বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ আজ আমরা উদ্যাপন করছি। এই বাংলা সনের সঙ্গে যার নাম জড়িয়ে আছে তিনি আমির ফতেহউল্লাহ শিরাজী। সম্রাট আকবরের নওরতন সভার সদস্য না হলেও মর্যাদার দিক দিয়ে তিনি ‘দৈবে দশম রত্ন’ সদৃশ হয়ে উঠেছিলেন। বিশেষ করে ফৈজী, আবুল ফযল ও বীরবলের পরেই তার নাম উচ্চারিত হয়। শাহানশাহ আকবরের তিনি অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। শাহানশাহ তাকে কাছ ছাড়া করতেন না; এমনকি ভ্রমণ বা শিকারে গেলেও সম্রাট তাকে সঙ্গে নিতেন। আবুল ফজল বিখ্যাত ‘আকবরনামা’ গ্রন্থে তার অসাধারণ বিদ্যাবত্তা, সাহস ও কর্মকুশলতার প্রশংসা করেছেন। এক স্থানে তিনি এমনও বলেছেন যে, ‘যদি এমন দুর্ঘটনা কোনোদিন ঘটে যে দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো নষ্ট হয়ে যায় আর শিরাজী সাহেব জীবিত থাকেন, তাহলে তিনি একাই তার পুনর্গঠন করতে সক্ষম হবেন।’ (আবুল ফজল, আইন-ই-আকবরী)
ব্যক্তিজীবন ও শিক্ষা
সৈয়দ মীর ফতেহউল্লাহ শিরাজী ছিলেন একজন ইন্দো-পার্সিয়ান সুফি পলিম্যাথ এবং উদ্ভাবক। যিনি বহু বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। যার মধ্যে ধর্মতত্ত্ব, সাহিত্য, ব্যাকরণ, দর্শন, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিত মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং।
সৈয়দ মীর ফাতুল্লাহ শিরাজি সাফাভি ইরানের শিরাজ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। শিরাজেই বেড়ে ওঠেন। আজার কায়ভানের মাদরাসায় শিক্ষা লাভ করেন। সেখানে বিখ্যাত যুক্তিবিদ জালালুদ্দীন দাভানির ছাত্র খাজা জামালউদ্দিন মাহমুদের তত্ত্বাবধানে দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা অধ্যয়ন করেন। মীর গিয়াসউদ্দিন মনসুরের নির্দেশনায় চিকিৎসাবিদ্যা, গণিত এবং বিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জন করেন।
শিক্ষা শেষ করার পর তিনি শিরাজ শহরে শিক্ষকতা করেন। তার উল্লেখযোগ্য ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন আব্দুল রহিম খান-ই-খানান, যিনি মুঘল সম্রাট আকবরের ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন হিসেবে কাজ করছেন ।
ইরান থেকে ভারতে
ভারতে আসার আগে শিরাজি সাফাভি অভিজাতদের ধর্মীয় কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। সুলতান আদিল শাহ প্রথমের আমন্ত্রণে তিনি ভারতে চলে আসেন এবং তার সফরের খরচ সুলতান বহন করেছিলেন। ১৫৮০ সাল পর্যন্ত তিনি বিজাপুরে বাস করেন।
বিজাপুর সালতানাত ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শক্তিশালী মুসলিম সালতানাত। দক্ষিণ ভারতের দাক্ষিণাত্যের পশ্চিমাঞ্চলীয় অঞ্চলে বিজাপুরে ইউসুফ আদিল শাহ ১৪৮৯ সালে এ সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন। ১৬৮৬ পর্যন্ত এটি টিকে ছিল। বিজাপুর ১৫ শতাব্দীর শেষ প্রান্তের রাজনৈতিক পতনের আগে এবং ১৫১৮ সাল পর্যন্ত বাহমানি সালতানাতের (১৩৪৭–১৫১৮) একটি প্রদেশ ছিল। বিজাপুর সালতানাত মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব কর্তৃক বিজয়ের পরে ১৬৮৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্গে মিশে যায়।
আকবরের দরবারে
১৫৮৩ সালে, শিরাজি মুঘল সম্রাট আকবরের কাছ থেকে আমন্ত্রণ পান এবং পরবর্তী সময়ে আগ্রার রাজকীয় দরবারে যোগদান করেন। শিগগিরই তিনি আমির উপাধি এবং ৩০০০ মনসব পদমর্যাদা অর্জন করেন। দুই বছর পর, ১৫৮৪ সালে, সম্রাট আকবর তাকে আমিন-উল-মুলকÑরাষ্ট্রের ট্রাস্টিÑহিসেবে নিযুক্ত করেন। শিরাজির প্রথম কাজ ছিল মোগল সাম্রাজ্যের বিশাল লেনদেনের নথিগুলো পুনরায় পরীক্ষা করা এবং সংশোধন করা। এ দায়িত্ব তিনি গভীর অধ্যবসায় ও সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করেন। প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি শিরাজি মুদ্রার অন্তর্নিহিত মূল্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও পালন করেন। মুদ্রার অসঙ্গতিগুলো চিহ্নিত করে সংশোধন করেন।
উপাধি ও সম্মাননা
শিরাজীর দক্ষতা ও প্রতিভা তাকে বিভিন্ন সম্মান ও উপাধি এনে দিয়েছিল। ১৫৮৫ এবং ১৫৮৭ সালে সম্রাট তাকে দাক্ষিণাত্যে কূটনৈতিক মিশনের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নির্বাচিত করেন। তার প্রচেষ্টার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ‘আজাদ-উদ-দৌলা’ বা সম্রাটের বাহু উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এছাড়া তিনি একটি ঘোড়া, ৫০০০ টাকা, একটি সম্মানসূচক পোশাক এবং হিন্দুস্তানের প্রধান হিসেবে ‘সদর’ পদ লাভ করেন। ‘মীরআতুল আলম’ গ্রন্থে ফতেহউল্লাহ শিরাজীকে বিশেষ প্রজ্ঞাসম্পন্ন মনীষী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি একজন দক্ষ শিকারিও ছিলেন। ‘আমীর-উল-উমারা’ গ্রন্থে তাকে ‘ছে হাজারী মনসবদার’ বা তিন হাজারী সেনাপতিও বলা হয়েছে। তার বীরত্বেরও বিশেষ খ্যাতি ছিল। বীরত্বের জন্য তার উপাধিও ছিল ‘রোস্তম সানী’ বা দ্বিতীয় রোস্তম।
বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার
পলিম্যাথ ফতেহউল্লাহ শিরাজী এসবের বাইরে বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্র আবিষ্কার করেন। যেমন হ্যান্ড ক্যাননের মতো একাধিক বন্দুকের নলসহ পদাতিক-বিরোধী ভলি বন্দুক। আবিষ্কার করেন ‘ইয়ারগু’ নামে পরিচিত আরেকটি যন্ত্র, যা একই সঙ্গে ষোলটি বন্দুকের নল পরিষ্কার করতে পারত। এটি গরু দিয়ে চালিত হতো। তার আরেকটি বিশেষ উদ্ভাবন সতেরো নলযুক্ত কামান এবং একটি আরামদায়ক গাড়ি। এই গাড়ি যাত্রী পরিবহন করার পাশাপাশি শষ্য পেষণ করার জন্যও ব্যবহৃত হতো।
রচনাবলি
শিরাজি বিভিন্ন বিষয়ে ফার্সি ভাষায় একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। যার মধ্যে অন্যতম হলো কোরআনের অনুবাদ ভাষ্য। দর্শন এবং যুক্তিশাস্ত্রেও তিনি উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। বিশেষ করে তার ‘তাকমিলাত-ই-হাশিয়াহ’ গ্রন্থ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া তিনি ইসলামের হাজার বছরের ইতিহাস ‘তারিখ-ই আলফি’ সংকলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ইন্তেকাল ও আকবরের আফসোস
১৫৮৮-৮৯ সালে জ্ঞানসাগর শিরাজি ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুতে সম্রাট আকবর গভীরভাবে মর্মাহত হন। আফসোস করে বলেন, ‘যদি সে (শিরাজি) ফ্রাঙ্কদের হাতে ধরা পড়ত এবং তারা তার বিনিময়ে আমার সমস্ত ধনসম্পদ দাবি করত, তবে আমি সানন্দে এই লাভজনক ব্যবসায় প্রবেশ করতাম এবং সেই মূল্যবান রত্নটি (শিরাজিকে) সস্তায় কিনে নিতাম।’