৪০ বছর পর আবারও ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ। সাইপ্রাসকে পরাজিত করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচনে জয়লাভ করেছে বাংলাদেশ । মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সাধারণ পরিষদ হলে স্থানীয় সময় সকাল ১০ টায় অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রার্থী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাইপ্রাসের প্রার্থী সেদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পার্মানেন্ট সেক্রেটারি আন্দ্রেয়াস এস. কাকোরিসকে আট ভোটে পরাজিত করেন। এই নির্বাচনে জাতিসংঘের ১৯০টি সদস্য দেশ ভোট দেয়। এর মধ্যে বাংলাদেশের পক্ষে ৯৯টি দেশ এবং সাইপ্রাসের পক্ষে ৯১টি দেশ ভোট দিয়েছে । ড. খলিলুর রহমান আগামী সেপ্টেম্বরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
এই জয়ের মাধ্যমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর জাতিসংঘের ১৯৩-সদস্যের এই সংস্থায় অন্যতম প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবেন, যা বাংলাদেশকে শান্তি, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু কার্যক্রম এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা বিষয়ক আলোচনাকে রূপ দেওয়ার এক অভূতপূর্ব সুযোগ করে দেবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি একজন পূর্ণকালীন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং সবার জন্য সভাপতি হিসেবে কাজ করবেন। এর মাধ্যমে তিনি জাতিসংঘে তাঁর ভূমিকা এবং জাতিসংঘের এই গুরুত্বপূর্ণ পদের প্রতি তাঁর অঙ্গীকারকে তুলে ধরেন।
এর আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আয়োজিত এক অনানুষ্ঠানিক আলাপচারিতামূলক সংলাপে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, তিনি জাতিসংঘের সনদকে অবিচলভাবে সমুন্নত রাখবেন এবং ছোট প্রতিনিধিদলগুলোর প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিয়ে সকল সদস্য রাষ্ট্রকে সম্পৃক্ত করবেন। তিনি বলেন, আমি প্রথম দিন থেকেই আপনাদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম, ইচ্ছুক এবং প্রস্তুত।
জাতিসংঘের আঞ্চলিক রোটেশন নীতি অনুযায়ী ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদটি এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের জন্য নির্ধারিত। ভৌগোলিক অবস্থান ইউরোপে হলেও সাইপ্রাস জাতিসংঘের কূটনৈতিক গ্রুপিংয়ে এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের সদস্য। প্রথমে এই পদে ফিলিস্তিনও প্রার্থী ছিল। তবে মুসলিম দেশগুলোর ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা এড়াতে এবং ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক বিবেচনায় ফিলিস্তিন পরে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায়।
নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রার্থী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিযোগী ছিলেন। ভোটের আগে বাংলাদেশ বেশ কিছু দেশের আনুষ্ঠানিক সমর্থন লাভ করে। এর মধ্যে ব্রাজিল, আলজেরিয়া, সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক, গাম্বিয়া ও লিবিয়া উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ প্রায় চার দশক পর এই পদে নির্বাচন করে। এর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ভোটের শেষ মুহূর্তে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করে বাংলাদেশ। নির্বাচনের আগে শেষ পর্যায়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভোটের হিসাব-নিকাশে ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনাগুলো প্রভাব ফেলেছে। ভোট দেওয়ার আগে দেশগুলো পূর্বপ্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বিভিন্ন কৌশলগত, রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিষয় বিবেচনা করায় বাংলাদেশ ও সাইপ্রাস উভয়ের শেষ মুহূর্তের তৎপরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য রাষ্ট্রের জোরালো সমর্থন পেলেও প্রচারণার জন্য সীমিত সময় পাওয়ায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে বাংলাদেশ । সাইপ্রাস সারা বছর ধরে প্রচারণা চালায়, অথচ বাংলাদেশ প্রচারণার জন্য সময় পায় তিন মাস বা তারও কম ।