প্রাচীনকাল থেকে মানুষ বিস্মিত নয়নে চেয়ে দেখেছে নক্ষত্রখচিত আকাশ, বহমান জলধারা, আর রোদ-ছায়ার খেলা। কিন্তু আলো কীভাবে কাজ করে? মানুষ কীভাবে কোনো বস্তুকে দেখতে পায়? একসময় এগুলো ছিল দর্শন, জ্যামিতি ও অনুমানের জটিল প্রশ্ন।
যিনি সর্বপ্রথম এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন, তিনি হলেন আধুনিক অপটিকসের জনক দশ-এগারো শতকের বিজ্ঞানী আবু আলি হাসান ইবনুল হাইসাম।
৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে বসরার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে তার জন্ম হয়। তরুণ বয়সেই তিনি গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ও প্রকৌশলে অসামান্য প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন। সে সময়েই তার খ্যাতি দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। একবার তিনি দাবি করেছিলেন, সুযোগ পেলে নীলনদের বন্যার সমস্যা তিনি সমাধান করতে পারবেন। ফাতেমী খলিফা আলহাকেমের আমন্ত্রণে কায়রো গিয়ে নদীর বাস্তব অবস্থা দেখে ইবনুল হাইসাম বুঝতে পারলেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। কিন্তু খলিফার কাছে ব্যর্থতা স্বীকার করা ছিল বিপজ্জনক। তাই জীবন বাঁচাতে তিনি পাগলামির ভান করলেন। খলিফা তা বিশ্বাস করে তাকে নিজের বাড়িতেই গৃহবন্দি রাখলেন। ১০২১ সালে খলিফার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় ১০ বছর তিনি এ অবস্থায় ছিলেন।
কিতাবুল মানাজিরের জন্ম
গৃহবন্দি ১০ বছরেই ইবনুল হাইসাম রচনা করেন জীবনের শ্রেষ্ঠতম কীর্তি—কিতাবুল মানাজির (Book of Optics)। সাত খণ্ডের এই মহাকাব্যিক বিজ্ঞানগ্রন্থে তিনি আলোকবিজ্ঞানকে নতুন রূপ দিয়েছিলেন।
এই বিশাল রচনায় তিনি আলোর প্রকৃতি, দৃষ্টির প্রক্রিয়া, প্রতিফলন (ক্যাটোপট্রিকস) এবং প্রতিসরণ-সহ (ডায়োপট্রিকস) সবকিছুর এক সুসংবদ্ধ ও পরীক্ষাভিত্তিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন। এটি ছিল আধুনিক অপটিকসের জন্মসনদ। এই গ্রন্থের সবচেয়ে বিপ্লবী দিক ছিল ইবনুল হাইসামের পদ্ধতি। তিনি এখানে কেবল তত্ত্ব দিয়েই থামেননি, তিনি প্রতিটি অনুমানকে পরিকল্পিত পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করেছেন।
চোখ ও আলো সম্পর্কে মানবজাতির ভাবনা
ইবনুল হাইসামের কৃতিত্ব বোঝার জন্য তার পূর্বসূরিদের চিন্তা অনুধাবন করা প্রয়োজন। প্রাচীন গ্রিক বিজ্ঞানে আলো ও দৃষ্টিশক্তি নিয়ে মূলত দুটি প্রধান মতবাদ প্রচলিত ছিল—
নির্গমন তত্ত্ব (Emission Theory): চোখ থেকে একধরনের অদৃশ্য আলোকরশ্মি নির্গত হয়ে বস্তুটির ওপর গিয়ে পড়ে এবং সে কারণেই বস্তুটি দৃশ্যমান হয়।
প্রবেশ তত্ত্ব (Intromission Theory): বস্তুর রূপ বা ভৌত কণা বাতাস অতিক্রম করে মানুষের চোখে প্রবেশ করে। ফলে বস্তুটি দৃশ্যমান হয়।
শত শত বছর ধরে এই দুই তত্ত্বের মাধ্যমেই আলোবিদ্যার চর্চা স্থবির হয়ে পড়েছিল, যদিও এতে যুক্তিগত অসামঞ্জস্য ছিল স্পষ্ট। যদি চোখ থেকেই আলো বেরোয়, তবে অন্ধকারে কেন কিছু দেখা যায় না; কিংবা রাতের আকাশে দূরের কোনো তারা দেখতে পাওয়ার জন্য চোখের আলো কীভাবে মুহূর্তে কোটি মাইল অতিক্রম করে—এসব প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক উত্তর গ্রিক দার্শনিকদের কাছে ছিল না।
ইবনুল হাইসাম এসব তত্ত্বকে নাকচ করে দেন। ইবনে আল-হাইসাম গাণিতিক যুক্তি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ‘ইন্ট্রোমিশন থিওরি’ (Intromission Theory) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রমাণ করেন, আলো স্বপ্রভ বস্তু (যেমন সূর্য বা মোমবাতি) থেকে নির্গত হয়ে অন্য বস্তুর ওপর পড়ে এবং সেই বস্তু থেকে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে প্রবেশ করে। অর্থাৎ চোখ থেকে কোনো রশ্মি বের হয় না; বস্তু থেকে আসা আলো চোখে প্রবেশ করে বলেই আমরা দেখতে পাই।
ইবনুল হাইসামের কালজয়ী কিছু আবিষ্কার
ক. আলোর সরলরৈখিক গতি : তিনি সূর্যের আলো, আগুনের আলো ও প্রতিফলিত আলোসহ বিভিন্ন ধরনের আলো নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষা করেন। অন্ধকার ঘরের ছোট ছিদ্র দিয়ে আলো প্রবেশ করিয়ে (camera obscura) তিনি দেখান, আলো সমসত্ত্ব স্বচ্ছ মাধ্যমে সরলরেখায় অগ্রসর হয়।
খ. প্রতিফলন বিজ্ঞান : আয়নায় আমরা নিজেদের মুখ দেখি, আবার পানি বা কাচের পালিশ করা পৃষ্ঠেও আলো প্রতিফলিত হয়। কিন্তু প্রতিফলন কোন নিয়মে ঘটে—ইবনুল হাইসাম এই প্রশ্নটি গাণিতিক ও পরীক্ষামূলকভাবে অনুসন্ধান করেন। তার কিতাবুল মানাজিরের চতুর্থ বইয়ে প্রতিফলনের নিয়ম এবং পঞ্চম বইয়ে প্রতিফলিত আলোর মাধ্যমে দেখা প্রতিবিম্ব নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা আছে।
গ. চোখের গঠন (Anatomy of the Eye) : ইবনুল হাইসাম চোখের গঠন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন, যেখানে কর্নিয়া (Cornea), আইরিস (Iris), পিউপিল (Pupil), লেন্স (Lens) ও অপটিক নার্ভের (Optic Nerve) বর্ণনা ও চিত্র আছে। এ বিষয়ে গ্যালেন ও হুনায়ন ইবনে ইসহাকের মতো পূর্বসূরিদের জ্ঞানকে তিনি নিজের গবেষণায় কাজে লাগান।
ইউরোপের নবজাগরণে যাত্রা
মৃত্যুর প্রায় ১৫০ বছর পরে ইবনুল হাইসামের প্রভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। বারো ও তেরো শতকে ‘কিতাবুল মানাজির’ ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। মধ্যযুগ ও ইউরোপের রেনেসাঁয় এই গ্রন্থ গভীর প্রভাব ফেলে। রজার বেকন, জোহানেস কেপলার, রেনে দেকার্ত, ক্রিস্টিয়ান হাইগেন্স ও আইজ্যাক নিউটনের গবেষণায় ইবনুল হাইসামের কাজের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব ছিল।
রেনেসাঁ যুগের বিখ্যাত চিত্রশিল্পীরা (যেমন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি), যারা ক্যানভাসে আলো ও ছায়ার ত্রিমাত্রিক ছবি (Perspective Drawing) আঁকা শুরু করেছিলেন, তারাও ইবনুল হাইসামের জ্যামিতিক আলোকবিজ্ঞানের নীতি ব্যবহার করেছিলেন।
মহাকালের আলোয় ইবনুল হাইসাম
বিজ্ঞানে ইবনুল হাইসামের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে চাঁদের একটি গহ্বরের নাম রাখা হয়েছে ‘Alhazen’। একটি অ্যাস্টেরয়েডের নাম দেওয়া হয়েছে ‘59239 Alhazen’। ইউনেস্কো ২০১৫ সালকে ‘আন্তর্জাতিক আলোকবর্ষ’ ঘোষণা করে ইবনুল হাইসামের ‘কিতাবুল মানাজির’ রচনার এক হাজার বছর পূর্তি উদ্যাপন করে। ইবনুল হাইসামকে ‘Father of Modern Optics’ বা ‘আধুনিক অপটিক্সের জনক’ বলা হয়।
ইবনুল হাইসামের জীবনের পুরো গল্পটি আসলে মানুষের অদম্য কৌতূহল ও সত্যসন্ধানের এক মহাকাব্য। অন্ধকার বন্দিশালায় বসে যিনি সমগ্র বিশ্বকে আলো দেখার চোখ উপহার দিয়েছিলেন, সেই পথিকৃৎ বিজ্ঞানী আল-হাসান ইবনুল হাইসাম চিরকাল বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হয়ে থাকবেন। তার জীবন আমাদের শিক্ষা দেয়—চারপাশের অন্ধকারের দেয়াল যত বড়ই হোক না কেন, সত্যের আলো এক সামান্য ছিদ্র দিয়েই সব অন্ধকারকে দূর করে দিতে পারে।