হোম > জাতীয়

বিনিয়োগে খরা, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতেও মন্দা

রোহান রাজিব

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে বড় ধরনের খরায় পড়েছে দেশ। কয়েক মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে কমছে বিনিয়োগ। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বিনিয়োগ বৃদ্ধির যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তাতে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হওয়ায় নতুন করে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে আগামী দেড় বছরে নতুন করে এক কোটি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্বপ্ন দেখছে বিএনপি সরকার।

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়ে দেশের রুগ্ণ ও বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালুর জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন। অপরদিকে চারটি প্রধান বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা—বিডা, বেজা, পিপিপিএ ও মিডা যৌথভাবে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ, বিনিয়োগ সহায়তা জোরদার ও বিনিয়োগ উন্নয়ন—এ তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে কর্মপরিকল্পনাটি প্রণয়ন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এ পরিকল্পনার বিষয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেছেন বিডার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। এ বিষয়ে তিনি বলেন, এ পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা, দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং বাস্তবায়নমুখী সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়ানো।

এ ধরনের উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গত বছরের এপ্রিলে বিডা বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন করে বিদেশি বিনিয়োগে বড় ধরনের আশার কথা শোনানো হলেও বাস্তবে বিনিয়োগের প্রস্তাবনা আগের বছরগুলোর তুলনায় কমেছে। এ বিষয়ে আশিক চৌধুরীর ভাষ্য, আওয়ামী লীগের আমলে বিনিয়োগের তথ্য ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর একটি প্রবণতা ছিল। সে ধারা থেকে বের হয়ে আমরা প্রকৃত প্রস্তাবগুলোই শুধু তালিকাভুক্ত করছি। এ কারণে আগের তুলনায় প্রস্তাব কম হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

তবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সরকারের উদ্যোগ সৎ হলেও বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে মনে করেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে খাদের কিনারায় পৌঁছে যাওয়া আর্থিক খাতে অন্তর্বর্তী সরকার কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনে। তবে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে বড় ধরনের কোনো সংস্কার করতে পারেনি। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির উন্নতির আশা করা হলেও ইরান সংকট নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসে। এ সংঘাতের প্রভাবে দেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট আরো গভীর হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে কেউ বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে না। বিনিয়োগ না হলে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব নয়।

গত নভেম্বরে চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৫-এর দ্বিতীয় পর্বে বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছিলেন, আগামী দিনে ক্ষমতায় গেলে ১৮ মাসে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা বিএনপির রয়েছে। বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের সবচেয়ে বড় চাহিদা হচ্ছে কর্মসংস্থান।

পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সরকারের এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। আমরা মনে করি, সরকারের এটি সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিতে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের রেশ এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি, তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে আরো বড় ধাক্কা দিয়েছে। এ ধাক্কার প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়ছে। তিনি আরো বলেন, এমন পরিস্থিতিতে যখন আমাদের টানা আট মাস রপ্তানি আয় কমেছে, তখন এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি আমার কাছে খুব কঠিন মনে হয় এবং এটি নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ।

তবে পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়ালে উদ্যোক্তারাও এটিকে সফল করতে কাজ করবেন বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে ধারাবাহিকভাবে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হচ্ছে এবং নতুন কর্মসংস্থান হওয়ার বদলে বিদ্যমান কর্মসংস্থানই কমে যাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর কাছ থেকে নীতিগত সহায়তা প্রত্যাশা করেন।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের পর নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসে। নির্বাচনের আগেই এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ১৬ থেকে ১৮ মাসের সময়কাল বিবেচনায় নিলে, এ ধরনের প্রতিশ্রুতি অনেকটাই অবাস্তব মনে হয়। শুধু মোট বেকারত্ব না দেখে যদি আলাদাভাবে শিক্ষিত (গ্র্যাজুয়েট) বেকারদের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়, তাহলে বাস্তব চিত্রটি আরো পরিষ্কার হবে। কারণ, গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে বেকারত্বের হার তুলনামূলক বেশি।

অধ্যাপক সাহাদাত আরো বলেন, বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলো ভালো; কিন্তু কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে, সেটি পরিষ্কার না হলে তা রাজনৈতিক বক্তৃতা হিসেবেই থেকে যায়। অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিশ্রুতির কার্যকারিতা যাচাই করা জরুরি।

তিনি আরো বলেন, বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক, আমদানি-রপ্তানি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। কর্মসংস্থানের সঙ্গে বিনিয়োগের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে বিনিয়োগের অবস্থা বহু বছর আগের পর্যায়ে নেমে গেছে। এ বিনিয়োগ দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব নয়। বিদেশি বিনিয়োগও প্রয়োজন, কিন্তু আপাতত তার কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ নেই। এ পরিস্থিতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি কঠিন; বরং অর্থনীতিকে কীভাবে স্থিতিশীল রাখা যায়, সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ পরিস্থিতি

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে, যা দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ঋণ প্রবৃদ্ধি কখনো এত কমেনি। করোনা মহামারির সময় ২০২০ সালে বিনিয়োগ স্থবিরতার মধ্যেও এ প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশের ওপরে ছিল।

অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগেও আশার আলো নেই। গত বছরের শেষ তিন মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রায় ২৬ শতাংশ কমেছে। এছাড়া টানা আট মাস ধরে পণ্য রপ্তানি কমেছে। সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতি হারাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বিনিময় হার অবমূল্যায়নের কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

কর্মসংস্থানের চিত্র

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোতে বর্তমানে মোট ৩ কোটি ৬ লাখ ৩২ হাজার ৬৬১ জন কর্মরত রয়েছেন, যা ২০১৩ সালে ছিল ২ কোটি ৪৫ লাখ ৮৫০ জন। এই হিসাবে কর্মসংস্থান বেড়েছে ২৫ দশমিক ০৩ শতাংশ। মোট কর্মশক্তির মধ্যে পুরুষের অংশ ৮৩ দশমিক ২৮ শতাংশ, নারীর অংশ ১৬ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং তৃতীয় লিঙ্গের অংশগ্রহণ ০ দশমিক ০১ শতাংশ।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, বর্তমানে বিশ্বের ১৭৬টি দেশে ১ কোটি ৫০ লক্ষাধিক বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যে বিরতি চলছে, তা যদি পুনরায় সংঘাতে রূপ নেয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ আরো সীমিত হয়ে যেতে পারে।

এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাতের প্রভাবে বাংলাদেশের প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে থেকে যাবে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। টানা তিন বছর ধরে প্রবৃদ্ধি ধীরগতির, দারিদ্র্য বাড়ছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, চাপের মধ্যে ব্যাংকিং খাত, দুর্বল রাজস্ব আহরণ এবং কমে যাওয়া বেসরকারি বিনিয়োগ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে আসা বৈশ্বিক চাপ পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলছে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, তা এখন ঝুঁকির মুখে। আগে ধারণা করা হয়েছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ৫ লাখের বেশি মানুষের অবস্থার উন্নতি হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচেই থেকে যাবে। এছাড়া যুদ্ধের কারণে আরো অন্তত ৬ লাখ মানুষ কাজ হারাতে পারে বলেও সংস্থাটি মনে করছে।

রাজধানীতে জামায়াতের বৈশাখী শোভাযাত্রা

কৃষক কার্ডের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি উদ্বোধনে টাঙ্গাইলের পথে প্রধানমন্ত্রী

নববর্ষের বৈশাখী শোভাযাত্রায় মানুষের ঢল

নববর্ষের ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ শুরু

বাংলা নববর্ষে নিরাপত্তা নিশ্চতে ঢাকায় ২০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন

এনআইডি সংশোধনে ইসির কঠোর নিয়ন্ত্রণ

রমনা বটমূলে বোমা হামলা: ২৫ বছরেও শেষ হয়নি বিচার

রাজধানীতে মাছ মাংস ডিম সবজির দাম চড়া

দেশবাসীকে বৈশাখের শুভেচ্ছা জানালেন প্রধানমন্ত্রী