হোম > প্রকৃতি ও পরিবেশ

আফ্রিকা মহাদেশ পৃথক হয়ে গঠিত হবে নতুন মহাসাগর

আমার দেশ অনলাইন

আফ্রিকা মহাদেশ ধারণার চেয়েও দ্রুত দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার পথে রয়েছে। পূর্ব আফ্রিকার একটি সক্রিয় রিফট বা ভূত্বক বিচ্ছিন্ন হওয়ার অঞ্চল ইতিমধ্যে এমন এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা মহাদেশীয় বিচ্ছিন্নতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার স্পষ্ট সংকেত দিচ্ছে।

গবেষণা বলছে, কেনিয়া ও ইথিওপিয়ার মধ্য দিয়ে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার বিস্তৃত তুরকানা রিফট জোনে ভূত্বক এতটাই পাতলা ও দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক সময়ে এই অঞ্চল আফ্রিকা মহাদেশের একটি অংশকে মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা করে দিতে পারে এবং সেখানে নতুন মহাসাগরীয় অববাহিকা তৈরি হতে পারে। তবে এ পরিবর্তন নিকট ভবিষ্যতের কোনো ঘটনা নয়; সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা ঘটতে আরো কয়েক মিলিয়ন বছর সময় লাগতে পারে।

দুটি টেকটোনিক প্লেট যখন পরস্পরের দিকে এগিয়ে আসে, তখন তাদের সংঘর্ষে পাহাড় বা পর্বতমালা তৈরি হতে পারে। বিপরীতে দুটি প্লেট যখন পরস্পর থেকে দূরে সরে যায়, তখন ভূত্বক প্রসারিত ও পাতলা হতে থাকে এবং দীর্ঘ সময়ে সেখানে নতুন মহাসাগরীয় ভূত্বক তৈরি হতে পারে। পূর্ব আফ্রিকার রিফট সিস্টেম এই দ্বিতীয় ধরনের ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এখানে আফ্রিকার নুবিয়ান ও সোমালি প্লেট ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। এর আরো উত্তরে আরবীয় প্লেটের সঙ্গে সংযোগস্থলে আফার অঞ্চলে রিফটিং আরো অগ্রসর হয়ে মহাসাগরীয় ভূত্বক তৈরির পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।

নতুন গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো তুরকানা রিফটের ভূত্বকের অস্বাভাবিক পাতলাভাব। উচ্চ-রেজল্যুশনের ভূকম্পন-তথ্য ও ভূতাত্ত্বিক উপাত্ত বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন, রিফটের কেন্দ্রীয় অক্ষের নিচে স্ফটিকীয় ভূত্বকের পুরুত্ব প্রায় ১৩ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। অথচ রিফটের বাইরের তুলনামূলক অক্ষত অঞ্চলে ভূত্বকের পুরুত্ব ৩৫ কিলোমিটারেরও বেশি। এই বড় পার্থক্য দেখায় যে ভূত্বকটি দীর্ঘ সময় ধরে প্রসারিত হয়ে মাঝখানে ক্রমে সরু ও দুর্বল হয়েছে।

ভূতাত্ত্বিক এই পর্যায়কে বলা হয় ‘নেকিং’ বা গ্রীবার মতো সরু হয়ে আসা। কোনো নরম বস্তু দুই দিক থেকে টানলে মাঝখান যেমন সরু হয়ে যায়, তুরকানা রিফটের ভূত্বকেও অনেকটা একই ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। গবেষকদের মতে, ভূত্বক যত পাতলা হয়, তা তত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পরবর্তী বিচ্ছিন্নতার জন্য আরো সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। গবেষণায় তুরকানা রিফটকে বর্তমানে সক্রিয় মহাদেশীয় রিফটের মধ্যে নেকিং পর্যায়ে থাকা একটি বিরল উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষণায় আরো দেখা যায়, তুরকানা অঞ্চলে এই নেকিং পর্যায়ের সূচনা আনুমানিক ৪০ লাখ বছর আগে। আর পুরো রিফটিং প্রক্রিয়ার ইতিহাস আরো পুরোনো—ইস্ট আফ্রিকান রিফট-সম্পর্কিত ভূত্বকীয় বিচ্ছিন্নতা ওই অঞ্চলে প্রায় ৪৫ মিলিয়ন বছর আগে শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ বর্তমান পরিবর্তন হঠাৎ কোনো নতুন ঘটনা নয়; এটি কোটি কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক বিবর্তনের ধারাবাহিক ফল।

গবেষকদের মতে, তুরকানা রিফটের পরবর্তী সম্ভাব্য পর্যায় হলো ‘ওশেনাইজেশন’ বা মহাসাগরীয়করণ। এই পর্যায়ে ভূত্বক আরো পাতলা হয়ে শেষ পর্যন্ত ভেঙে যেতে পারে। তখন ভূ-অভ্যন্তরের ম্যাগমা ফাটল দিয়ে উপরে উঠে এসে জমাট বেঁধে নতুন মহাসাগরীয় ভূত্বক তৈরি করবে। সময়ের সঙ্গে নতুন সৃষ্ট ভূত্বক ও নিম্নভূমির অববাহিকায় পানি জমে একটি সমুদ্র বা মহাসাগরীয় অববাহিকা গড়ে উঠতে পারে। গবেষণাটি বলছে, এ প্রক্রিয়া শুরু হতে এখনও কয়েক মিলিয়ন বছর লাগতে পারে।

প্লেটগুলোর বিচ্ছিন্নতার হারও অবশ্য মানুষের সময়ের তুলনায় অত্যন্ত ধীর। তুরকানা রিফট অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতার হার আনুমানিক বছরে ৪.৭ মিলিমিটার। অর্থাৎ একটি মানুষের জীবদ্দশায় এই পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো হবে না। কিন্তু কোটি কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক সময়ের হিসাবে বছরে কয়েক মিলিমিটারের এই ক্ষুদ্র পরিবর্তনই শেষ পর্যন্ত একটি মহাদেশীয় ভূখণ্ডকে বিভক্ত করার মতো বিশাল পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

তুরকানা রিফটের গুরুত্ব শুধু ভূতত্ত্বে সীমাবদ্ধ নয়। কেনিয়া ও ইথিওপিয়ার এই অঞ্চল প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর জীবাশ্মের জন্য পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান। দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, প্রাচীন মানব বিবর্তনের সঙ্গে এই অঞ্চলের বিশেষ পরিবেশের সম্পর্ক থাকতে পারে। নতুন গবেষণা সেই ধারণায় একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। গবেষকদের মতে, রিফটিংয়ের কারণে ভূখণ্ড নিচু হয়ে যাওয়ায় সেখানে বিপুল পরিমাণ পলি জমেছে। এই পলির স্তরের মধ্যে জীবাশ্ম সংরক্ষণের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়ায় তুরকানা অঞ্চলে এত সমৃদ্ধ জীবাশ্মভাণ্ডার গড়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ অঞ্চলটি মানব বিবর্তনের জন্য অন্য জায়গার চেয়ে মৌলিকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল—এমনটা আবশ্যিক নয়; বরং ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া সেখানে প্রাচীন জীবাশ্ম সংরক্ষণে বিশেষ সহায়ক হতে পারে।

গবেষণার এই দিকটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তুরকানা অঞ্চলের জীবাশ্মের সমৃদ্ধি শুধু নৃবিজ্ঞানীদের জন্য নয়, ভূতত্ত্ববিদদের কাছেও একটি জানালা খুলে দিয়েছে। ভূত্বক কীভাবে প্রসারিত হয়, রিফট কীভাবে গভীর ও প্রশস্ত হয় এবং মহাদেশ কীভাবে শেষ পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতার দিকে এগোয়—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এই অঞ্চলকে একটি প্রাকৃতিক গবেষণাগার হিসেবে দেখা হচ্ছে। গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সক্রিয় মহাদেশীয় রিফটের নেকিং পর্যায় সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ অত্যন্ত বিরল।

আফ্রিকার এই পরিবর্তন অবশ্য শুধু তুরকানা রিফটেই সীমাবদ্ধ নয়। পূর্ব আফ্রিকার বৃহত্তর রিফট সিস্টেম আফার অঞ্চল থেকে দক্ষিণে মোজাম্বিক পর্যন্ত বিস্তৃত। আফার অঞ্চলে নুবিয়ান, সোমালি ও আরবীয় প্লেটের বিচ্ছিন্নতা আরও অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে। সেখানে রিফটিং ও আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপের মাধ্যমে ভূত্বকের নিচ থেকে ম্যাগমা উঠে আসছে এবং মহাসাগরীয় ভূত্বক তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। তুরকানা রিফটে সক্রিয় নেকিং এবং আফারে অগ্রসর মহাসাগরীয়করণ—দুটি প্রক্রিয়াই পূর্ব আফ্রিকার বৃহত্তর রিফট ব্যবস্থাকে মহাদেশীয় বিচ্ছিন্নতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক উদাহরণে পরিণত করেছে।

তবে ‘আফ্রিকা শিগগিরই দুই ভাগ হয়ে যাবে’—এমন ধারণা থেকে বিষয়টি বোঝা ঠিক হবে না। এখানে ‘শিগগির’ বলতে মানুষের সময় নয়, ভূতাত্ত্বিক সময় বোঝানো হচ্ছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, তুরকানা রিফটের বর্তমান নেকিং পর্যায়ের পরও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা এবং নতুন মহাসাগর তৈরিতে কয়েক মিলিয়ন বছর সময় লাগতে পারে। তাই এটি বর্তমান প্রজন্মের জন্য কোনো তাৎক্ষণিক ভৌগোলিক পরিবর্তনের ঘটনা নয়; বরং পৃথিবীর দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক বিবর্তনের একটি চলমান অধ্যায়।

পৃথিবীর বর্তমান মহাদেশগুলোর বিন্যাসকে আমরা স্থির বলে মনে করি। কিন্তু প্লেট টেকটোনিকসের কারণে পৃথিবীর ভূখণ্ড ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। অতীতে মহাদেশগুলো একত্রিত হয়ে প্যানজিয়া নামের সুপারমহাদেশ গঠন করেছিল; পরে টেকটোনিক প্লেটের গতির কারণে তা ভেঙে বর্তমান মহাদেশগুলোর সৃষ্টি হয়েছে। পূর্ব আফ্রিকার রিফট সেই একই দীর্ঘমেয়াদি ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার একটি চলমান উদাহরণ। আজকের আফ্রিকা ভবিষ্যতের ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রে একই অবস্থায় থাকবে না—তুরকানা রিফটের গবেষণা সেই পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটিকেই এখন আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

নতুন গবেষণার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় তাই শুধু ‘নতুন মহাসাগর’ তৈরির সম্ভাবনা নয়। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো একটি সক্রিয় মহাদেশীয় রিফটে সেই গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়টি পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন, যখন ভূত্বক ইতিমধ্যে যথেষ্ট পাতলা ও দুর্বল হয়ে ভবিষ্যৎ বিচ্ছিন্নতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পূর্ব আফ্রিকার ভূগর্ভে চলমান এই ধীর পরিবর্তন একদিকে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ভূগোলের সম্ভাব্য রূপরেখা তৈরি করছে, অন্যদিকে কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীতে জীবন ও পরিবেশ কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তার ইতিহাসও বুঝতে সাহায্য করছে।

সূত্র: সায়েন্সঅ্যালার্ট, নেচার কমিউনিকেশন, ডিসকভার ওয়াইল্ডলাইফ ও স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন

দেশের সব বিভাগে বৃষ্টির আভাস

৪৭ বছরে গলেছে ১২.৫ ট্রিলিয়ন টন বরফ

লঘুচাপের পূর্বাভাস, ঘূর্ণিঝড়ের শঙ্কা থাকলেও নিশ্চিত নয় আবহাওয়া দপ্তর

চার অঞ্চলে ঝোড়ো হাওয়ার আভাস, নদীবন্দরে সতর্কতা

ভূগর্ভে কণার সংকেত

খাবার পৌঁছে দেবে রোবট

ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের অদৃশ্য মেশিন

বিদ্যুৎ সংকটে সৌরশক্তির সম্ভাবনা

দেশের সব বিভাগে বৃষ্টির আভাস

ঢাকায় দিনে কয়বার বৃষ্টি, জানাল আবহাওয়া অফিস