হোম > মতামত

ফেলে আসা নববর্ষ

প্রফেসর ডা. শাহ মো. বুলবুল ইসলাম

পহেলা বৈশাখ এলেই কেমন যেন একটু নস্টালজিক হয়ে যাই। মনে হয় আমার বয়সি যারা, তাদের সবাই বোধ হয় এ ধরনের নস্টালজিয়ায় ভোগেন। শৈশবে বোশেখের দুষ্টুমি, চৈত্র সংক্রান্তি, নববর্ষের নামে দোকানে দোকানে হালখাতার উৎসবÑসবকিছুই একই সঙ্গে ভেসে ওঠে স্মৃতির পর্দায়।

নববর্ষের আবাহন শুরু হতো চৈত্রের শেষদিকে। সবদিকে একটা সাজসাজ ভাব ফুটে উঠত। ধর্মবিশ্বাস যার যাই থাকুক না কেন, চৈত্রের শেষে সবার বাড়িঘর চমৎকারভাবে মাটি দিয়ে নিকোনোর ব্যবস্থা কেউ অমান্য করার সাহস দেখায়নি। ফলে চৈত্রের শেষ দিনের আগেই সারা বাড়িঘর উঠোন একেবারে ঝকঝকে ও তকতকে। নিকোনো উঠোনের সোঁদা গন্ধ যেন সবাইকে ফেলে আসা বছরের স্মৃতির আবহে একদিকে যেমন ভরপুর করে রাখত, তেমনি অন্যদিকে নতুন বছরের নতুন সম্ভাবনার ছায়া রেখাপাত করে যেত। পাড়ার সব বাড়িঘর নিকোনো, ঝকঝকে ও তকতকে। সবচেয়ে সুন্দর লাগত সাঁওতালদের বাড়ি। আল্পনার রঙিন ছোঁয়ায় তাদের বাড়িঘর এবং প্রকৃতি হয়ে উঠত বাঙময়।

বিপত্তিটা হতো ত্রিশে চৈত্রের ভোরবেলা। বাড়িতে দাদা-দাদি-নানা-নানি থাকলে তো কথাই নেই। সেই কাকভোরে তারা বসে থাকতেন দহলিজে। তাদের সামনে দিয়ে যেতে হতো পুকুরে গোসল করতে। গোসল শেষে তাদের সামনে দিয়েই ফিরতে হতো। ফেরার সময় তারা হাতে ধরিয়ে দিতেন কাঁচা হলুদ। তাদের সামনেই এটা খেতে হতো। বিস্বাদ কাঁচা হলুদ খেলেই হতো না, এরপর যা ধরিয়ে দিতেন এখনো শরীর বিলবিলিয়ে ওঠে এর তেতো স্বাদের কথা মনে পড়লে। এদিন বাড়ির মুরুব্বিরা বেঁধে দিতেন পেঁয়াজ-রসুনের জোড়া পাকঘরের কোণে। পুরোনো শিমগাছ, লাউগাছ ও বেগুনগাছÑসবই ফেলত উপড়ে। এ যেন নতুনের আবাহনে পুরোনোকে বিসর্জন দেওয়ার মহোৎসব। নাশতা হতো চাল আর কলাই ভাজা দিয়ে। সঙ্গে সংগতি ভেদে থাকত নারকেল।

দুপুর হলেই বয়স্করা জাল, পলো নিয়ে ছুটতেন বাড়ির পাশের বিলে অথবা নদীতে। সবাই মিলে মাছ ধরার সে দৃশ্য এখন শুধু কল্পনাই করা যায়। মাছ ধরার পর সব মাছ একত্র করে গ্রামের সব বাড়ির জন্য ভাগ করা হতো উপস্থিত-অনুপস্থিত নির্বিশেষে। আনন্দকে ভাগ করে নেওয়ার এই ঐতিহ্য এখন হারিয়ে গেছে। গাঁয়ের সাঁওতালরা দল বেঁধে তির-ধনুক নিয়ে ছুটতেন গ্রামের জঙ্গলে। বেলা শেষে বেরিয়ে আসত বেজি, খরগোশ, শেয়াল ও বুনো শূকর শিকার করে।

পরদিন পহেলা বৈশাখ। ওইদিন বাড়ির মুরুব্বিরা সজাগ দৃষ্টি রাখতেন আমরা যেন অন্য কোনো বাড়িতে না যাই। একটা ধারণা ছিল, বছরের প্রথম দিন প্রথম আহার অন্যের বাড়িতে করলে তাকে সারা জীবন পরানুগ্রহী হয়ে থাকতে হবে। তেমনি ছিল বাসি খাবার বা পান্তা ভাতের ওপর কড়াকড়ি। গ্রামগঞ্জে একটা ধারণা ছিল, বছরের প্রথম দিন বাসি খাবার খেলে সারা বছর তাকে বাসি-পচা খাবার খেতে হবে। ফলে গোসল সেরে আসার পর প্রতিটি বাড়িতে ছিল গরম ভাত। সঙ্গে যার পক্ষে যা জোটানো সম্ভব তরকারির আয়োজন। কোনোভাবেই কোনো বাসি খাবার থাকত না। ইদানীং নববর্ষ উপলক্ষে পান্তা ইলিশের প্রচলন গত শতকের নব্বইয়ের দশকে। আগে গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না, ছিল না খাবার সংরক্ষণের জন্য রেফ্রিজারেটর। ছিল না বরফ কল এবং বরফ গাড়ি। কীভাবে বোশেখের খরতাপে ইলিশপ্রাপ্তি ঘটবে। শৈশবে আমাদের অভিভাবকদের যে সতর্কতা দেখেছি, তা আজ নগর-সংস্কৃতির বদৌলতে উবে গেছে। তখন বৈশাখী ফ্যাশন ছিল না। ছিল না বৈশাখীতে নতুন পোশাকের বাহানা। ছিল পুরোনো হোক, ছেঁড়া হোক তা হতো আগের দিনে ধোয়া ধবধবে পরিষ্কার কাপড়। ময়লা কাপড়ের বালাই ছিল না পহেলা বোশেখে। মজাটা জমত বিকালে। বৈশাখ উপলক্ষে গ্রামের প্রান্তে, খোলা মাঠে বসত বৈশাখী মেলা। মিঠাই, মণ্ডা আর হরেক রকমের মাটির পুতুল, খেলনার দোকান গম গম করত বিভিন্ন গ্রামের লোকজনের ভিড়ে। ছোটদের জন্য আকর্ষণীয় ছিল খেলার দোকান। চার পয়সায় পাওয়া মাটির তিন চাকার গাড়ি দড়ি দিয়ে বেঁধে টেনে নিয়ে বেড়ালে ট্যাং ট্যাং করে আওয়াজ হতো। সন্ধ্যারাতে গ্রামের প্রায় বাড়ি থেকে ভেসে আসত সেই টানা গাড়ির ট্যাং ট্যাং আওয়াজ। বোঝা যেত ওই বাড়ির লোকরা বৈশাখী মেলায় গিয়েছিল। বড়দের আকর্ষণ ছিল মেলায় মিষ্টির দোকানের হালখাতার আয়োজন। প্যান্ডেলের নিচে রঙিন কাগজ দিয়ে সাজানো দোকান। দোকান মালিক একপাশে লাল খেরোখাতা নিয়ে বসা। লোকজন আসছে, যাচ্ছে, মিষ্টি খাচ্ছে। দোকানদার এবং তার কর্মচারীদের বিনয় সম্ভাষণের তুলনা মেলা ভার। যাওয়ার সময় আগের বকেয়াসহ হালনাগাদ পরিশোধ করে পান চিবুতে চিবুতে বেরিয়ে যাচ্ছে আমন্ত্রিতরা। সবার চোখে-মুখে প্রশান্তি। শিশু-কিশোরদের আনন্দ ছিল নাগরদোলা। এ প্রসঙ্গে একটা কথা অবশ্যই বলতে হয়। আমাদের শৈশবের নববর্ষে ছিল না কোনো শোভাযাত্রা, ছিল না পান্তা-শুঁটকি ভর্তা এবং পান্তা ইলিশ নামক আজগুবি আয়োজন। ছিল মা-বাবার আদরে মোড়ানো পাতে ধোয়া ওঠা গরম ভাত এবং তরকারি। পান্তা, শুঁটকি, ইলিশ, মঙ্গল শোভাযাত্রাÑএগুলো আশির দশকের পরে শহুরে অপসংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে শুরু হয়। এখন নববর্ষের সব আয়োজন আধুনিক সভ্যতার ব্যবসায়িক চিন্তায় উদ্ভূত; যার সঙ্গে হাজার বছরের আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির জীবনাচারের কোনো মিল নেই। এখনকার নববর্ষের আয়োজনের আড়ালে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যের করাল কুটিল প্রকাশ খুঁজে পাওয়া যায়নি আমাদের ফেলে আসা শৈশবের বৈশাখী আয়োজনে। নাগরিক সভ্যতার কৃত্রিমতার আড়ালে হারিয়ে গেছে গ্রামীণ জীবনাচার এবং শাশ্বত সংস্কৃতির প্রকাশ। অপসংস্কৃতিই এখন সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‘গাঙাড়ি’ থাইকা বাঙলা

উৎসবের রাজনীতি, অর্থনীতি ও দর্শন

ভুলে যাওয়া সূর্যের জীবন

বাংলা সনের জীবনী

বাংলার মুর্শিদি গান

বৈশাখে ইলিশকাণ্ড

বাংলা নববর্ষের ইতিহাস

বৈশাখের বিবরণ

পহেলা বৈশাখ

বাংলার হারানো সনের কথা