ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব দেওয়া এই তরুণের শৈশব কেটেছে মাদরাসা, স্কুল ও বাবার ছোট্ট কাপড়ের দোকানে। পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই বাবার ব্যবসায় সহযোগিতা করতেন। তার ভাষায়, দোকানে বসে ক্রেতা সামলানো ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মেশার অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তার নেতৃত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সম্প্রতি ইনোভা টকস পডকাস্টে নিজের শৈশব, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, শিক্ষাজীবন ও নেতৃত্বের বিকাশ নিয়ে কথা বলেন সাদিক কায়েম।
নিজের জন্মস্থান ও শৈশবের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার জন্ম হয়েছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়াতে। ওইখানে বায়তুশ শরফ আতিকিয়া মাদরাসায় ক্লাস ওয়ান পড়েছি। আব্বু ব্যবসা করতেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায়। তো ব্যবসার সুবাদে আমরা খাগড়াছড়িতে আসি।’
খাগড়াছড়িতে বাবার একটি কাপড়ের দোকান ছিল জানিয়ে সাদিক কায়েম বলেন, ‘খাগড়াছড়িতে দাখিল পরীক্ষা দিই। পাশাপাশি আমার আব্বার একটা দোকান ছিল। ছোটবেলা থেকে আমি যতটুকু পড়াশোনা করেছি, তার চাইতে ব্যবসা-বাণিজ্য বেশি করেছি।’
চট্টগ্রামের মানুষের ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। সাদিক কায়েম বলেন, ‘আমাদের চট্টগ্রাম এলাকার একটা ঐতিহ্য হচ্ছে, যে যা-ই করুক না কেন, প্রত্যেকেই ব্যবসার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। তাদের ব্যবসায়িক সেন্সটা অনেক ভালো এবং ব্যবসায় তারা অনেক ভালো করে।’
চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজার, টেরী বাজারসহ বিভিন্ন ব্যবসাকেন্দ্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে চট্টগ্রামের মানুষের ব্যবসায়িক উপস্থিতির কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
বাবার কাপড়ের দোকানে নিয়মিত বসার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে ডাকসু ভিপি বলেন, ‘ওইখানে আমি নিয়মিত আমার মাদরাসা শেষ করে এসে দোকানে বসতাম। এটাও আমার সামগ্রিক নেতৃত্ব, সমাজকে বোঝা ও রাষ্ট্রকে বোঝার ক্ষেত্রে আমাকে অনেক বেশি সহায়তা করেছে।’
খাগড়াছড়ির বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতাও তার নেতৃত্বের বিকাশে ভূমিকা রেখেছে বলে জানান সাদিক কায়েম। তিনি বলেন, ‘পার্বত্য এলাকায় চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, রাখাইন ও মুসলিমসহ নানা বৈচিত্র্যময় সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করে। ওই জনগোষ্ঠীর মানুষরা কী চিন্তা করে এবং তাদের সঙ্গে একসঙ্গে বেড়ে ওঠা—এটাও আমার নেতৃত্বের ক্ষেত্রে আমাকে অনেক হেল্প করেছে।’
দোকানে বিভিন্ন ধরনের ক্রেতার সঙ্গে ‘তায়ামুল’ করার অভিজ্ঞতা থেকে মানুষের আচরণ বোঝার দক্ষতাও তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি। সাদিক কায়েম বলেন, ‘ক্রেতা দেখে চেহারা বুঝে ফেলতে হয় কার কতটুকু সামর্থ্য আছে।’
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো ক্রেতা এসে সবচেয়ে ভালো জামা চাইলে শুরুতেই সবচেয়ে দামি জামা দেখানো হতো না। বরং তুলনামূলক কম দামের পণ্য দেখানোর পর ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী ধীরে ধীরে ভালো পণ্য দেখানো হতো।
তার ভাষায়, ‘সবকিছুই ছোটবেলা থেকে দোকানে বসা, ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি করা এবং বৈচিত্র্যময় সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে মেশা—সব মিলিয়ে এটি আমার সামগ্রিক গঠনে অনেক বেশি সহায়তা করেছে।’
সাদিক কায়েমের শিক্ষাজীবনও ছিল নানা বাঁকে ঘেরা। শুরুতে মাদরাসায় পড়লেও পরে খাগড়াছড়ি ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে ভর্তি হন। তিনি বলেন, ‘আমি ক্লাস ফোরে স্কুলে ভর্তি হই। খাগড়াছড়ি ক্যান্টনমেন্ট স্কুল বলা হয়। ওইখানে কিছুদিন পড়াশোনা করার পর আমি আবার চলে আসি। আমার আম্মুর ইচ্ছা ছিল আমাকে আলেম বানাবেন।’
মায়ের ইচ্ছায় আবার মাদরাসায় ফিরে যান তিনি। পরে অষ্টম শ্রেণিতে জেএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ-প্লাস পান। তখন তার বাবা তাকে বিজ্ঞান বিভাগে পড়িয়ে চিকিৎসক বা প্রকৌশলী বানাতে চেয়েছিলেন।
সাদিক কায়েম বলেন, ‘তখন আব্বুর ইচ্ছা ছিল আমাকে সায়েন্সে পড়াবে, ইঞ্জিনিয়ার অথবা ডাক্তার হবে। আমাদের মাদরাসায় তখন সায়েন্স ছিল না।’
এরপর বিভিন্ন স্কুলে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সুযোগ পেলেও মায়ের ইচ্ছায় মাদরাসাতেই পড়াশোনা চালিয়ে যান বলে জানান তিনি।
খাগড়াছড়ি বায়তুশ শরফ মাদরাসা থেকে দাখিল এবং পরে চট্টগ্রাম বায়তুশ শরফ মাদরাসা থেকে আলিম সম্পন্ন করেন সাদিক কায়েম। এরপর ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
একই সময়ে ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় ফাজিলেও ভর্তি হয়েছিলেন বলে জানান তিনি। তবে দুই জায়গায় একসঙ্গে পড়াশোনা চালিয়ে না গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সাদিক কায়েম বলেন, ‘আমি ফোকাস করতে চেয়েছিলাম যেকোনো এক জায়গায়। কারণ একসঙ্গে দুই নৌকায় পা দিলে কোনোটাই হবে না। আমি আমার ডিপার্টমেন্টে ফোকাস দিয়েছি। আমার টার্গেট ছিল ডিপার্টমেন্টে ভালো একটা রেজাল্ট করা।’
নিজের একাডেমিক ফলাফল নিয়েও সন্তুষ্টির কথা জানান তিনি। সাদিক কায়েম বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি প্রথম সেমিস্টারে ৩.৯৪ পেয়ে প্রথম হয়েছি। এবং আলহামদুলিল্লাহ, প্রতিটি রেজাল্টই ভালো ছিল।’
তার মতে, শৈশবের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, বৈচিত্র্যময় মানুষের সঙ্গে বেড়ে ওঠা এবং শিক্ষাজীবনের নানা অভিজ্ঞতা মিলেই তার নেতৃত্বের ভিত তৈরি হয়েছে।