ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ফলে বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতি ও বাণিজ্য এক অস্থির সময় পার করছে। ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে সংঘাত এবং পাল্টা হামলার রাজনীতি গড়ে উঠেছে, তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের একটি আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব নয়, বরং এই উত্তাপ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে শুরু করে বিশ্বব্যাপী। জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে যখন আলোচনা চলছিল, তখন পর্দার অন্তরালে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ইরানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানে বিমান হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ মাত্র দেড় মাসের মধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং অগণিত মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারা। প্রতিবাদে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনায়, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোয় হামলা করে। এই হামলা-পাল্টা হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নেমে আসে এক বিপর্যয়কর সংঘাতের ছায়া। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আগ্রাসনের প্রতিবাদে ইরান গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে বিশ্বব্যাপী তেলের যে সংকট দেখা দিয়েছে, তা সরাসরি বাংলাদেশের ওপরও প্রভাব ফেলেছে। যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলার থেকে লাফিয়ে ১২০ ডলারে পৌঁছায়।
টানা ছয় সপ্তাহ যুদ্ধের পর পাকিস্তানের মধ্যস্ততায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। সাময়িক যুদ্ধবিরতির ফলে যুদ্ধের ধোঁয়া আপাতত কেটে গেলেও ইসলামাবাদ সংলাপ ব্যর্থ হওয়ায় আবার যুদ্ধের আগুন যেকোনো সময় জ্বলে উঠতে পারে। এই যুদ্ধের ফলে যে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেছে, তা হলো—উপসাগরীয় এলাকায় ও গোটা পৃথিবীতে আর আগের মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব থাকছে না। ইরানি হামলার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে কিছু ধারণা মিলছিল। নিউ ইয়র্ক টাইমস তা স্পষ্ট করে এক প্রতিবেদনে বলেছে, ইরানের হামলায় কমপক্ষে ১৭টি মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনা সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে তাদের অনেক সেনা মারা পড়েছেন। হামলার শিকার হয়েছে একাধিক মার্কিন দূতাবাস। ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি না করলেও ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দিয়েছে, সেখানে কোনো মার্কিন ঘাঁটি রাখা যাবে না। তাই যুদ্ধ শেষে এসব ঘাঁটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোও আর নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখবে না। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের হয়ে এসে চীন-রাশিয়া মিটিং করেছে। ইংল্যান্ড, ফ্রান্সসহ ইউরোপের দেশগুলো আলাদা করে মিটিং করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নেই। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরবও ইরানের সঙ্গে মিটিং করে বলেছে—সৌদি আরব ইরানকে পূর্ণ সমর্থন দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব যে কমছে, তা সহজেই অনুমেয়।
ইতোমধ্যে ইরানের নৌ-অবরোধের পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ১৩ এপ্রিল মার্কিন সেনাবাহিনী ইরানি বন্দরে পাল্টা নৌ-অবরোধ আরোপ করে, যা হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করবে এবং এর ফলে তেল ও গ্যাসের মূল্য আরো বৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে। ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা ও খাদ্যের সংকট দেখা দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের হরমুজ বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় ইয়েমেনের হুতিরা যদি লোহিত সাগরে বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তাহলে হরমুজ আর বাব আল-মান্দেব মিলিয়ে পৃথিবীর প্রায় ৩০ ভাগ তেল-গ্যাস রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাবে! হুতিরা ইতোমধ্যে বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধের হুমকি দিয়েছে। হুতিরা যদি সত্যিই বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেয়, পৃথিবী কি পারবে এই ধকল নিতে?
দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফা আলোচনার উদ্যোগ ভেস্তে গেছে। এ সংকটের সময় যেকোনো নতুন আলোচনা হবে বড় পরীক্ষা। কারণ, যুদ্ধবিরতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরের ওপর নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে এবং ইরান হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ প্রথমে সীমিত ও পরে বন্ধ রাখায় বিশ্বব্যাপী তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ ঘোষণা করেছে—এভাবে যদি যুদ্ধ আর কয়েক সপ্তাহ যুদ্ধ চলে, তাহলে পুরো পৃথিবী অর্থনৈতিক মন্দায় প্রবেশ করবে। যেটা কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে এবং আমেরিকায়ও ভয়ংকর প্রভাব ফেলবে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্য সরবরাহে বিঘ্ন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস—সব মিলিয়ে একটি বড় সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদের দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন এবং শিল্প খাত তেলের ওপর নির্ভরশীল। সরকার ইতোমধ্যে দেশে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। তেলের দাম বাড়ার কারণে দেশে বিদ্যুৎ ও পরিবহনের খরচ বাড়বে, মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নেমে যাবে। সেই সঙ্গে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যেতে পারে, রপ্তানি খরচ বাড়বে, আমদানি সংকুচিত হবে। ফলে দেশে অর্থনীতির এক জটিল অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে ‘আপাতত জ্বালানি সংকট নেই’ এমন বার্তা দেওয়া হলেও অস্থিরতা কাটেনি। বরং জ্বালানি নিয়ে অনিশ্চয়তার শঙ্কায় ফিলিং স্টেশনে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন অনেকে। কয়েক দিন ধরে জ্বালানি নিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় পরিস্থিতি অনেকটা এমনই। শুধু বাংলাদেশ নয়, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সংঘাত শুরুর পর থেকেই জ্বালানি নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বিশ্বেই। যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে জ্বালানি নিয়ে বৈশ্বিক অস্থিরতা আরো বাড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় জ্বালানি নিয়ে বাংলাদেশের চিন্তা আরো বেশি। সঠিক প্রস্তুতি না থাকলে সংকট মোকাবিলা কঠিন হতে পারে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েক দিনে জ্বালানি নিয়ে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ। এতে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কতটা কমেছে, তা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন রয়েছে। এছাড়া সরকার জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করার জন্য কয়েকশ কোটি টাকা উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে সাহায্য চেয়েছে। সংকট মোকাবিলায় ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে চীনের সহায়তাও চেয়েছে বাংলাদেশ। সমস্যা হচ্ছে চীন ও ভারত নিজেরাই জ্বালানি তেলের বড় আমদানিকারক দেশ। নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে তারা বাংলাদেশের জ্বালানি সমস্যার সমাধানে কতটুকু সাহায্য করতে পারবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তাই জ্বালানি সমস্যার সমাধানে সরকারকে এখনই টেকসই পদক্ষেপ নিতে হবে।
বৈশ্বিক এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে বাংলাদেশে কোনো জাতীয় সংলাপ হচ্ছে না, এমনকি সাধারণ মানুষকেও জানানো হচ্ছে না এই যুদ্ধ তাদের জীবনে কী প্রভাব ফেলতে পারে। আজকের দুনিয়ায় কোনো দেশ একা নয়, এক দেশের সংকট বা যুদ্ধের প্রভাব অন্য দেশের ওপরও পড়ে। বিশেষ করে, বাংলাদেশের মতো যেসব দেশ ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের কোনো ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি ডকট্রিন (National Security Doctrine) বা জাতীয় নিরাপত্তা রূপরেখা নেই। এমনকি দেশে এমন কোনো বিশেষজ্ঞ কমিটি নেই, যারা যেকোনো সংঘাত পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সরকারকে পরামর্শ দেবে। এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত কৌশল—যেখানে সামরিক, বেসামরিক, একাডেমিক ও রাজনৈতিক স্তরে সবাই একসঙ্গে কাজ করবে। এখনকার বিশ্বে সম্পর্ক তৈরি হয় পারস্পরিক বিশ্বাস, কৌশল এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার মাধ্যমে। এখন শুধু যুদ্ধ নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমেও দেশগুলো তাদের শক্তি ও প্রভাব বাড়ায়। বাংলাদেশ তার সমুদ্রপথ, ভৌগোলিক অবস্থান ও জনসংখ্যাকে কাজে লাগিয়ে কৌশল নির্ধারণ করলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক সক্ষমতার তুলনায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা একেবারেই দুর্বল; কিন্তু তারপরও ইরান এখনো টিকে আছে, কারণ তারা বছরের পর বছর ধরে কৌশলগতভাবে নিজেদের প্রস্তুত করেছে। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণাধর্মী, তাদের সামরিক বাহিনী প্রযুক্তিনির্ভর এবং তাদের কূটনৈতিক কাঠামো অত্যন্ত দক্ষ। ইসলামাবাদ আলোচনায় ইরানি কূটনীতিকরা অত্যন্ত দৃঢ়তা দেখিয়েছে। তারা শুধু আবেগ দিয়ে যুদ্ধ করছে না, বরং জ্ঞান ও দূরদর্শিতা দিয়ে যুদ্ধ করছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো যখন শুধু বিবৃতি দিয়ে দায় এড়িয়ে যাচ্ছে, তখন পাকিস্তান নিরলস কূটনীতি চালিয়ে যাচ্ছে এবং কূটনীতির জগতে তাদের সেরা সময় পার করছে। এই যুদ্ধবিরতি সফল হলে পাকিস্তানের নাম ইতিহাসে দীর্ঘদিন পর্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হবে।
বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান খুবই স্পর্শকাতর। বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যকার নিরাপত্তা প্রতিযোগিতায় সরাসরি যুক্ত না হয়ে স্বাধীনতা এবং জাতীয় স্বার্থ বজায় রেখে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নীতির উন্নয়ন করতে হবে। বাংলাদেশকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, গবেষণা এবং নিরাপত্তাকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশে এখন একটি সর্বদলীয় সংলাপ খুব জরুরি, যেখানে রাজনীতিবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কূটনীতিক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং নাগরিক সমাজ একত্রে বসে দেশের নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা করবে। এ আলোচনার ভিত্তিতে একটি ‘জাতীয় নিরাপত্তা রূপরেখা’ তৈরি করবে, যেটা শুধু সরকারের নয়, বরং জাতির রূপরেখা হবে। এই রূপরেখার ভিত্তিতে আমরা সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে পারব, আমাদের আন্তর্জাতিক অবস্থান জোরদার করতে পারব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি নিরাপদ রাষ্ট্র উপহার দিতে পারব।
লেখক : এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ অ্যান্ড থটস (সিএএসটি)