হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

নতুন বাংলাদেশ গঠনে জাতীয় সরকার নাকি ভিন্ন সমাধান

প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবদুর রব

প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবদুর রব

জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসের মোড় পরিবর্তন করে দেওয়া একটি ঘটনা এবং একটি নতুন সম্ভাবনা ও অঙ্গীকারের দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছে। এই অঙ্গীকার নতুন গণতান্ত্রিক, সার্বভৌম ও বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম স্বপ্ন ছিল গণতান্ত্রিক শাসন নিশ্চিত করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যাত্রা বারবার ব্যাহত হয়েছে। নিজেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি দাবিকারী শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে গণতান্ত্রিক শাসন রহিত করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করেন। বাকশালীয় দুঃশাসনে অতিষ্ঠ হয়ে কিছু সামরিক অফিসার ‘সামরিক অভ্যুত্থান’ ঘটায় এবং শেখ মুজিবুর রহমান এতে সপরিবারে নিহত হন। এরপর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের ক্রান্তিকালে শাসনের ভার তুলে নেওয়া শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গণতন্ত্রকে পুনর্বহাল করেন। কিন্তু তার শাহাদতের পর দেশ একনায়কতান্ত্রিক সামরিক শাসনের ফাঁদে পড়ে। ১০ বছর সামরিক শাসনের পর ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ আবার গণতান্ত্রিক শাসনের মুখ দেখে। তবে না তা এই গণতন্ত্র যথাযথ পর্যায়ে উন্নীত হতে পেরেছিল আর না তা দেশকে আকাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছে। দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব, সংঘাত, অগণতান্ত্রিক ও সহিংস আচরণ দেশকে বারবার পিছিয়ে দিয়েছে। এরই পরিক্রমায় দেশি ও বিদেশি শক্তিদের চক্রান্ত এবং সহযোগিতায় ফখরুদ্দীন ও মঈন উ আহমেদের ১/১১-এর সরকার ২০০৮ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং ইলেকশন করে আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়। এই ক্ষমতা হস্তান্তর ছিল বাংলাদেশের জন্য এক অশনিসংকেত। ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের যে অর্জন ছিল, তা যেন আবার পেছনের দিকে যাত্রা শুরু করে। এরপর ১৬টি বছর বাংলাদেশকে আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী শাসন প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে। এর মধ্যে তিন তিনটি জাতীয় নির্বাচন নামেমাত্রই হয়েছে। এর মধ্যে দুটি (২০১৪ ও ২০২৪) ছিল বিরোধী দলের অংশগ্রহণবিহীন, আরেকটি (২০১৮) ছিল ভোট ডাকাতির নির্বাচন। এটাই ছিল বাংলাদেশে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরশাসন। প্রতিবেশী একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের একচ্ছত্র সমর্থনে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর চরম দমন-নিপীড়ন চালিয়ে ১৬ বছরব্যাপী আওয়ামী ফ্যাসিবাদ টিকে ছিল। সব স্বৈরাচারীর মতো আওয়ামী লীগও ক্ষমতার জোরে সব জবাবদিহির ঊর্ধ্বে ওঠে নিজেদের দুর্জেয় ভাবতে শুরু করেছিল। এই নিশ্চিন্ততা থেকেই আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা অকল্পনীয় দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, খুন-রাহাজানির রাজত্ব কায়েম করে রেখেছিলেন। এই দাম্ভিকতা আওয়ামী লীগকে ভুলিয়ে দিয়েছিল, জনগণের ক্ষোভকে চিরদিন দমন করে রাখা যায় না। আর এই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে, যখন দেশব্যাপী ছাত্রদের কোটাব্যবস্থা সংস্কারের ন্যায্য দাবিকেও আওয়ামী সরকার সহিংসভাবে দমন করতে যায়। ছাত্র-জনতার অসীম সাহসিকতা ও দৃঢ়তার সামনে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকার এবং তার বিদেশি প্রভু বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। জুলাই বিপ্লব সফল হয় এবং শেখ হাসিনা দিল্লিতে পলায়ন করে।

জুলাই বিপ্লবের পর দেশ ও জাতির সম্মিলিতভাবে আত্মপর্যালোনার প্রথমেই উঠে আসে এই প্রশ্ন যে, বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে একটি গণতান্ত্রিক দেশ এবং এর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো গণতন্ত্রমুখী হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে আওয়ামী ফ্যাসিবাদ জন্ম নেওয়া ও ১৬ বছরের দীর্ঘ সদর্পে টিকে থাকার সুযোগ পেল। ভবিষ্যতে যেন কোনোভাবেই এ ধরনের স্বৈরাচারিতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ না পায়, সেজন্য অন্তর্বর্তী সরকার দল-মত নির্বিশেষে সবার সহযোগিতায় রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সংস্কারের পদক্ষেপ নেয় এবং এই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কমিটি গঠন করে। তারা কয়েক মাস কাজ করে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলোয় বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব পেশ করে। এরপর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এই প্রস্তাবনাকে আরো পরিমার্জন করা হয়। এই পরিমার্জিত প্রস্তাবনাই জুলাই সনদ হিসেবে খ্যাতি লাভ করে।

অথচ সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারের কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে একটি সংগঠিত ও নীতিনির্ভর বিরোধী দলের উপস্থিতির ওপর। সংসদীয় গণতন্ত্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও জবাবদিহিমূলক শাসন। এই কাঠামোর মধ্যে বিরোধী দলের ভূমিকা শুধু সরকারবিরোধী অবস্থান গ্রহণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নীতি, আইন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের ওপর গঠনমূলক নজরদারি চালানোই বিরোধী দলের প্রধান দায়িত্ব। রাজনৈতিক তাত্ত্বিকরা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়ে আসছেন, দুর্বল বিরোধী দল মানেই দুর্বল গণতন্ত্র। শক্তিশালী বিরোধী দল সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিকল্প নীতির মাধ্যমে জনগণের সামনে একটি বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক বিকল্প উপস্থাপন করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরোধী দলের ভূমিকা প্রায়ই সংসদের বাইরে আন্দোলনকেন্দ্রিক থেকেছে। ফলে সংসদীয় বিতর্ক, নীতিনির্ভর সমালোচনা এবং বিকল্প শাসনব্যবস্থার রূপরেখা উপস্থাপনের সুযোগ সীমিত হয়েছে। এই বাস্তবতায় ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ ব্যবস্থা বিরোধীদলীয় রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। ছায়া মন্ত্রিসভা এমন একটি সাংগঠনিক ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা থাকেন। তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নীতি ও কর্মসূচি বিশ্লেষণ করেন এবং সংসদে ও জনপরিসরে সরকারের সিদ্ধান্তের বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ ব্যবস্থা রয়েছে। তাদের গঠন ও কার্যক্রমও দেশভেদে ভিন্ন হতে পারে। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক, ইউক্রেন, থাইল্যান্ড, ইরান, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, সার্বিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। বাংলাদেশে ছায়া মন্ত্রিসভার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ শুধু বিরোধী রাজনীতির ধরনকেই পরিবর্তন করবে না; বরং বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরো কাঠামোবদ্ধ ও নীতিনির্ভর করে তুলতে পারে। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যকার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যদি নীতিগত পরিসরে স্থানান্তরিত হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক শাসনের মান উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। ছায়া মন্ত্রিসভা তিনটি মূল কার্যাবলি সম্পাদন করেÑসরকারের সিদ্ধান্তের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, বিকল্পনীতির কাঠামো উপস্থাপন এবং ভবিষ্যৎ সরকার পরিচালনার প্রস্তুতি। ছায়া মন্ত্রিসভাকে কার্যকর করতে হলে প্রতিটি ছায়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে গবেষণা ও নীতিবিশ্লেষণ ইউনিট থাকা জরুরি। সংসদ অধিবেশনে নিয়মিত নীতিসংক্রান্ত ব্রিফ, বাজেট অধিবেশনে বিকল্প বাজেট কাঠামো এবং নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয়ের উদ্যোগ ছায়া মন্ত্রিসভাকে শুধু প্রতীকী নয়, বরং প্রভাবশালী করে তুলবে।

নির্বাচনের পর বাংলাদেশ যেন আবার অতীতের মতো গণতন্ত্রের মোড়কে সরকার এবং বিরোধী দলগুলোর মধ্যকার হানাহানি ও সংঘাতের পরিস্থিতিতে প্রত্যাবর্তন না করে, সে জন্য ‘ছায়া মন্ত্রণালয়’-এর প্রচলন করার কথা চিন্তা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, তারা খুব সহজেই ‘ছায়া মন্ত্রণালয়’কে সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। এর ফলে প্রধান বিরোধী দল যেই হোক না কেন, তারা নির্বাচনের পর থেকেই সরকারবিরোধী আন্দোলনে ব্যস্ত না থেকে সংসদে গঠনমূলক অবদান রাখতে নৈতিকভাবে বাধ্য থাকবে। তা না করে প্রধান বিরোধী দল যদি নিজেদের কার্যক্রম শুধু সংসদের বাইরে সীমাবদ্ধ রাখে, তাহলে জনগণের চোখে তাদের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

হাজার ছাত্র-জনতার রক্তে অর্জিত জুলাই বিপ্লবকে কোনোভাবেই ব্যর্থ না হতে দিলে চাইলে প্রয়োজন শক্তিশালী, গঠনমূলক ও স্থিতিশীল সংসদব্যবস্থা। ছায়া মন্ত্রণালয় এই ক্ষেত্রে হতে পারে একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ।

লেখক : এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ অ্যান্ড থটস (সিএএসটি)

দেশপ্রেমই গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য বন্ধন

আইপিএল মোস্তাফিজ ও ভারতের আসল চেহারা

দেশকে বদলাতে ভোটের জাগরণ

সুষ্ঠু নির্বাচন : অতীত মনে রাখুন

ভোটের দরজায় বাংলাদেশ

‘না’ মানে অতীত, ‘হ্যাঁ’ মানে বাংলাদেশ

জনগণের তিন পদক্ষেপে বদলাতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

তরুণদের রাজনীতি, পুরোনোদের চ্যালেঞ্জ

পরাধীনতার শত্রু-মিত্র নির্ধারণ

বাংলাদেশ নীতি বদলাতে হবে ভারতকে