বাংলাদেশের গণমাধ্যম শিক্ষার্থীরা সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেবে কি না, তার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করে গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতা, নির্ভুলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর।
সম্প্রতি সেইজ পাবলিশিং প্রকাশিত ‘জার্নালিজম অ্যান্ড মাস কমিউনিকেশন এডুকেটর’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণাটি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ও ফটোগ্রাফি বিভাগের প্রভাষক খন্দকার রুবাইয়াত মুরসালিন এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ও গবেষক মো. নাসিমুল হুদা।
গবেষণার ফলাফলে যা উঠে এসেছে
২০২৪ সালের এপ্রিল-মে মাসে দেশের ১৬টি পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪০ জন গণমাধ্যম শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ চালিয়ে গবেষণাটি করা হয়।
এতে দেখা গেছে, সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়াশোনার সিদ্ধান্ত, পূর্ব অভিজ্ঞতা, পরিবার, শিক্ষক ও সহপাঠীদের মতামত— এসব বিষয় শিক্ষার্থীদের সাংবাদিকতা পেশায় আসতে অনুপ্রাণিত করে।
একজন সাংবাদিকের সমাজে ইতিবাচক প্রভাব রাখা, অনেক মানুষের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাওয়া এবং সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা— এসব কারণেও শিক্ষার্থীরা এ পেশার প্রতি আগ্রহী হন। পাশাপাশি, দেশের সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সত্য তুলে ধরার ক্ষমতা সাংবাদিকতাকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলে।
গণমাধ্যমের প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা কমার কারণ
গবেষণায় দেখা গেছে, সাংবাদিকতা পেশায় আসার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমের প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থা কিছুটা কমেছে। এর পেছনে মূলত পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ, সেন্সরশিপ এবং অতিরঞ্জিত তথ্য বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে।
বিশেষ করে, রাজনৈতিক চাপ ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে সংবাদ মাধ্যমগুলো নিরপেক্ষ থাকার পরিবর্তে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে সুবিধা দিতে গিয়ে তথ্য বিকৃত করে উপস্থাপন করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আবার, কোনো কোনো সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন বা বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের গণমাধ্যমের প্রতি অবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলছে।
এ ধরনের চ্যালেঞ্জের কারণে অনেক শিক্ষার্থী সাংবাদিকতা পেশায় আসতে অনাগ্রহী হয়ে উঠছেন। তারা মনে করেন, সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ কমে গেলে সত্য প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, যা দীর্ঘ মেয়াদে গণমাধ্যমের গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস করে।
তাই গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সাংবাদিকতা এবং তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা জরুরি।
শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে গবেষকদের পরামর্শ
গবেষণাটির সুপারিশে বলা হয়, গণমাধ্যম শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দিলে তারা সাংবাদিকতা পেশায় আসতে আরো আগ্রহী হবে। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ এবং ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া, সাংবাদিকতা শিক্ষায় নৈতিকতার পাঠ, তথ্যের নির্ভুলতা ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের কৌশল শেখাতে হবে যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের যদি সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রম বোঝার বাস্তব সুযোগ দেওয়া হয় এবং পেশাদার সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়মিত সংযোগ ও পরামর্শের (মেন্টরশিপ) সুযোগ থাকে, তবে তারা গণমাধ্যম সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পাবেন এবং এই পেশায় আসতে উৎসাহিত হবেন।
গবেষণা প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের গণমাধ্যম খাতে দক্ষ ও সুশিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি হবে, যা সাংবাদিকতার মানোন্নয়ন এবং গণমাধ্যমের প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।