু পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তখন মুসলিম বাহিনী আবার সংগঠিত হতে শুরু করে। যুদ্ধের ওই মুহূর্তে মুজাহিদদের আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় অবিস্মরণীয় হয়ে আছে।
জায়েদ ইবনে খাত্তাব (রা.) গর্জে উঠলেন। তিনি চিৎকার করে মুসলিমদের বললেন, ‘হে লোকসকল! আপনারা দাঁত কামড়ে লড়াই করুন, শত্রুকে আঘাত করুন এবং সামনে এগিয়ে যান। আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ না করা পর্যন্ত আর কোনো কথা বলব না।’
এই বলে তিনি সেনাবাহিনীর ডান পাশের নেতৃত্ব নিজের হাতে তুলে নিলেন এবং প্রচণ্ড বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেন।
নাহারুর রিজালের মৃত্যু
যুদ্ধ করতে করতে জায়েদ (রা.) মুরতাদ বাহিনীর বাঁ বাহুর সেনাপতি ও বিশ্বাসঘাতক নাহারুর রিজালের মুখোমুখি হন এবং তাকে হত্যা করেন। যে নাহার একসময় নবীজি (সা.)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং সুরা বাকারা মুখস্থ করেছিল, সে আজ মুরতাদ অবস্থায় প্রাণ হারাল।
নাহারুর রিজালের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে বনু হানিফার সৈন্যদের মনোবল ভেঙে যায়। কারণ এই এক নাহারকে দেখেই ৪০ হাজার লোক ধর্মত্যাগ করেছিল। তার মৃত্যুতে ধর্মত্যাগীদের মাঝে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ও পরাজয়ের গ্লানি দেখা দেয়।
নাহারকে হত্যার পর জায়েদ (রা.) মুরতাদ বাহিনীর গভীরে ঢুকে পড়েন। সেখানে তিনি আবু মারিয়াম হানাফি নামক এক ব্যক্তির মুখোমুখি হন এবং আবু মারিয়ামের আঘাতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
মৃত্যুবাগিচা
জায়েদ ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর শাহাদাতের পর মুসলিম বাহিনীর ডান বাহুতে চরম বিপর্যয় দেখা দেয়। শত্রুরা দ্বিতীয়বারের মতো সেনাপতি খালেদের তাঁবু পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এই চরম সংকট মোকাবিলায় ইসলামের শ্রেষ্ঠ সন্তানরা প্রতিরোধের জন্য এগিয়ে আসেন।
এই যুদ্ধে আনসারদের পতাকাবাহী সাবিত ইবনে কায়স (রা.) চিৎকার করে ডাক দিলেন— ‘আনসার বাহিনী, প্রতিরোধের জন্য এগিয়ে এসো!’
যুদ্ধ করতে করতে প্রতিপক্ষের আঘাতে তার একটি পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। কিন্তু হঠাৎ যখন শুনতে পেলেন কেউ ডেকে বলছে, ‘আনসাররা কোথায়?’ তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। এক পায়ে ভর করে হামাগুড়ি দিতে দিতে আবার শত্রুর দিকে এগিয়ে যেতে থাকলেন।
এ দৃশ্য দেখে আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বিস্মিত হয়ে তাকে বললেন, ‘এবার তো বিরত হোন!’ উত্তরে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, ‘আমি হামাগুড়ি দিয়ে হলেও এই ডাকে সাড়া দেব।’
আবু হুজাইফা ও সালিম : কোরআনের বাহকদের লড়াই
আবু হুজাইফা (রা.) সুরা বাকারার হাফেজ ছিলেন। যুদ্ধের এই পরিস্থিতিতে তিনি চিৎকার করে বললেন, ‘হে সুরা বাকারার সাথীরা, আপনারা এগিয়ে আসুন!’ তার এই ডাকে হাফেজে কোরআনরা সুসংগঠিত হয়ে তীব্র আক্রমণ চালান এবং যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেন। আর এই আক্রমণের সময় আবু হুজাইফা শাহাদাত বরণ করেন।
এরপর আবু হুজাইফার প্রিয় মুক্ত দাস সালিম মুহাজিরদের পতাকা হাতে তুলে নেন। যুদ্ধের ময়দানে তার ডান হাত কেটে গেলে বাঁ হাত দিয়ে পতাকা ধরেন; বাঁ হাতও কেটে গেলে দুই বাহুর অবশিষ্টাংশ দিয়ে পতাকাটি বুকের সঙ্গে চেপে ধরেন এবং কোরআনের আয়াত তিলাওয়াত করতে করতে শহীদ হয়ে যান। মৃত্যুর আগে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আবু হুজাইফা কোথায়?’ যখন শুনলেন তিনি শহীদ হয়েছেন, সালিম বললেন, ‘আমাকে তার পাশেই দাফন করো।’
খালেদ ইবনে ওয়ালিদের নেতৃত্ব-কৌশল
খালেদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) যুদ্ধক্ষেত্রে অজেয় বীরের মতো লড়ছিলেন। তিনি শত্রুদের ব্যূহ ভেদ করে সরাসরি মুসাইলামা কাজ্জাবের সামনে গিয়ে তাকে ইসলামের দাওয়াত দেন। কিন্তু পাপিষ্ঠ মুসাইলামা তা প্রত্যাখ্যান করে। তখন খালেদ (রা.) তাকে বলেন, ‘তুমি ফিরে এলে এই মানুষগুলোর রক্ত ঝরবে না।’ তবুও মুসাইলামা তার বিদ্রোহ ও ভ্রান্ত দাবিতে অটল থাকে। এরপর শুরু হয় তুমুল সংঘর্ষ, আর মুরতাদদের আক্রমণ ক্রমে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।
ইয়ামামার যুদ্ধে হাফেজে কোরআন আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.) সাহস ও প্রেরণার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। শত্রুর আঘাতে তার একটি কান প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে ঝুলে পড়লেও তিনি অবিচলভাবে মুসলিমদের উৎসাহ দিতে থাকেন।
এরপর কোরআনের হাফেজরা নতুন উদ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং তারা মুশরিকদের ওপর এক প্রচণ্ড আক্রমণ চালান। মুসলিমদের মনোবল জাগিয়ে তুলতে সেনাপতি খালেদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) তখন যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন রণধ্বনি উচ্চারণ করলেন—‘ওয়া মুহাম্মাদাহ!’
যখনই মুসলিম যোদ্ধারা ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন, তিনি এই স্লোগান দিচ্ছিলেন—‘ওয়া মুহাম্মাদাহ!’ এই রণধ্বনি মুসলিমদের হৃদয়ে নতুন প্রাণের সঞ্চার করত এবং তারা আবার নবোদ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়তেন।
বারা ইবনে মালিক (রা.)-এর অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগ
মুসলিমদের প্রচণ্ড তাড়া খেয়ে মুসাইলামা বিরাট সৈন্য বহর নিয়ে চিন্তায় পড়ে যায়। মুরতাদ জেনারেল মুহকাম ইবনে তোফায়েল তাকে পরামর্শ দিল, ‘এই মুহূর্তে বাগানে ঢুকে যেতে হবে।’ মুসাইলামা বাহিনীসহ সেই বিশাল প্রাচীরঘেরা বাগানে আশ্রয় নেয়। তারা ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলে মুসলিমদের ভেতরে ঢোকার পথ বন্ধ হয়ে যায়। তখন বারা ইবনে মালিক (রা.) প্রস্তাব দেন, ‘আপনারা আমাকে একটি ঢালের ওপর বসিয়ে বর্শার মাথায় তুলে প্রাচীরের ওপারে ছুড়ে ফেলে দিন। আমি ওপাশ থেকে দরজা খুলে দেব।’
বাগিচার ভেতরে ৯০ হাজার সশস্ত্র শত্রু অবস্থান করছে, আর বারা ইবনে মালিক (রা.) একাই বাগিচায় প্রবেশ করতে চাইছেন। যুক্তির বিচারে একে আত্মহত্যাই বলা যায়। তাই প্রথমে সাহাবিরা এই প্রস্তাবে সম্মত হলেন না। কিন্তু বারা ইবনে মালিকের পিড়াপিড়িতে তারা রাজি হতে বাধ্য হলেন। তাকে ওপারে ছুড়ে দেওয়া হলো। তিনি একাকী যুদ্ধ করে ৮০টি জখম শরীরে নিয়েও দুর্গের দরজা খুলে দেন।
এই ঘটনা ছিল ইয়ামামা যুদ্ধের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট।
মুহকাম ইবনে তুফাইলের মৃত্যু
দুর্গের দরজা খুলে গেলে মুসলিমরা ভেতরে প্রবেশ করে। মুসাইলামার প্রধান উজির ও সেনাপতি মুহকাম ইবনে তোফায়েলকে লক্ষ করে খলিফা আবু বকরের পুত্র আবদুর রহমান বর্শা নিক্ষেপ করেন। বর্শাটি তার গলা ভেদ করে বের হয়ে যায় এবং সে ঘটনাস্থলেই মারা যায়। এতে মুসলিম সেনাবাহিনীর সাহস বেড়ে যায়; মুরতাদ বাহিনীর মনোবল ধসে পড়ে।
ওয়াহশি ইবনে হারবের হাতে মুসাইলামার মৃত্যু
ইয়ামামার মৃত্যুবাগিচায় মুসাইলামা কাজ্জাবের সামনে এমন এক মুসলিম যোদ্ধা এসে দাঁড়ালেন, যিনি জীবনের পুরনো ও বিশাল এক পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে চান। তিনি হাতে থাকা বর্শা নিখুঁত নিশানায় মহামিথ্যাবাদী মুসাইলামার হৃদপিণ্ড লক্ষ করে ছুড়ে মারেন। বর্শার অব্যর্থ লক্ষ্যভেদে পাপিষ্ঠ মুসাইলামা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তখন অন্য একজন সাহাবি তলোয়ারের আঘাতে মুসাইলামার গর্দান উড়িয়ে দেন। তিনি হলেন আবু দুজানা (রা.)। মুসাইলামাকে আঘাত করার কিছুক্ষণ পরই আবু দুজানা (রা.) এক মুরতাদের তীরের আঘাতে শহীদ হয়ে যান।
ইয়ামামা যুদ্ধের ফলাফল ও ক্ষয়ক্ষতি
মুসাইলামার হত্যায় মুরতাদদের মনোবল ভেঙে পড়ে। তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এই যুদ্ধে ৫০০ জন হাফেজে কোরআনসহ সর্বমোট ১ হাজার ২০০ জন মুসলিম সৈন্য শাহাদাত বরণ করেন। আর মুরতাদ বাহিনীর ১২ হাজার লোক মারা যায়।
পঞ্চম ও ষষ্ঠ বাহিনী : মদিনার উত্তর ও সিরিয়া সীমান্তের অভিযান
পঞ্চম বাহিনী : এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন প্রবীণ সাহাবি খালেদ ইবনে সাঈদ (রা.)। তার মূল লক্ষ্য ছিল উত্তরের খুজাআ গোত্রকে মোকাবিলা করা।
ষষ্ঠ বাহিনী : এই বাহিনীটি শামের সীমান্তের দিকে অগ্রসর হয় এবং এর সেনাপতি ছিলেন আমর ইবনুল আস (রা.)।
অভিযানের ফলাফল : এই দুটি বাহিনীকে বড় কোনো প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হয়নি। মুসলিম বাহিনী শামের কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই সেখানের বিদ্রোহী গোত্রগুলো ভয়ে পালিয়ে যায়। পরিস্থিতি শান্ত ও নিয়ন্ত্রিত হওয়ার পর তারা মদিনায় ফিরে আসে।