হোম > মতামত

বৈশাখের বিবরণ

আল মাহমুদ

পৃথিবীতে কম জাতিই আছে যাদের বছরের শুরু হয় দুর্যোগের ঘনঘটা দিয়ে। প্রবল বাতাস, ঘূর্ণিঝড়, মেঘের কালো বিশাল স্তম্ভ যেন উবুড় হয়ে নেমে আসে বৈশাখের শুরুতেই বাংলাদেশের ওপর। সবকিছু তছনছ করে ঝরা পাতার ঘূর্ণি তুলে গাছের শিকড় মুচড়ে ভেঙে শুরু হয় আমাদের জাতির নববর্ষের উদ্যোগ। অথচ বাংলাদেশকে এমনিতেই একটা নিরীহ নিরুদ্যম জাতির দেশ বলে আমরা ধারণা করে থাকি। কথাটা যে সত্য নয়, তা কেবল কবি-সাহিত্যিকরাই মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন। বৈশাখ উল্টে দেয় এ জাতির মননশীলতা, সমস্ত পৃষ্ঠা এবং পুস্তকের মলাট। কথা নেই বার্তা নেই অকস্মাৎ আকাশ অন্ধকার করে দারুণ বিদ্যুৎ চমকের মধ্যে শুরু হয়ে যায় নতুন বছরে পা দেবার অবশ্যম্ভাবী তাগিদ।

এই বৈশাখের ঘূর্ণিঝড় আমাদের ওপর আপতিত হয়ে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শুকনো মরা হলদে পাতা আর থাকবে না। তার বদলে প্রকৃতিতে শুরু হয়ে যায় এক আকস্মিক তাণ্ডব। মৌসুমি বায়ুর ঘূর্ণিপাক সোজাসুজি হিমালয়ে আঘাত করে বাংলাদেশের সমতলে নেমে আসে। ভাঙে, মচকায়, উচ্ছেদ হয়ে যায় পুরোনো বসতি। অন্যদিকে পদ্মার ইলিশের ঝাঁক এসে শহরের মাছের আড়তগুলোতে রুপোর স্তূপ হয়ে জমা হয়। যে মাছের চোখের আর পলক পড়ে না।

বৈশাখ বাঙালিদের খাদ্যতালিকা পর্যন্ত বদলে দেয়। অথচ বাংলাদেশের মানুষ সচরাচর নিরামিষ খাদ্যের বদলে চর্বিযুক্ত মাছ-মাংসই পছন্দ করে বেশি। যদিও আমি উল্লেখ করেছি আমরা এক উদ্যমহীন জাতি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বাতাসে ঋতুর দাপটে আমাদের জীবনের দিকচক্রবাল আচ্ছন্ন করে বিদ্যুতের চাবুক মারতে থাকে। প্রকৃতি যেখানে এ রকম প্রচণ্ড রূপ ধারণ করে সেখানে স্বভাবতই একটা বা দুটো দিন দিশেহারা থাকে। তারপরই শুরু হয় তছনছ হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি-ভিটের ওপর নতুন খুঁটি বসানো। এতেই ঋতুর অনিশ্চয়তা, বাতাসের ধাবমানতা এবং পুরোনো সবকিছুর উজাড় হয়ে যাওয়া আমাদের জাতিকে এক ধরনের দার্শনিক বিশ্বাসে ব্যাকুল করে রাখে। সেই বিশ্বাসটা হলো স্থায়ী কোনো কিছু না করার ইঙ্গিত। কিছুই যখন থাকে না তখন স্থায়িত্বের ওপর বাঙালিরা জোর দেয় না। বরং অনিশ্চয়তার ওপর খুঁটি লাগিয়ে চাল বসিয়ে আরো কয়েকটা দিন কাটিয়ে দেওয়ার বিমর্ষতা আমাদের ঘিরে রাখে।

এ দেশের লোকগীতির যে ভাণ্ডার রয়েছে, ভাটিয়ালি ও ভাওয়াইয়া, সেখানে কণ্ঠস্বরের বাঁকে বাঁকে রয়েছে নারীর আক্ষেপ। আর কূল-কিনারেহীন নদী ও প্রান্তরের কথা। অনিশ্চিত জীবন এখানে প্রেমকে অত্যন্ত মহার্ঘ বিষয় হিসেবে গানের কলিতে বিরহের সুর লাগিয়ে দিয়েছে।

গ্রামের দিকে গেলে কিংবা নদীর স্রোতে ভেসে বেড়ালে চোখে পড়ে মানুষের আবাস কত অস্থায়ী, ঠুনকো খড়কুটোয় নির্মিত। যেন স্থায়ী কোনো কিছু এই জাতির জীবনকে দৃঢ়তা দেয়নি। অস্থায়ী অনিশ্চিত জীবনের বিরহগাথাই এদের সংগীত হয়ে উঠেছে। এই উপলব্ধি বৈশাখের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয় সংবৎসরের জন্য। বৃষ্টির বিরামহীন শব্দের মধ্যে মানুষের আত্মা যেন ভেজা পাখির মতো পাখা গুটিয়ে বৃক্ষের শাখায় বসে থাকে। এমনকি পাখিরও কোনো আর শব্দ থাকে না। কলরব শুধু প্রকৃতির মধ্যে ডালপালা ভাঙার। বৈশাখ বিদ্যুতের চাবুক নিয়ে বজ্রের গর্জন তুলে আপতিত হলেও এ দেশের মাটি বড়ই নরম। এর ওপর কোনো প্রাকৃতিক নিষ্ঠুরতা প্রাণিকুলকে কাবু করতে পারে না।

বাইরে কাজ না থাকায় শস্যের কারিগর চাষিরা দাওয়ায় বসে ঝড়ের তাণ্ডব দেখতে দেখতে নারকেলের হুঁকোয় কড়া তামাক টানতে টানতে চোখ মুদে রাখে। যেন স্নায়ুতে ঝিম ধরে গেছে।

আমি আগেই উল্লেখ করেছি জীবন-জীবিকা ও বাসস্থান যেখানে অনিশ্চিত সেখানে মানুষ প্রেমের জন্য কাতরতা প্রকাশ করে। এই ঝঞ্ঝাবায়ুর দেশে এই বিরহবেদনা ও দীর্ঘশ্বাস প্রাণের বন্ধুর জন্য উপচে পড়ে। যেন বলতে চায়—বৈশাখ কত কিছুর ওলটপালট করে দিল অথচ যার জন্য খুঁটি ধরে বসে আছি তুমি কোথায় হে বন্ধু আমার।

তবে বৈশাখের সবচেয়ে বড় অবদান হলো এই কথায় বিশ্বাস করা যে, তাণ্ডব যতই প্রচণ্ড হোক স্বল্প সময়ের জন্য তা আসে। এবং তার অবসান ঘটার যে বিশ্বাস থাকে যাকে আমরা আশা বলি, তা একটা দীপশিখার মতো জ্বালিয়ে রাখা। সবাই ভাবে ঝড় এসেছে, একটু পরেই তা থেমে যাবে। জীবন আবার স্বাভাবিকতায় ফিরবে। যে দুর্যোগের জন্য তোমার সঙ্গে আমার মিলন হলো না তা ঝঞ্ঝাবায়ুর অবসানে আবার সুগম হয়ে উঠবে। ঝরা পাতা মাড়িয়ে আসবে আমার প্রিয়তম। এটাই হলো বৈশাখের সবচেয়ে বড় অবদান, যাকে আমরা বলি ‘আশার আকুলতা’।

এর ওপর ছড়িয়ে পড়ে বৃষ্টির ঝরঝরানি। জলের যত রকম জাদু আছে, আছে হিংস্রতা এবং একই সঙ্গে উপাদেয় আরাম, তার সমাগম ঘটে বৈশাখের প্রথম দিন থেকেই।

বৈশাখ আমাদের বুকে কোনো আক্ষেপ জমা করে না। বরং কীর্তনের করতালের মতো জীবনের আশাকে ঝনঝনিয়ে বাজিয়ে দেয়। যেখানে কোনো কিছুই স্থায়ী নয় সেখানে বন্ধুত্বের, প্রেমের, ভালোবাসার দিকেই আগ্রহটা ব্যাকুলতা নিয়ে হাত বাড়িয়ে দেয়।

বৈশাখ সব লন্ডভন্ড করে দেয় বলেই খুঁটির এত দাম। আর আমাদের সমাজে পরস্পরনির্ভরতা হলো সম্পর্কের খুঁটির মতো। ওই অদৃশ্য খুঁটি ভাঙে না, মচকায় না। ঝঞ্ঝাবায়ু যখন স্তিমিত হয়ে আসে তখন এ দেশের সাধারণ মানুষ ঘরের বাইরে এসে আকাশের দিকে তাকায়। এটা যেন সারা বছরের মধ্যে একবার নীলিমার দিকে দৃষ্টিপাত। অথচ বৈশাখের আগে সকলের মাথার ওপর এই আকাশটা ছাদ হয়ে বিরাজমান ছিল। কই একবারও তো আমি, তুমি, আমরা আকাশের দিকে তাকাইনি। ওই আকাশ থেকে ঝঞ্ঝাবায়ু এসেছে বলেই না ঝড়ের পরে আমরা অন্তত বার দুয়েক আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বস্তি অনুভব করতে চাই। বৈশাখ হলো এই ঊর্ধ্ব গগনে অন্তত একবার দৃষ্টিপাত করার সুযোগ সৃষ্টিকারী মাস।

লেখক : দেশের অন্যতম প্রধান কবি

ফেলে আসা নববর্ষ

‘গাঙাড়ি’ থাইকা বাঙলা

উৎসবের রাজনীতি, অর্থনীতি ও দর্শন

ভুলে যাওয়া সূর্যের জীবন

বাংলা সনের জীবনী

বাংলার মুর্শিদি গান

বৈশাখে ইলিশকাণ্ড

বাংলা নববর্ষের ইতিহাস

পহেলা বৈশাখ

বাংলার হারানো সনের কথা