হোম > সাহিত্য সাময়িকী > গল্প

রুহিতা নায়িকা হতে চেয়েছিল

সাহেদ বিপ্লব

যৌবনের মোহনীয় সময়ে দাঁড়িয়েছে রুহিতা। বাবা অনেক স্বপ্ন দেখে মেয়েটিকে নিয়ে—‘পড়ালেখা শিখে অনেক বড় মানুষ হবে। মানুষে বলবে, আমি মেয়েকে মানুষ করতে পেরেছি।’

রুহিতার পড়ালেখার প্রতি খুব একটা ঝোঁক নেই, কলেজ থেকে ফেরার পথে কত ছেলে তার দিকে তাকিয়ে থাকে তার হিসাব নেই। অনেকেই বলেছে, ‘তুমি দেখতে ববিতার মতো। পাগল না হয়ে পারি না।’

রুহিতা হেসে চলে গেছে। উত্তর দেয়নি।

রুহিতা সব ছেলেদের পেছনে ফেলে এগিয়ে চলেছে তার স্বপ্নের পথে। যৌবন-রূপ-রস-সৌন্দর্য নিয়ে একদিন রুপালি জগতের নায়িকা হবে সে।

কায়ছার বাবু কীভাবে যেন জেনেছে রুহিতা রুপালি জগতের নায়িকা হতে পাগল, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রেমের বাঁধনে বাঁধা যাবে।

কলেজ থেকে ফেরার পথে কায়ছার বাবু রুহিতার পথের সামনে দাঁড়িয়ে বলে, তুমি রুহিতা না?

হ্যাঁ, কেনো বলুন তো!

আমি কায়ছার বাবু। রুপালি জগতের মানুষ। বেশ কিছু ছবি বানিয়েছি।

রুহিতা এমন কথা শুনে আনন্দে নেচে উঠল। এমন একটা মানুষকে এতদিন খুঁজছে সে, আর সেই স্বপ্নের মানুষ আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, বিশ্বাস হচ্ছে না।

তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না, রুহিতা?

রুহিতা অবাক হয়ে বলে, আপনি কীভাবে বুঝলেন?

আমরা রুপালি জগতের মানুষ। মনের কথা যদি বুঝতে না পারি, তাহলে সিনেমা বানাতে পারতাম?

রুহিতা একটু হাসল।

হাসির কথা নয়, আমরা মনের কথা বুঝি বলেই এইসব প্রেমের সিনেমা বানাতে পারি। তুমি সালমান শাহ’র ছবি দেখনি?

জি দেখেছি।

আমিই তো সালমান শাহকে রুপালি জগতে আনলাম, আগে চিনত কে?

রুহিতা বলল, আমি কি পারব রুপালি জগতে অভিনয় করতে?

কী যে বলো, তোমার রূপ দেখে ছেলেরা পাগল হয়ে যাবে! শাবানা, ববিতাশাবনুরের চেয়ে তোমার রূপ কত সুন্দর। তোমার ছবি দেখলে ছেলেরা হল ছাড়বে না।

রুহিতা লজ্জায় লাল হয়ে যায়।

লজ্জা পাওয়ার কী আছে, তোমার রূপ দেখে আমিই পাগল হয়ে যাচ্ছি; আর ছেলেদের কী বলবএভাবে কায়ছার বাবু তার আসল কথা বলে দিল।

রুহিতা হাসল।

আমি আসি।

আবার কবে দেখা হবে?

তুমি যেদিন চাও। আমি পাশের গ্রামে এসেছি, দু-চার দিন থাকব।

রুহিতা একটু লজ্জার মাথা খেয়ে বলল, কাল আপনার সঙ্গে দেখা হবে?

যদি তুমি চাও।

ঠিক আছে।

দু-চার দিন দেখা হওয়ার পর একসময় প্রেমে পরে গেল রুহিতা। একদিন বাড়ি থেকে সব গুছিয়ে কায়ছার বাবুর হাত ধরে ঢাকার পথে পাড়ি দিল।

সুন্দর সাজানো-গোছানো একটা বাসায় উঠল। একদিন বিকালবেলায় কাজি অফিস থেকে নামমাত্র বিয়ে করে এলো।

প্রতিদিন বাজার থেকে ভালো ভালো সদাই করে ফেরে, তেলে ভাজা মাছ খেয়ে দিন ভালোই চলছে।

রুহিতা বলে, তুমি এফডিসিতে যাবে না? এভাবে বসে থাকলে চলবে?

তুমি যে কী বল না! বিয়ে এক মাস হলো, একটু আনন্দ করে নিই, তারপর যাব; আর তোমাকে অভিনেত্রী করেই ছাড়ব। দেখতে হবে না—তুমি কার বউ!

রুহিতা আর কিছু না বলে চুপ করে থাকে। স্বামী যখন রুপালি জগতের মানুষ, তাহলে এত তাড়া কীসের? একদিন সব হবে।

একদিন বিকালবেলা অনেক সদাই করে বাসায় ফিরে রুহিতার হাতে দিয়ে বলল, আজ একটা সুসংবাদ আছে।

কী সুসংবাদ?

আগে ভালো করে রান্না করে নিয়ে এসো খেতে খেতে বলা যাবে।

রুহিতা আর কথা বাড়াল না।

খেতে খেতে বলল, একটা ভালো কাহিনি পেয়েছি। এমন একটা কাহিনির জন্য অনেক বছর অপেক্ষা করেছি, তুমি হবে সেই ছবির নায়িকা।

রুহিতা হাসল। তার স্বপ্ন সফল হতে যাচ্ছে। গ্রামের মানুষ দেখবে, আমার স্কুলের বন্ধুরা দেখবে। কী মজা, বলে বোঝাতে পারব না।

কায়ছার বাবু বলল, কিন্তু রুহিতা...।

কিন্তু কী?

যে টাকা আমার কাছে আছে, তা দিয়ে তো সিনেমা হবে না।

আমার সোনার গহনা আছে বেঁচে দাও।

কায়ছার বাবু হেসে দিয়ে বলল, লক্ষ্মী বউয়ের মতো কথা বলেছ। সুখে-দুঃখে আমরা দুজনেই তো, তা-ই না? ছবির ব্যবসাটা সফল হলে চারগুণ টাকা ঘরে আসবে, তখন সব সোনার গহনা বানিয়ে দেব।

আচ্ছা দিও।

সকালবেলা গহনা নিয়ে বেরিয়ে গেল, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামে সে ফেরে না। পরের দিনও সে আসে না, তারপরের দিনও নয় এবং একসময় দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে যায় সবকিছু।

একসময় কোনোমতে ঘরের ভাড়াটা মিটিয়ে দিয়ে অচেনা বস্তিতে ঠাঁই হলো রুহিতার। সে এক অন্য রকম জীবন। দুদিন না খেয়ে অন্ধগলি-ফর্সাগলি পেরিয়ে একদিন খুঁজে পায় রুপালি জগতের আলো-অন্ধকার ভুবন।

খুব একটা ভালো চরিত্র পায়নি। সবাই বলে, লেগে থাকো—একদিন বড় মাপের অভিনেত্রী হবে। কিন্তু কবে? তারপর বেশ কিছু মাস ডাক আসে না ডিরেক্টরের পক্ষ থেকে।

একদিন এফডিসির প্রধান গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে সুমি হাত ধরে থামিয়ে বলে, কেমন আছিস?

হ্যাঁ ভালো, কিন্তু বেশ কিছু মাস ধরে ডাক পাচ্ছি না কারো পক্ষ থেকে?

তুই যেভাবে চলছিস, সেভাবে চললে ডাক পাবি না কোনোদিন।

কেন?

বুঝিস না, বলেই একটু থেমে বলে, আয় তোকে পরিচয় করিয়ে দিই।

ডিরেক্টরের কাছে নিয়ে বলল, বস, এ আমার বান্ধবী, ভালো অভিনয় করে। আপনি যদি একটু সুযোগ দিতেন।

ডিরেক্টর বাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ঠিক আছে দেখব।

না বস, এভাবে বললে তো হবে না, আপনাকে একটু সুযোগ দিতেই হবে, বলে রুহিতার দিকে তাকিয়ে সুমি বলল, খুব নামকরা ডিরেক্টর। তার হাত দিয়ে শাবানা-ববিতা নায়িকা হয়েছে।

ডিরেক্টর সুমির দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি যখন এত করে বলছ তোমার কথা রাখব। একটু থেমে রুহিতার দিকে তাকিয়ে বলল, কী নাম তোমার?

রুহিতা।

খুব ভালো নাম। এই নামে আমাদের রুপালি জগতে কেউ নেই। তুমি পারবে অভিনয় করতে?

রুহিতা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল।

ডিরেক্টর সুমিকে বলল, ভালো করে অভিনয় বুঝিয়ে দাও, যাতে পরে ঝামেলা না হয়। এ কথা বলেই ডিরেক্টর চলে গেল, একবারও ফিরে তাকাল না।

সুমি ডিরেক্টরের ঠিকানার কার্ড হাতে দিয়ে বলল, এই ঠিকানামতো দেখা করিস।

রুহিতা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল।

পরের দিন বাসায় গেলেই ডলেপিষে নায়িকা হওয়ার মন্ত্র বুঝিয়ে দেয় দেহের শিরায়-উপশিরায়।

ডিরেক্টর বলল, সিনেমার আসল দর্শক তো ষোলো থেকে কুড়ি বছরের ছেলেরা। ওদের কাছে যদি নিজেকে ঠিকঠাক পৌঁছে দিতে পার। এমনকি তোমার কথা মনে হলেই শরীর গরম হয়ে যাবে, এমন যদি করতে পার, তাহলে তুমি হয়ে যাবে হিট নায়িকা।

রুহিতা মাথা নিচু করে বসে রইল।

রাস্তার পথ ধরে বাসায় ফেরে রুহিতা। বড্ড ক্লান্ত লাগে তার। বাসায় ফিরে হাতব্যাগটা রেখে বিছানায় গড়িয়ে পড়ে রুহিতা। শরীরে একবিন্দু শক্তি নেই। কী হবে ভবিষ্যৎ, ফেলে আসা দিন, প্রিয় গ্রাম, গ্রামের মানুষ। মনে পড়ে কলেজের জীবন কত আনন্দের ছিল। বড় হয়ে কেউ ডাক্তার হবে, কেউবা সচিব। একজন বলেছিল, বড় হয়ে প্রধানমন্ত্রী হবে। তা নিয়ে কত হাসাহাসি হলো। সেই দিনগুলো আজ হারিয়ে ফেলেছি রুপালি জগতের মানুষ হতে এসে। মা-বাবাভাইবোনের মনে দুঃখ আর সামাজিক অপমান লেপ্টে দিয়ে কায়ছার বাবুর ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে এই শহরে এসেছিলাম শুধু অভিনেত্রী হওয়ার জন্য, কিন্তু কী পেলাম? আজ কোনোভাবেই হিসাব মিলাতে পারছি না। এসব ভাবতে ভাবতে চোখের পানি ধরে রাখতে পারে না রুহিতা।

প্যারালাল ইউনিভার্স থেকে

যেভাবে বেড়ে উঠি (তৃতীয় পর্ব)

অপেক্ষা ও অশরীরী জ্যামিতি

পতাকা

বিমূর্ত দোলাচল

পোয়েটস অ্যাভেন্যু

দিলা গড়েতির দ্বিতীয় বাসর

নায়িকার ছবি

অবসর জীবনে

আম্মা ও কুইন্সল্যান্ড