আগামী সাত দিনের মধ্যে আওয়ামী লীগের দোসর ও তথ্য সন্ত্রাসীদের জবাবদিহি না করলে ‘মার্চ টু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়’-এর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জাগ্রত জুলাইয়ের সভাপতি মুন্সি বোরহান মাহমুদ। পাশাপাশি অভিযুক্ত সাংবাদিকদের মিডিয়ায় স্মারকলিপি দেওয়া এবং তার নিচে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার বিকাল ৪টায় শহিদ ওসমান হাদি চত্বরে (শাহবাগ জাদুঘরের সামনে) আয়োজিত মানববন্ধনে তিনি এই ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার আমলে গণমাধ্যমের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চালানো দখলদারিত্ব ও বিকৃতির বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিবাদ জানাতে আমরা এখানে এসেছি। আওয়ামী দুঃশাসনের সময় দীর্ঘ ১৭ বছর গণমাধ্যমে যে পরিমাণ তথ্য সন্ত্রাস আমরা দেখেছি, সেই তথ্য সন্ত্রাসের বিষয়ে এই সরকার কী ব্যবস্থা নিচ্ছে—সে প্রশ্নেই আমাদের আজকের মানববন্ধন।
আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই—গত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের সময় গণমাধ্যমকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। বিগত সময়ে ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় একটি অপ-সাংবাদিকতা সিন্ডিকেট তৈরি করা হয়েছে, যারা সাংবাদিকতার নামে মিথ্যাচার, চরিত্রহনন এবং বিভ্রান্তি ছড়ানোর কাজে লিপ্ত ছিল। এই চক্র গণমাধ্যমকে জনগণের কণ্ঠস্বর থেকে সরিয়ে ক্ষমতার প্রচারযন্ত্রে পরিণত করেছিল। তথ্যকে ব্যবহার করা হয়েছে অস্ত্র হিসেবে—চালানো হয়েছে নগ্ন ‘তথ্য সন্ত্রাস’। সত্যকে চাপা দেওয়া হয়েছে, মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে, আর ভিন্নমতকে নির্মমভাবে দমন করা হয়েছে।
আমরা দেখেছি—যারা সত্য বলেছে, তারা হয়রানি, মামলা, চাকরি হারানো, এমনকি হত্যার হুমকি ও শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হয়েছে। সেই শঙ্কা নিয়ে নতুন নির্বাচিত সরকার আবারও সেই পুরোনো তথ্য সন্ত্রাসীদের পুনর্বাসন করছে কি না, সেটি জাতি জানতে চায়।
আরও স্পষ্ট করে বলতে চাই, এই অপ-সাংবাদিকতার নেপথ্যের অনেকেই এখনও গণমাধ্যমের ভেতরে ঘাপটি মেরে আছে। তারা আজও সুযোগের অপেক্ষায়—আবারও গণমাধ্যমকে দখল করতে, আবারও মিথ্যাকে সত্য বানাতে, আবারও জনগণকে প্রতারিত করতে। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। আমরা দেখেছি, বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল ও পডকাস্ট চ্যানেল তৈরি করে কালচারাল ফ্যাসিস্ট, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
আপনারা দেখেছেন, ওসমান হাদীকে হত্যা করার পর আনন্দে মেতে উঠেছিল আনিস আলমগীর; সেই আনিস আলমগীরকে জামিন করিয়ে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করতে দেখেছি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে। এই আনিস আলমগীর বেগম জিয়ার চিকিৎসা থেকে শুরু করে বিএনপির বিরুদ্ধে নগ্নভাবে কাজ করেছিল। তার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছেন তারেক রহমান—এটা জাতির জন্য লজ্জাকর।
এছাড়া আমরা দেখছি আশিকুর রহমান শ্রাবণ, যিনি বর্তমানে নিউজ২৪ টেলিভিশনের সিএনই, মাল্টিমিডিয়া ও অনলাইন ইনচার্জ হিসেবে বহাল তবিয়তে আছেন। তিনি জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানবিরোধী ছিলেন। তার নেতৃত্বে নিউজ ২৪, রাহুল রাহা, খুনি হাসিনা ও গংদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে। এই শ্রাবণ গ্যাং বিভিন্ন নারী সহকর্মীদেরকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে কুপ্রস্তাব ও অবৈধ কাজ করতে বাধ্য করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তার নেতৃত্বে খুনি হাসিনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গোপন সেল থেকে কাজ করা হয়েছে, যেখান থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়েছে। খুনি হাসিনার এজেন্ট হয়ে কাজ করছে। তার পৃষ্ঠপোষকতায় আলোচিত মুনিয়া হত্যাকারীদের সকল প্রকার সহযোগিতা করা হয়েছে। এত কিছুর পরও বসুন্ধরা গ্রুপ তাকে প্রোমোশন দিয়ে চিফ নিউজ এডিটর বানিয়েছে এবং টেলিভিশনের মাল্টিমিডিয়া ও অনলাইন-এর ইনচার্জ করেছে। ফলে গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে কাজ করা তার জন্য আরও সহজ হয়েছে। তার বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়ী থানায় হত্যা মামলা ও তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে তার সাংবাদিকতার অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল হওয়ার পরও তাকে প্রোমোশন দিয়ে সিএনই করেছে ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ।
এছাড়া জুলাই আন্দোলনে হত্যা চেষ্টা মামলার আসামি ও ফ্যাসিবাদের দোসর বৈশাখী টিভির ডিএমডি টিপু আলম বহাল তবিয়তে আছে। বৈশাখী মিডিয়া লিমিটেডের ১ শতাংশ মালিকানার দাপটে অস্থির করে রেখেছে এই টিপু আলম। বিগত ফ্যাসিবাদের সময় যে কয়টি টিভি সরকারের আজ্ঞাবহ ছিল, তার অন্যতম বৈশাখী। বৈশাখীতে শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর ১২৬০ পর্বের প্রতিবেদন প্রচারিত হয়, যার নেপথ্যে ছিল টিপু আলম ও অশোক চৌধুরী। বৈশাখীর অর্থায়নে শেখ মুজিবের অন্তত শতাধিক মুখাবয়ব বানিয়ে আওয়ামী আমলে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে খুশি করতেন টিপু আলম। শেখ মুজিবের মাজার জিয়ারতে পুরো বৈশাখীর বিভিন্ন বিভাগের প্রধানদের নিয়ে যান—নিরপেক্ষতার আড়ালে এই তথ্য সন্ত্রাসী।
কালের কণ্ঠে বহাল তবিয়তে আছে আরেক ফ্যাসিস্ট ও আওয়ামী গণহত্যার সহযোগী হায়দার আলি। সে শেখ হাসিনার খুবই ঘনিষ্ঠ ছিল। তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে ক্রসফায়ারের বৈধতা দেওয়ার ন্যারেটিভ নির্মাণ করার অভিযোগ আছে। আজও সে শেখ হাসিনাকে নিয়ে গণমাধ্যমে ন্যারেটিভ নির্মাণ করে চলেছে। সর্বশেষ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সে কালের কণ্ঠে মিথ্যা ও ভুয়া সংবাদ প্রচার করেছে। তার বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যার একাধিক মামলা রয়েছে। এমন একজন তথ্য সন্ত্রাসী এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছে—এটা জাতির জন্য দুর্ভাগ্য।
আমরা দেখছি—সময় টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ জুবায়ের এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছে। সে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় বিপ্লবীদের সন্ত্রাসী বানানোর জন্য সময় টিভিকে ব্যবহার করেছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যার একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
স্বৈরাচারী হাসিনার আরেক দোসর হলো তুষার আবদুল্লাহ, যিনি ফ্যাসিবাদের পুরো সময়জুড়ে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা মেশিন সময় টেলিভিশনের হেড অব নিউজের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি সময় টেলিভিশনের পরিচালকের পাশাপাশি সম্পাদকীয় প্রধানের দায়িত্বও পালন করছেন। ইসলামবিদ্বেষী এই তুষার আবদুল্লাহ গণতন্ত্র হত্যার পাশাপাশি সবসময়ই আওয়ামী ও বাম কালচারাল ফ্যাসিস্টদের প্রোমোট করার দায়িত্ব পালন করে থাকেন। ৫ আগস্ট স্বৈরাচার হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরও এখন টেলিভিশনে প্রথমদিকে তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে বাধা সৃষ্টি করতেন এই তুষার। জুলাই গণহত্যায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলার আসামি তুষার আবদুল্লাহ সম্প্রতি জুলাই অভ্যুত্থান ও গণভোটের পক্ষে সাংবাদিকতা করার অভিযোগ এনে এখন টেলিভিশনের চারজন সিনিয়র রিপোর্টারকে গত দুই মাস ধরে বাধ্যতামূলক ছুটিতে রেখেছেন, যা বাংলাদেশপন্থী সাংবাদিকতার সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান।
আমরা সতর্ক করে দিতে চাই—গণমাধ্যম কোনো রাজনৈতিক দলের দাস নয়, হবে না। সাংবাদিকতা কোনো প্রোপাগান্ডা মেশিন নয়; এটি সত্য বলার সংগ্রাম। আর এই সংগ্রামকে যারা বিক্রি করেছে, তাদের জবাবদিহি করতেই হবে। এমন আরও কয়েক ডজন সাংবাদিকতা পেশার আড়ালে তথ্য সন্ত্রাসী রয়েছে। গণমাধ্যমে লুকিয়ে থাকা এসব তথ্য সন্ত্রাসীদের অবিলম্বে খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এসব সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে মার্চ করবে জাগ্রত জুলাই। পাশাপাশি অভিযুক্ত সাংবাদিকদের মিডিয়ায় স্মারকলিপি দেওয়া ও তার নিচে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে।
জাগ্রত জুলাইয়ের দাবি: ১. অপ-সাংবাদিকতা ও তথ্য সন্ত্রাসে জড়িত সকল ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে অবিলম্বে জবাবদিহিতা ও বিচারের আওতায় আনতে হবে।
২. গণমাধ্যমের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবের সব পথ বন্ধ করতে হবে।
৩. সাংবাদিকদের ওপর হয়রানি ও নিপীড়ন বন্ধ করতে হবে এবং দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৪. গণমাধ্যমের ভেতরে লুকিয়ে থাকা দখলদার ও স্বার্থান্বেষী চক্রকে অপসারণ করতে হবে।
৫. প্রকৃত স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পেশাদার সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
৬. জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করতে তথ্যপ্রবাহ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করতে হবে।
মানববন্ধনে আরও বক্তব্য রাখেন, জুলাই সংগঠক ও সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব কবি শামিম রেজা, কবি মইন মুনাতাছির, কবি নোমান সাদিক, মোহাম্মদ ওয়ালীউল্লাহ, আহত জুলাই যোদ্ধা ও সংগঠক বাবু এমদাদ প্রমুখ।