২৫ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা, চারদিক অন্ধকারে ঢেকে আছে। সেই বিকেল থেকে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। থামার কোনো লক্ষণ নেই। পোড়োবাড়িটার দ্বিতীয় তলায় বসে আছে শামীম। এই শহরের শীর্ষ সন্ত্রাসী। সবসময় পুলিশের ওয়ারেন্ট লিস্টে থাকে। অবশ্য এখনো পুলিশের হাতে ধরা পড়তে হয়নি।
পোড়োবাড়িটার জানালাগুলো ভেঙে পড়েছে। দেওয়ালের ইটগুলোও খসে পড়ছে। পুরো বাড়িটা ঘিরে রেখেছে বিশাল এক বটগাছ। পুরো বাড়িটাতে ব্যাঙ, টিকটিকি ও মাকড়সা সংসার পেতেছে। আর শামীম বানিয়েছে ডেরা। কারণ এই বাড়িটার দিকে সহজে কেউ আসে না। তাই এটাই নিরাপদ আশ্রয় ওদের জন্য।
একটি ভাঙা চেয়ারে বসে আছে শামীম। একটু হেলান দিয়ে আরাম করে বসবে, সেই উপায় অবশ্য নেই। পেছন দিকে হেলান দেওয়ার কাঠগুলো ঘুণপোকায় খেয়েছে। তাই এটাকে চেয়ার বললে ভুল হবে, টুল বললে পারফেক্ট হবে।
রাত ৯টা, শামীমের সামনে বসে আছে জলিল। আর নিচতলায় আছে বিল্লাল। দুজনেই শামীমের খুব কাছের সহচর। উঠে দাঁড়ায়। পকেট থেকে রিভলবারটা বের করে। ট্রিগারে হাত রেখে জলিলের কপালে ঠেকায়। জলিল থরথর করে কাঁপছে।
‘ওস্তাদ, কী করছেন?’
‘তোর কী ধারণা, আমি খবর রাখি না?’
‘আমি কী করেছি?’
‘চেয়ারম্যানের সঙ্গে আঁতাত করিস। তার বউকে আমি রেপ করে খুন করেছি, এই খবর জানানো কি দরকার ছিল? কুত্তার...’
‘ওস্তাদ ভুল হয়েছে, মাফ করে দেন।’
‘আমাদের জগতে মাফ বলে কোনো শব্দ নেই। এখানে কোনো প্রমাণ রাখতে নেই। তোরে মরতে হবে।’
জলিল কিছু বলতে যাবে। তার আগেই ঠাস ঠাস... দুটি গুলির শব্দ। পোড়োবাড়ির শ্যাওলা জমা মেঝেতে পড়ে আছে জলিল। লাশের দিকে এগিয়ে যায় শামীম। তারপর জোরে একটা লাথি মারে। কোনো শব্দ বের হয় না। শামীম নিশ্চিত হলো জলিল মারা গেছে। ভাঙা জানালা দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ছে লাশের ওপর।
আবার চেয়ারে বসে শামীম। নিচতলা থেকে দৌড়ে আসে বিল্লাল।
‘ওস্তাদ, গুলির শব্দ হলো...’
‘হ্যাঁ, হয়েছে, নেমকহারামরে খালাস করে দিলাম।’
বিল্লাল দেখল, ভাঙা জানালার পাশে পড়ে আছে জলিলের নিথর দেহ। কপালের একপাশে গুলির চিহ্ন। এখনো রক্ত বের হচ্ছে। বৃষ্টির ফোঁটা ও রক্ত মিশে পানি লাল হয়ে গেছে। লাল পানি শ্যাওলা-পড়া মেঝেতে গড়িয়ে গড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
‘তাই বলে মেরে দিলেন!’
‘তোরে না কতবার বলেছি, আমাদের জগতে কোনো প্রমাণ রাখতে নেই। এই জগৎটা ভালো নয়। মাঝে মাঝে নিজের রিভলবারের গুলিতে নিজেরে মরতে হয়।’
বিল্লাল আর কোনো কথা বলে না। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জলিলের লাশের দিকে। এখন বৃষ্টি নেই। এত সময় বটগাছে বসে ঝিমানো পাখিগুলো এবার ডানা ঝাপটে উড়ে যাচ্ছে।
‘বিল্লাল, তুই এখানে থাক। আমি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি। আমি না আসা পর্যন্ত আবার কোথাও যাস না।’
বিল্লাল শামীমের কথায় মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। মুখ দিয়ে কিছু বলল না। শামীম উঠে দাঁড়াল। তারপর শ্যাওলা-জমা সিঁড়ি বেয়ে সাবধানে বের হলো।
শামীমের চেয়ারে বসে আছে বিল্লাল। একবার মনে করল, জলিলের লাশটা সরাবে। তারপর কী মনে করে আর সরাল না। পকেট থেকে সিগারেট বের করে বিল্লাল। একটার পর একটা জ্বালাতে থাকে। একসময় সব সিগারেট শেষ। অথচ শামীম এখনো ফিরল না। বিল্লালের একটু বাড়িতে যেতে হবে। নতুন বিয়ে করেছে, কিন্তু সময় দিতে পারে না। আজ যাবে বলে রেখেছে। না গেলে হয়তো অনেক রাগ করবে।
রাত ১২টা, এখনো ফেরেনি শামীম। কোনো বিপদে পড়েছে কি না কে জানে। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে বিল্লাল। শামীমের নম্বরে তিনবার কল করল। তিনবারই নম্বরটা বন্ধ দেখাল। আর দেরি না করে পোড়োবাড়ি থেকে বের হয় বিল্লাল। তারপর নিজের বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে।
বাড়িতে পৌঁছে দরজায় কয়েকবার নক করে। ওপাশ থেকে কোনো সাড়া আসে না। বিল্লাল ভাবছে, তার বউ রোজিনা হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। আবার নক করতে যাবে, তখনই দরজা খোলে রোজিনা।
রোজিনাকে জড়িয়ে ধরে খাটের দিকে যায় বিল্লাল। ‘আমি একটু ওয়াশরুম থেকে আসি,’ বলে উঠে যায় রোজিনা। বিল্লাল বাধা দিল না। খাটের সবকিছু এলোমেলো হয়ে আছে। কিছু যেন সন্দেহ হলো বিল্লালের। পুরো ঘরটা এক নজর দেখে নিল। খাটের কোনায় চোখ যেতেই মাথা গরম হয়ে যায়। সেখানে পুরুষের জামা পড়ে আছে!
রোজিনা ফিরতেই একটা লাথি মারে হাঁটুতে। হুমড়ি খেয়ে খাটের ওপর ধাক্কা খেল রোজিনা। তাতে কপালে অনেকটা কেটে গেছে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। এবার চুলের মুঠি ধরে দেওয়ালের সঙ্গে ঠেসে ধরে। ব্যথায় কাতরে ওঠে রোজিনা। নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু কোনোভাবেই বিল্লালের সঙ্গে পেরে ওঠে না।
‘তুমি আমাকে এভাবে মারছ কেন? আমি কী করেছি?’
‘তুই জানিস না কী করেছিস? আমার ঘরে কোন পুরুষ এসেছিল শুনি?’
‘ফালতু কথা বলবে না।’
‘আমি ফালতু কথা বলছি? তাহলে এই জামা কার? আমার তো না!’
চুপ হয়ে যায় রোজিনা। এই প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না সে।
‘কী রে কথা বলিস না কেন?’ বলল বিল্লাল।
এবার যেন প্রতিবাদী হয়ে উঠতে চায় রোজিনা। জোরালো গলায় বলল, ‘আমি তোমার কাছে এটা বলতে বাধ্য নই। তোমাকে বিয়ে করে আমি কী পেয়েছি? নতুন বউ ঘরে রেখে বাগানে বাগানে ঘুরে বেড়াও। মানুষ খুন করো। এটা কোনো জীবন?’
রোজিনার গলা টিপে ধরে বিল্লাল। শ্বাস নিতে পারছে না সে। চোখ দুটো যেন বের হয়ে আসবে। পকেট থেকে রিভলবার বের করে। তারপর রোজিনার বুকে চেপে ধরে। রোজিনা হাতের ইশারায় কিছু বলতে যাবে। কিন্তু পারল না। ঠাস ঠাস... গুলির আওয়াজ। রোজিনার নিথর দেহ খাটে শুইয়ে দেয় বিল্লাল। সেখানে বসে পরপর তিনটা সিগারেট জ্বালাল। তখন দরজা দিয়ে কেউ যেন পালিয়ে গেল। কিছুই বলল না বিল্লাল।
রোজিনার লাশটা জড়িয়ে ধরে বিল্লাল। ওর চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। বৃষ্টির ফোঁটার মতো টপটপ করে পানি ঝরছে। উঠে দাঁড়াল বিল্লাল। রান্নাঘর থেকে একটি বস্তা আনে। দুই হাত দিয়ে রোজিনার মুখটা আলতো করে ছুঁয়ে দেয়। বেশ কিছুক্ষণ ধরে রোজিনার মুখটাকে দেখল। তারপর বস্তায় ভরল। ঘাড়ে করে নিয়ে গেল নদীর পাড়ে। এটুকু আসতে আসতে ঘেমে ভিজে গেছে। মৃত্যুর পর মানুষ হয়তো ভারী হয়ে যায়। শরীরের ওজনের সঙ্গে হয়তো পাপের ওজনও যোগ হয়েছে, ভাবছে বিল্লাল। না, আর দেরি করা ঠিক হবে না। কেউ দেখে ফেললে বিপদ বাড়বে। বস্তাটা নদীতে ফেলে দিল। তারপর অদ্ভুতভাবে হাসতে থাকে, যেন শয়তান। তারপর পোড়োবাড়িটার দিকে হাঁটতে থাকে।
রাত ৪টা, শামীম সেই ভাঙা চেয়ারে বসে আছে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিল্লাল। কারো মুখে কোনো কথা নেই। এভাবেই কেটে গেল কিছু সময়। হঠাৎ দৌড়ে গিয়ে শামীমের বুকে লাথি মারে বিল্লাল। ভাঙা চেয়ার উল্টে মেঝেতে পড়ে যায় শামীম। উঠে দাঁড়ানোর আগেই ডান মুঠি করে ঘাড়ের রগ বরাবর ঘুষি মারে বিল্লাল। মেঝের সঙ্গে জোরে ধাক্কা খেল শামীম। ওর নাক দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। শামীমের রিভলবারটা ছিটকে পড়ে আছে জানালার পাশে, যেখানে পড়ে আছে জলিলের নিথর দেহ।
বিল্লাল এগিয়ে গিয়ে রিভলবারটা হাতে নিল। ট্রিগারে আঙুল দিয়ে শামীমের দিকে তাক করে।
‘বিল্লাল, তোর মাথা ঠিক আছে তো? আমারে কেন মারছিস? আমার দিকে রিভলবার ধরে রেখেছিস কেন?’
‘ওস্তাদ, আপনাকে মরতে হবে!’
‘ওস্তাদের সঙ্গে এভাবে কেউ মজা করে না। রিভলবারটা নামা। আমি সত্যি ভয় পাচ্ছি।’
‘এই রিভলবার নামবে না। আপনিই তো বলেছেন, আমাদের জগতে কখনো কখনো নিজের রিভলবারের গুলিতে নিজেকে খুন হতে হয়। আজ আপনার সেই দিন এসেছে।’
‘তুই আমাকে কেন খুন করবি?’
‘আপনিই তো শিখিয়েছেন, আমাদের জগতে কোনো প্রমাণ রাখতে হয় না।’
‘কিন্তু, আমি তো তোর কোনো ক্ষতি করিনি।’
‘করেছেন, অনেক বড় ক্ষতি করেছেন। তাই আমি কোনো প্রমাণ রাখতে চাই না।’
‘কীসের প্রমাণের কথা বলছিস? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’
শামীমের কথা শুনে চিৎকার করে হেসে ওঠে বিল্লাল। অদ্ভুত শয়তানি হাসি। তারপর বলল, ‘আমি যখন রোজিনাকে গুলি করি, তখন আপনি আমার ঘরের দরজার পাশে লুকিয়ে ছিলেন। আয়নাতে আপনাকে আমি দেখতে পাচ্ছিলাম। আর খাটের ওপর আপনার আন্ডারওয়্যার পড়ে ছিল। আপনাকে মরতে হবে ওস্তাদ।’
আবার সেই শয়তানি হাসিতে ফেটে পড়ে বিল্লাল। পোড়োবাড়িতে ওর হাসি যেন বারবার প্রতিধ্বনি হচ্ছে। শয়তানি হাসিতে চাপা পড়ে পরপর চালানো তিনটি গুলির শব্দ।