বাংলাদেশ আজ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। আমাদের অর্থনৈতিক সূচক ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে, দিগন্তজুড়ে সুউচ্চ দালানকোঠা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে; কিন্তু একটি দেশের প্রকৃত সক্ষমতার পরিচয় গ্রোথিত থাকে অন্যত্র—আর তা হলো নাগরিকের নৈতিক সাহস, জনজীবনের প্রাত্যহিক আচরণ এবং নাগরিক সমাজের বলিষ্ঠতার ওপর। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, কোনো জাতি টিকে থাকে শুধু ক্ষমতা বা সমৃদ্ধির জোরে নয়; বরং টিকে থাকে সাধারণ মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি এবং চর্চিত মূল্যবোধের শক্তিতে।
এই তাৎপর্যময় মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বা উন্নয়ন-সংক্রান্ত সূচকের চেয়ে আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এখন প্রয়োজন দেশপ্রেমিক হৃদয়—যা দেশের প্রতি ভালোবাসায় অটুট এবং নাগরিক প্রজ্ঞা—যা সততা, দক্ষতা ও সদাচরণ দ্বারা পরিচালিত। এই দুইয়ের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে একটি স্থিতিস্থাপক গণতন্ত্র এবং একটি বিকশিত সুশীল সমাজ।
দেশপ্রেমিক মানেই নিছক দর্শক নন, তারা সমাজ গড়ার কারিগর
দেশপ্রেম মানেই শুধু গগনবিদারী স্লোগান বা প্রতীকী অঙ্গভঙ্গি নয়। প্রকৃত দেশপ্রেম অনেক বেশি গভীর আর সাহসের ব্যাপার। এটি হলো সততার সঙ্গে কথা বলার সাহস, ন্যায়সংগত কাজ করার স্পৃহা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা। প্রতিটি প্রকৃত দেশপ্রেমিক অন্তরে সুপ্ত থাকেন একজন সমাজ সংস্কারক এবং ইতিহাসের নির্মাতা।
আমাদের যাত্রার শুরুটা হতে হবে সততা দিয়ে। ব্যক্তিগত বা রাষ্ট্রীয় জীবনে সততা না থাকলে কোনো প্রতিষ্ঠান যেমন আস্থা অর্জন করতে পারে না, তেমনি কোনো গণতন্ত্রও কার্যকর হতে পারে না। সুশাসনে স্বচ্ছতা, নেতৃত্বে জবাবদিহি এবং ক্লাসরুম থেকে আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সামাজিক আঙিনা—সবখানে নৈতিক আচরণই হলো সততার পূর্বশর্ত। একবার ভেঙে যাওয়া বিশ্বাস পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন ও সময়সাপেক্ষ, তবে সেই বিশ্বাস যখন আবার ফিরে আসে, তখন তা একটি জাতির সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পদে পরিণত হয়।
দক্ষতা শুধু জীবিকার তাগিদ নয়, নাগরিককে শক্তিশালী করারও হাতিয়ার
বাংলাদেশ মানবসম্পদের বিপুল সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ। ঢাকার অলিগলিতে ছুটে চলা প্রাণবন্ত তরুণ সমাজ থেকে শুরু করে গ্রাম ও উপকূলীয় এলাকার সংগ্রামী জনগোষ্ঠী—সর্বত্রই প্রতিভার প্রাচুর্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই সম্ভাবনা অনেক সময়ই পূর্ণ বিকাশ লাভ করে না, কিংবা ভুল পথে পরিচালিত হয়।
দক্ষতার লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু কর্মসংস্থান নয়, বরং সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণও। শিক্ষাব্যবস্থাকে এমন মানুষ গড়ে তুলতে হবে, যারা শুধু শ্রমিক বা চাকরি প্রার্থী নন, বরং সমস্যা সমাধানকারী, উদ্ভাবক এবং নৈতিক নেতৃত্বদাতা। কারিগরি দক্ষতা, ডিজিটাল জ্ঞান, উদ্যোক্তা মানসিকতা ও নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ—সবকিছুর ভিত্তি হতে হবে সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জাতি গঠনের চেতনা।
জাতীয় সম্পদ হিসেবে শুদ্ধাচার
আজকের এই মেরূকরণকৃত এবং নৈতিকভাবে বিপর্যস্ত পৃথিবীতে ‘সদাচরণ’ বা শিষ্টাচারকে তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু মোটেও তা নয়। শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা এবং সৌজন্য হলো সেই অদৃশ্য বন্ধন, যা বৈচিত্র্যময় মানুষকে একসূত্রে গেঁথে রাখে। আমরা কী বিশ্বাস করি, তার চেয়েও বড় কথা হলো আমরা কীভাবে আমাদের ভিন্নমতের প্রকাশ ঘটাই। ‘ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল হওয়া’ বা ‘তর্কে না জড়িয়ে ভিন্নমতকে সম্মান জানানোই’ হলো বর্তমান সময়ের বিষনাশক।
শিষ্টাচার কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি আত্মবিশ্বাস এবং নৈতিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ। এটি চিৎকারের বদলে সংলাপ, জবরদস্তির বদলে বোঝাপড়া এবং বিভক্তির বদলে ঐক্যের পথ প্রশস্ত করে। সৌজন্যবোধহীন কোনো সমাজ দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে না।
সচেতনতা হতে কর্মতৎপরতা : সুদৃঢ় সমাজ পুনর্গঠনের রূপরেখা
বাংলাদেশের নাগরিক সমাজকে শক্তিশালী করতে আমাদের সুপরিকল্পিত ও সম্মিলিত পদক্ষেপ প্রয়োজনÑ
প্রথমত, সর্বত্র সততার চর্চা : নৈতিকতা ও নাগরিক শিক্ষাকে পরিবার থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে হবে। কর্মক্ষেত্রে সুস্পষ্ট আচরণবিধি থাকতে হবে এবং সমাজকে নিছক সাফল্যের বদলে সততাকে মূল্যায়ন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নাগরিক জীবনের দক্ষতা বৃদ্ধি : কারিগরি শিক্ষা, ডিজিটাল জ্ঞান এবং নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ সবার জন্য নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, এনজিও এবং বেসরকারি খাতকে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে কাজ করতে হবে।
তৃতীয়ত, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্বশীল আচরণ : একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা বাড়াতে প্রচার দরকার। ঘৃণা বা বাহুল্য কথা বলার সংস্কৃতি আইন দিয়ে নয়, সামাজিকভাবেই বয়কট করতে হবে।
চতুর্থত, সামাজিক অংশগ্রহণে সক্রিয়তা : গণতন্ত্রের কার্যকারিতা শুধু নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে গভীরতর হয়। স্থানীয় শাসন, সামাজিক সমস্যা সমাধান এবং সহযোগিতামূলক উদ্যোগে নাগরিক সম্পৃক্ততা অপরিহার্য। পরিচ্ছন্নতা থেকে জলবায়ু সহনশীলতা পর্যন্ত প্রতিটি দৈনন্দিন ইস্যুতে এই অংশগ্রহণ গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দৃঢ় করে।
পঞ্চমত, নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে স্বেচ্ছাসেবা : জনসেবার এই চেতনাকে আমাদের শিক্ষা ও পেশাগত জীবনের পরতে পরতে গেঁথে দেওয়া উচিত। স্বেচ্ছাসেবা মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা, নেতৃত্ব এবং সামাজিক আস্থা গড়ে তোলে, যা একটি জাতির টেকসই উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
ষষ্ঠত, গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা : নীতিবান সাংবাদিকতা এবং দায়িত্বশীল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার অপরিহার্য। আমাদের এমন সব গল্প বা সংবাদ বেশি প্রয়োজন, যা সমস্যা সমাধানের পথ দেখায়, সততাকে তুলে ধরে এবং সংস্কারের কথা বলে—এমন গল্প যা মানুষকে বিভাজিত করার বদলে অনুপ্রাণিত করবে।
সর্বোপরি, প্রয়োজন সততানির্ভর নেতৃত্বের : রাজনৈতিক, করপোরেট ও নাগরিক নেতৃত্বের প্রতিটি স্তরকে নৈতিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করা অপরিহার্য। তরুণ নেতৃত্বকে প্রভাবিত করার পরিবর্তে পরামর্শ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিকশিত করতে হবে। এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নাগরিকরা ক্ষমতার ধারকদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারেন।
জাতির বিবেকের প্রতি আহ্বান : বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু নীতিমালার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে না; নির্ধারিত হবে তার নাগরিকদের দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত ও আচরণের মাধ্যমে। প্রতিটি সৎকাজ, প্রতিটি শালীন ও শ্রদ্ধাশীল সংলাপ এবং নাগরিক দায়িত্ব পালনের প্রতিটি মুহূর্ত—সব মিলেই গণতন্ত্রের মেরুদণ্ডকে আরো শক্তিশালী করে।
একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ রাতারাতি গড়ে উঠবে না। তবে দেশপ্রেম ও নাগরিক শালীনতার ভিত্তিতে তা গড়ে উঠবে—ধীরে ধীরে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এবং সম্মিলিত প্রয়াসে।
বাংলাদেশের সচেতন নাগরিকদের প্রতি এই আহ্বান : এটাই আপনার সময়। আদর্শ নেতা বা নিখুঁত পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করবেন না। নিজেই উদাহরণ তৈরি করুন। স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করুন, জাতীয় স্বার্থে ভাবুন। সততা ও নৈতিকতার পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ান, দক্ষতাকে লালন করুন এবং শালীন আচরণকে ধারাবাহিকভাবে চর্চা করুন।
বাংলাদেশের যুবসমাজের প্রতি : নেতৃত্ব দিতে অনুমতির প্রয়োজন নেই : বাংলাদেশের তরুণদের বলছি : ভবিষ্যৎ তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে না—তোমরা ইতোমধ্যেই তার ভেতরে হাঁটছো। নিজের শক্তি, কণ্ঠস্বর আর দায়িত্বকে অবহেলা করো না। ইতিহাস সাক্ষী, বাংলাদেশ এগিয়েছে তখনই, যখন তার তরুণরা নীরবতা ভেঙে দাঁড়িয়েছে, নিষ্ক্রিয়তা ঝেড়ে ফেলেছে, উদাসীনতাকে অস্বীকার করেছে।
নেতৃত্ব বা পরিবর্তনের জন্য আনুষ্ঠানিক পদ, অবস্থান কিংবা আদর্শ কাঠামোর অপেক্ষা অনাবশ্যক। ব্যক্তির বর্তমান অবস্থান থেকেই উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন এবং অনলাইন উপস্থিতিতে সততা চর্চা অপরিহার্য। অনৈতিক সুযোগ, দুর্নীতি আর বিদ্বেষকে ‘না’ বলতে শেখো; এমনকি যদি সবাই তা গ্রহণ করে নেয় তবু। আজ যে সাহস তুমি দেখাবে, তা-ই ভবিষ্যতে তোমাকে সবার কাছে নির্ভরযোগ্য করে তুলবে।
নাগরিকদের এমন দক্ষতায় সজ্জিত হওয়া প্রয়োজন, যা সমাজের উন্নয়নকে সমর্থন করে, শুধু কর্মসংস্থান নয়। সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, স্পষ্ট যোগাযোগ এবং নৈতিক সংগঠন দক্ষতা অপরিহার্য। প্রযুক্তির ব্যবহার হতে হবে সমস্যা সমাধান, সম্প্রদায়ের সংগঠিতকরণ এবং ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য, বিভাজন সৃষ্টির জন্য নয়। ডিজিটাল দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিক দৃঢ়তা অপরিহার্য।
সম্মানকে সামাজিক মানদণ্ডে রূপান্তরিত করা অপরিহার্য। দ্বিমত প্রকাশের ক্ষেত্রে অবমাননাহীনতা বজায় রাখতে হবে। বিতর্কে মানবিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। বিভাজন সৃষ্টির পরিবর্তে সংযোগ স্থাপন করতে হবে। এক বিভক্ত ও কোলাহলপূর্ণ বিশ্বে শান্ত ও নীতিনিষ্ঠ অবস্থানই টেকসই সমাধান।
সামাজিক ও নাগরিক জীবনে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ গণতান্ত্রিক কাঠামোর স্থায়িত্বের জন্য অপরিহার্য। স্বেচ্ছাসেবা, স্থানীয় উদ্যোগ, শিক্ষার্থীদের যৌথ প্রয়াস, কমিউনিটি সংগঠন, জলবায়ু আন্দোলন এবং সামাজিক উদ্যোগে সম্পৃক্ততা তরুণদের নাগরিক দায়িত্ববোধকে সুদৃঢ় করে। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, তরুণদের উদাসীনতা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে আর তাদের দৃঢ় অংশগ্রহণ গণতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—এটা মনে রাখা যে, নেতৃত্ব জন্মসূত্রে পাওয়া যায় না, বরং মানুষের সেবার মাধ্যমেই তা অর্জন করতে হয়। বাংলাদেশের এখন তথাকথিত ‘নিখুঁত’ কোনো তরুণের দরকার নেই; দরকার এমন কিছু তরুণের, যারা নিজের লক্ষ্যে অবিচল, নৈতিকতায় দৃঢ় এবং মনে সাহসে অটুট। নেতৃত্বের মশাল এখন তোমাদেরই হাতে। এবার সেই মশাল নিয়ে এগিয়ে চলো—সততা, দক্ষতা আর মর্যাদার সঙ্গে।
লেখক : ব্রিটিশ বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ, গ্রন্থাকার, নাগরিক অ্যাডভোকেট ও প্যারেনটিং কনসালট্যান্ট