বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নয়াদিল্লিকে কোনো ধরনের ছাড় দেবে না ওয়াশিংটন। চীনের ক্ষেত্রে যে ভুল করেছিল, ভারতের ক্ষেত্রে সে ভুল আর করতে চায় না যুক্তরাষ্ট্র। ২০ বছর আগে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা নিয়ে চীন আজ প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ সুবিধা নিয়ে ভারতও চীনের মতো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠুক—ট্রাম্প প্রশাসন তা কোনোভাবেই হতে দেবে না।
গত বৃহস্পতিবার দিল্লিতে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত ভূরাজনীতি ও ভূ-অর্থনীতিবিষয়ক সম্মেলন ‘রাইসিনা ডায়ালগ’-এ ট্রাম্প প্রশাসনের এ কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরেন মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ।
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভারতের ব্যাপারে এমন একটা সময়ে এ বার্তা এলো, যখন মার্কিন প্রশাসন তার ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত আলোচনায় বাণিজ্য ইস্যু, বিশেষ করে শুল্ককে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ভারতের ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসনের এ কঠোর অবস্থানের খবরটি ব্লুমবার্গ, টিআরটি ওয়ার্ল্ড, টাইমস অব ইন্ডিয়া, বিবিসিসহ বিশ্বগণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হয়েছে।
রাইসিনা ডায়ালগে মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ল্যান্ডাউ বলেন, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেনে কোনো ছাড় নয়। ওয়াশিংটন ২০ বছর আগে চীনকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে যে ভুল করেছিল, সে ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়াতে চায় মার্কিন প্রশাসন। তিনি বলেন, আমরা চীনকে বিশেষ অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়েছিলাম, বেইজিং সে সুবিধা কাজে লাগিয়ে এখন আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ভারতকে এ বিষয়টি বুঝতে হবে। ২০ বছর আগে যে ভুল করেছিলাম, সে ভুল তো আবার করতে পারি না।
তিনি বলেন, আমরা ভরতকে চীনের মতো বিশেষ সুবিধা দিলাম, আর সে সুবিধা কাজে লাগিয়ে ঠিক চীনের মতোই ভারতও আমাদের সামনে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে হাজির হোক, তা আমরা কোনোভাবেই হতে দিতে পারি না। তাই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতকে অবাধ প্রবেশাধিকার না দেওয়ার ব্যাপারে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
ল্যান্ডাউ বক্তব্যে আরো বলেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু আমরা ভারতকে অন্যায্য কিছু দিতে পারি না। কারণ এসব ব্যাপারে আমাদের শেষ পর্যন্ত আমাদের জনগণের কাছেই জবাবদিহি করতে হয়। যেমন ভারত সরকারকেও তার জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়।
মার্কিন-ভারত বাণিজ্য আলোচনা প্রায় শেষপর্যায়ে রয়েছে মন্তব্য করে মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হলো, জাতীয় স্বার্থকে এগিয়ে নেওয়া। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, আমরা কোনো দাতব্য সংস্থা নই। আমরা জাতিসংঘও নই। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কথা বলেছেন। তবে এর অর্থ কেবল আমেরিকাকেই বোঝায় না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেমন আমেরিকাকে আবার মহান করতে চান, তেমনি আশা করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য দেশের সরকারপ্রধানরাও তাদের দেশগুলোকে মহান করবেন।
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ভারতের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ বলেন, আমরা নতুন একটি শতাব্দীতে প্রবেশ করেছি। এখানে আমরা ভারতের উত্থান দেখতে পাব। ভারত এখন বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ। এর অবিশ্বাস্য অর্থনৈতিক মানব ও অন্যান্য সম্পদ রয়েছে, যা এ শতাব্দীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, ভারতের অগ্রযাত্রার অংশ হতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বার্থের ভিত্তিতে অংশীদারত্ব গড়ে তুলব।
জ্বালানির জন্য ভারতকে বিকল্প উৎস খোঁজার পরামর্শ দিয়ে মার্কিন এ নীতিনির্ধারক বলেন, ইরানের সঙ্গে মার্কিন-ইসরাইল যুদ্ধের ফলে জ্বালানি খাতে সংকট তৈরি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারতকে তার জ্বালানি উৎসগুলোকে আরো বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যময় করতে হবে।
তিনি বলেন, আমি আশা করি, ভারত বিকল্প উৎস খুঁজছে। যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ভালো বিকল্প উৎস আর হতে পারে না। ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তায় বৃহত্তর ভূমিকা পালনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে ধরে মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লি গত ৬ ফেব্রুয়ারি একটি অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির কাঠামোতে সম্মত হয়েছে। এটিকে দ্বিপক্ষীয় একটি বৃহত্তর চুক্তি হিসেবে চূড়ান্ত করতে আলোচনা চলছে। অন্তর্বর্তী এ চুক্তি আগামী এপ্রিলে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, চামড়া, প্লাস্টিক, রাবার, জৈব রাসায়নিক, গৃহসজ্জা, কারিগরি যন্ত্রপাতিসহ বেশকিছু ভারতীয় পণ্যের ওপর ১৮ শতাংশ পারস্পরিক শুল্কহার প্রয়োগ করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি উপেক্ষা করে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করায় ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্কারোপের ঘোষণা দিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ শাস্তিমূলক শুল্ক অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে বাণিজ্য আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের বেশকিছু শর্ত মেনে নেওয়ায় ভারতের ওপর থেকে এ শাস্তিমূলক শুল্কহার প্রত্যাহার করা হয়েছে। ভারত আগামী পাঁচ বছরে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য আমদানি করবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, শুল্কারোপের ব্যাপারে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট যে রায়ই দিয়ে থাকুক না কেন—ভারতের সঙ্গে আমরা যে বাণিজ্য চুক্তি করেছি তার ওপর সুপ্রিম কোর্টের রায় কোনো ধরনের প্রভাব ফেলবে না।