অধিকারের প্রতিবেদন
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ ২০২৫ সালে হত্যা, নির্যাতন ও নিপীড়ন সমস্ত সীমা অতিক্রম করেছে এবং দেশটি থেকে অবৈধভাবে ২ হাজার ৫০০ এর বেশি মুসলমান ও বাংলা ভাষী মানুষকে বাংলাদেশের মধ্যে পুশইন করেছে যাদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন ভারতীয় নাগরিক ও রোহিঙ্গা শরণার্থী।
বুধবার মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
সংগঠনটি জানায়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবসময়ই দুর্বৃত্তায়ন, সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল বিরাজমান ছিল। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আশা করা হয়েছিল যে, এ রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তার কোনো পরিবর্তনই দেখা যায়নি। ফলে ২০২৫ সাল জুড়েই এ ধরনের ভয়াবহ অপসংস্কৃতির ফলে অনেকগুলো হতাহতের ঘটনা ঘটে।
এ সময়ে বিএনপির ও এর অঙ্গ-সংগঠন, জামায়াতে ইসলামী এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সমন্বয়কদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া যায়। বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, বিজেপি গণঅধিকার পরিষদ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের এবং গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের সঙ্গে জাতীয় পার্টির, ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
২০২৫ সালে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্যাতনের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে দায়মুক্তির সংস্কৃতি চালু থাকা এবং নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন ২০১৩ এর বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে নির্যাতন ও অমানবিক আচরণের ঘটনাগুলো ঘটেছে। ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার কনভেনশন অ্যাগেইনস্ট টর্চার-এর অপশোনাল প্রোটোকল অনুমোদন করে। এর ফলশ্রুতিতে বন্দি ও আটককৃতদের সুরক্ষা দেবার জন্য জাতীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনে সংশোধনী এনে এ কমিশনকেই জাতীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনকালে ১ হাজার ৫৬৯ টি গুমের ঘটনার বিষয় নিশ্চিত হয়ে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন এটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। এরমধ্যে ২৫১ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। এর বাইরে জোরপূর্বক গুম হয়ে যাওয়া আরও ৩৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে গুমের কোনো ঘটনা ঘটার খবর জানা যায়নি। গত ১ ডিসেম্বর গুমের অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড- রেখে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫’ জারি করেন রাষ্ট্রপতি। ২০২৫ সালে সংবাদপত্র অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও সাংবাদিককে হত্যাসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদনে জানা গেছে, কর্তৃত্ববাদী হাসিনার শাসনামল থেকে এই সময়কালে নাগরিকরা অনেক বেশী মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করেছেন। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে অরাষ্ট্রীয় শক্তিগুলোর তৎপরতায় অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা এবং বিভ্রান্তিমূলক তথ্যগুলো আরো ব্যাপকতা লাভ করে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী এবং উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী কর্তৃক এই সময়কালে মিথ্যা ও বিকৃত প্রচারণা চালানো হয়েছে। এই সময়ে অনলাইনে নারীদের বিরুদ্ধেও ব্যাপক মানহানিকর বিকৃত প্রচারণা চালানো হয়েছে।
শেখ হাসিনা সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে সংঘটিত গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বিডিআর হত্যাকাণ্ড শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর দমন অভিযান ও জুলাই হত্যাযজ্ঞসহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধ গুম, জুলাই হত্যাকাণ্ডে হাসিনাসহ তার অনুগত সামরিক বাহিনীর সদস্য, পুলিশ এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিচার প্রক্রিয়া চলমান ছিল। ২০২৫ সালেও কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি বন্দি ছিল। কারাগারগুলোতে দৈনিক খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টির চেয়ে অনেক কম পেয়েছেন বন্দিরা।
প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, ২০২৫ সালে তৈরি পোশাক শিল্প শ্রমিকদের অসন্তোষ অব্যাহত ছিল। এই সময়ে বেতন বৃদ্ধি, বকেয়া বেতন পরিশোধ ও কারখানা খুলে দেয়াসহ বিভিন্ন দাবিতে এবং শ্রমিক ছাঁটাই ও শ্রমিককে মারধর করার প্রতিবাদে শ্রমিকরা বিক্ষোভ-সমাবেশ ও রাস্তা অবরোধ করেন। এই সময়ে কর্তৃপক্ষের অন্যায় ও অমানবিক আচরণের জন্য দুই জন শ্রমিক আত্মহত্যা করেন। বকেয়া বেতন-বোনাসের দাবিতে কর্মসূচি পালনের সময় অসুস্থ হয়ে এক গার্মেন্টস্ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ধর্মীয় ব্যাপারে ভিন্নমতাবলম্বী এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠির মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েূছে। এই সময়ে তাঁদের কার্যক্রমে বাধা, হুমকি এবং হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ধর্মীয় উগ্রবাদী ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জুলুম করেছে।