হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

মাথা থেকে মাটিতে নামাতে জনগণের সময় লাগে না

মন্তব্য প্রতিবেদন

মাহমুদুর রহমান

মাহমুদুর রহমান

পুরোনো গল্প দিয়ে শুরু করি। ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ শাসনাধীনের সর্বশেষ নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে মুসলিম লীগ ১১৯টি আসনের মধ্যে ১১৩টিতে জয়লাভ করেছিল। সারা উপমহাদেশে মুসলিম লীগ পূর্ববঙ্গের মতো সফলতা আর কোনো প্রদেশেই পায়নি। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়।

উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসান নিয়ে দোমিনিক লাপিয়ের ও ল্যারি কলিন্স, ‘ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট’ নামে একটি বিখ্যাত বই লিখেছিলেন। তাদের বর্ণনা অনুযায়ী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান আন্দোলনের সাফল্যে সেদিন সবচেয়ে বেশি আনন্দ-উল্লাস নাকি পূর্ববঙ্গের মানুষ করেছিলেন। লাপিয়ের এবং কলিন্স লিখেছেন : ‘Strangely it was in East Bengal, in those areas soon to form East Pakistan - and one day, the battle fields of the Bangladesh war – that the mood was more festive.’ (Lapierre and Collins, 2009: 303) অর্থাৎ লেখকদ্বয় বলছেন, ‘আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, যে পূর্ববঙ্গে একদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ হবে, সেখানেই সেদিন সবচেয়ে আনন্দদায়ক পরিবেশ ছিল।’

পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে পাকিস্তান সৃষ্টির বাঁধভাঙা আনন্দ বিষাদে পরিণত হতে বলতে গেলে, কোনো সময়ই লাগেনি। আগস্ট মাসে স্বাধীনতা পাওয়ার ঠিক এক মাস অতিক্রান্ত হতেই ১৫ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিস রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে শিরোনাম দিয়েছিল ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা : বাংলা না উর্দু’। নবীন রাষ্ট্রে বিভাজনের বিপজ্জনক সুর নিয়ে শুরু হলো ভাষা আন্দোলন। তারপর ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন একসময় আসাম মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রতিষ্ঠা করলেন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী রাজনৈতিক দলÑপূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী

মুসলিম লীগ। দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ যে পরে পরিত্যক্ত হয়েছিল সেটা আরেক ইতিহাস।

বিরোধী দল প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পর ১৯৪৯ সালের প্রথম উপনির্বাচনে দক্ষিণ টাঙ্গাইল আসনে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী প্রার্থী জমিদার খুররম খান পন্নী নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের তরুণ সাধারণ সম্পাদক, প্রায় অপরিচিত শামসুল হকের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলেন। এই অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র তিন বছর আগের তুমুল জনপ্রিয় মুসলিম লীগের বিলীন হওয়ার পথে যাত্রা শুরু হয়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশ এবং কংগ্রেসের সঙ্গে লড়াই করে ভারতীয় মুসলমানদের স্বাধীনতা এনে দেওয়া মুসলিম লীগ পুরো পাকিস্তানেই আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। কালক্রমে দলটি যে কীভাবে এবং কতভাগে বিভক্ত হয়েছে, তার ইতিহাস পাঠককে জানাতে গেলে আমাকে কয়েক সপ্তাহ ধরে ওই একটি বিষয়েই মন্তব্য প্রতিবেদন লিখে যেতে হবে।

পাকিস্তান সৃষ্টির ২৪ বছর পর রক্তস্রোতে এলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকার তখনকার রেসকোর্স, আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রায় ১০ লাখ মানুষ তাদের তৎকালীন অবিসংবাদিত নায়কের পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফেরার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি এই দীর্ঘ জীবনে মাত্র দুটি রাজনৈতিক সভায় যোগ দিয়েছি। একটি, ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ বেগম খালেদা জিয়া ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে যে বিশাল জনসভাটি করেছিলেন এবং অপরটি, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। ‘The Political History of Muslim Bengal : An Unfinished Battle of Faith’ নামে ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত আমার লেখা বইয়ে ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবের বাংলাদেশে ফেরার দিনের ঐতিহাসিক জনসভার প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা রয়েছে। আমার বয়স তখন উনিশ চলছে। সেদিন আমার চেয়ে বছর দশেকের বড় চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে সম্ভবত আরো ১০ লাখ অশ্রুসজল চোখ নিয়ে অবিরত স্লোগানরত আনন্দে উন্মত্ত জনতার সঙ্গে ঘাসের মধ্যে বসে সকাল থেকে শেখ মুজিবের ফেরার অপেক্ষা করছিলাম। শেখ মুজিবের রেসকোর্সে পৌঁছানোর মুহূর্তের বর্ণনা ফ্যাসিবাদের জেলে বসে লেখা, ২০১৯ সালে প্রকাশিত আমার সেই বই থেকেই উদ্ধৃত করছি : ‘Suddenly everybody present at the ground on that momentous day leapt on their feet, simultaneously sobbing and cheering wildly like children. Sheikh Mujibur Rahman had just climbed to the podium surrounded by other jubilant Awami League leaders. I looked around with the curiosity of a youth and saw tears in the eyes everyone around me.’ অর্থাৎ, ‘হঠাৎ মাঠের বিশাল জনতা সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে শিশুদের মতো চিৎকার করে কাঁদতে আর উন্মাদের মতো ব্যবহার করতে লাগলেন। সামনে তখন শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাকে সঙ্গে নিয়ে মঞ্চে উঠেছেন। একজন সদ্য তরুণের উৎসাহ নিয়ে আমি চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম উপস্থিত সবার চোখে পানি।’

জনগণের অকল্পনীয় ভালোবাসায় ধন্য শেখ মুজিবুর রহমানের সেই জনপ্রিয়তায় মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ভাটার টান শুরু হয়ে গিয়েছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পর বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ সৃষ্টি হতে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল। কিন্তু মুজিবশাসিত বাংলাদেশে মাত্র নয় মাসের মাথায় ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জন্ম নিয়েছিল।

শেখ মুজিবের একদলীয় বাকশাল শাসনের পতন হয়েছিল তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সাড়ে তিন বছরের মধ্যে। একসময়ের ‘বাঙালি জাতির মেসিয়া’ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নিহত হলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাজধানীর সব মিষ্টির দোকান খালি হয়ে গিয়েছিল। রাস্তায় রাস্তায় আনন্দিত জনতা কোলাকুলি করেছিল, একে অপরকে মিষ্টি খাইয়েছিল। শেখ মুজিবকে মাথা থেকে পায়ে নামাতে কারো মধ্যে তেমন একটা অস্বস্তি দেখিনি। খেতাবপ্রাপ্ত প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা, সেক্টর কমান্ডার, জাসদ ও পঁচাত্তরের নভেম্বরের সিপাহি বিপ্লবের অন্যতম নেতা কর্নেল তাহের মুজিবের হত্যা প্রসঙ্গে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলেছিলেন, তার লাশ বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেওয়া উচিত ছিল। জাসদের একসময়ের প্রভাবশালী নেতা মহিউদ্দিন আহমেদ তার ‘জাসদের উত্থান পতন’ বইতে লিখেছেন : ‘দুই দিন পর সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নঈম জাহাঙ্গীর নারায়ণগঞ্জে তাহেরের বাসায় যান পরিস্থিতি সম্পর্কে আঁচ করতে। ১৯৭১ সালে নঈম ১১ নম্বর সেক্টরে তাহেরের সহযোদ্ধা ছিলেন এবং প্রায়ই তাঁর সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করতেন। তাহের আক্ষেপ করে নঈমকে বললেন, ওরা বড় রকমের একটা ভুল করেছে।

শেখ মুজিবকে কবর দিতে অ্যালাও করা ঠিক হয়নি। এখন তো সেখানে মাজার হবে। উচিত ছিল লাশটা বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেওয়া’ (প্রথমা প্রকাশন, ষষ্ঠ সংস্করণ, পৃষ্ঠা : ১৭৯)। শেখ মুজিবের বন্ধু, আন্তর্জাতিক সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার ‘লিগ্যাসি অব ব্লাড’-এ লিখেছেন : “Once the darling of the independence movement ‘in whose magic name all things are done’, Sheikh Mujib as Prime Minister and President became the most hated man in Bangladesh within three short years of its founding.” অর্থাৎ, “স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাণপ্রিয় নেতা শুধু যার নামেই সবকিছু ঘটে যেত, সেই শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতি হয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন বছরের মধ্যে দেশের সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তিতে পরিণত হন।” সচরাচর বড় তাড়াতাড়ি অতীত ভুলে যেতে বিশেষ পারঙ্গম বাঙালি মুসলমানের স্মৃতিতে খানিকটা শান দেওয়ার সম্ভবত ব্যর্থ প্রচেষ্টায় পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ উভয় আমলের প্রাসঙ্গিক কাহিনি বর্ণনা করলাম। আসলে সাধারণ জনগণের সঙ্গে নেতাদেরও ক্ষমতা হাতে পেলে ইতিহাস ভুলে যাওয়া তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিহাস চর্চার পর এবার সাম্প্রতিক সময়ের বাংলাদেশে ফেরা যাক।

২০২৪ সালের জুলাই-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান প্রফেসর ইউনূস কিছুদিনের জন্য দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। তার ক্ষমতাপ্রাপ্তির পর প্রথম রোজার ঈদের দিন জাতীয় ঈদগাহে নামাজ পড়তে আসা রাজধানীর বাসিন্দারা যেভাবে ড. ইউনূসের প্রতি তাদের ভালোবাসা প্রকাশ করছিলেন সেটা দেশের যেকোনো রাজনৈতিক নেতার জন্য ঈর্ষণীয় ছিল। বিপ্লবের পর অতি দ্রুত ক্ষমতাপ্রত্যাশীরা ইউনূসের জনপ্রিয়তায় রীতিমতো প্রমাদ গুনেছিলেন। জনগণ প্রফেসর ইউনূসকে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার জন্য সেদিন সমস্বরে আওয়াজ তুলেছিলেন। কিন্তু, বছর খানেক পর অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের সময় তার প্রতি জনগণের সমর্থন আগের অবস্থানে ছিল বলে আমার কাছে অন্তত মনে হয়নি। আর এখন তো মিডিয়ার এক অংশ প্রায় প্রতিদিন প্রফেসর ইউনূস এবং পূর্ববর্তী সরকারের অন্যান্য উপদেষ্টাকে দানব হাসিনার চেয়েও বড়মাপের খলনায়ক ও দুর্নীতিবাজ প্রমাণ করতে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

যেসব মিডিয়ায় প্রধানত এ-জাতীয় অন্তর্বর্তী সরকারবিরোধী উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার চলছে, সেগুলো আবার সব জুলাই বিপ্লবের পর রাতারাতি আওয়ামীপক্ষ ত্যাগ করে বিএনপিপন্থি বনে গেছে। আবার কোনো কারণে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে এদের পুনরায় ভোল পাল্টাতে সময় লাগবে না। এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকরা কি অতীত ইতিহাস থেকে আদৌ শিক্ষা নিচ্ছেন? জন-আকাঙ্ক্ষা কি তারা বুঝতে পারেন কিংবা বুঝলেও কি সেগুলোর কোনো মূল্য দিচ্ছেন? কেন বাংলাদেশে একমাত্র শহীদ জিয়া তার শাসনকালের পুরোটা সময় একই মাত্রায় জনসমর্থন ধরে রাখতে পেরেছিলেন, সে বিষয়ে কি সরকারের কিচেন কেবিনেটে কিংবা প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মহলে আদৌ কোনো আলোচনা হয়? এ প্রসঙ্গে বর্তমান সরকারের সাড়ে সাত মাসের কর্মকাণ্ডের অনেক বিষয় আজকের লেখায় আনা সম্ভব।

কিন্তু, লেখা বড় না করে আজ কেবল জ্বালানি তেলের প্রসঙ্গ আনছি। প্রারম্ভে জ্বালানি তেলের আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে সরকারের প্রভাবশালী নীতিনির্ধারকদের যুক্তিগুলোর খানিকটা পর্যালোচনা করা যাক। আমার ভুল হতে পারে, তবে মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও দলীয় নেতাদের এসব বক্তব্যে মনে হচ্ছে যেন নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের সাফল্যে জনগণকে ক্ষমতাবানরা বড় তাড়াতাড়ি নির্বোধ ভাবতে শুরু করেছেন।

জ্বালানিমন্ত্রী কিছুদিন ধরে পর্দার অন্তরালে রয়েছেন। শোনা যাচ্ছে তিনি অসুস্থ। অতএব, মিডিয়া সামলানোর দায়িত্ব পড়েছে প্রতিমন্ত্রীর কাঁধে। প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম মূল্যবৃদ্ধির তিনটি প্রধান যুক্তি হাজির করেছেন। প্রথমটি, ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে সরকার নাচার। এই যুক্তির প্রধান দুর্বলতা হলো, সরকার কিছুদিন আগেই যখন এক লাফে লিটারপ্রতি গড়ে প্রায় কুড়ি টাকা দাম বাড়িয়েছিল, তখন অপরিশোধিত তেলের দাম যা ছিল তার সঙ্গে বর্তমান দামের কোনো পার্থক্য নেই। বরং আগেরবারের মূল্যবৃদ্ধির পর গত এক মাসে তেলের দাম ব্যারেলে প্রায় ২০ ডলার হ্রাস পেয়েছিল। হরমুজ প্রণালি নিয়ে আমেরিকা এবং ইরানের সঙ্গে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হওয়ার পর সেই কমে যাওয়া ২০ ডলারটাই আবার বেড়েছে।

এখন আবার কমতে শুরু করে আমার লেখার সময় অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে অবস্থান করছে। অতএব, আন্তর্জাতিক বাজারের যুক্তি ধোপে টিকছে না। প্রতিমন্ত্রীর দ্বিতীয় যুক্তি, ভারতে বাংলাদেশের তুলনায় জ্বালানি তেলের দাম অনেক বেশি হওয়ায় আমাদের তেল নাকি ওপারে চোরাচালান হয়ে যাচ্ছিল। সেই চোরাচালান বন্ধ করার কৌশল হিসেবে দাম বাড়ানো হয়েছে। প্রতিমন্ত্রীকে তার আমলারা সম্ভবত ভুল তথ্য দিয়েছেন। দিল্লির দাম বলি। সেখানে ডিজেল এবং পেট্রোলের দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় যথাক্রমে ১২১ এবং ১৩১ টাকা। দিল্লিতে কেরোসিন বিক্রি নিষিদ্ধ। কলকাতায় অবশ্য কেরোসিন ব্যবহার হচ্ছে। আমাদের একেবারে পাশের কলকাতায় কেরোসিনের দাম ১২৮ টাকা। এবার আমাদের বাজারে কেরোসিন, ডিজেল এবং পেট্রোলের দামের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশের দাম মিলিয়ে নিন।

প্রতিমন্ত্রীর যুক্তি অনুযায়ী এখন তো ভারত থেকে বরং উল্টো বাংলাদেশে জ্বালানি তেল চোরাচালান হওয়া উচিত। অনিন্দ্য ইসলামের তিন নম্বর যুক্তি জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ালে নাকি সামাজিক নিরাপত্তার নামে নানারকম কার্ডের অর্থায়ন অব্যাহত রাখা সম্ভব ছিল না। প্রতিমন্ত্রীর যুক্তি থেকেই জনগণ এবার যৌক্তিকভাবেই প্রশ্ন করতে পারেন যে, নির্বাচনের প্রচারে বিএনপি যখন জনগণকে কার্ডের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তখন তাদের কাছে কি বাড়তি খরচের অর্থায়ন সংক্রান্ত কোনো ‘প্ল্যান’ ছিল না? এখন যদি তেলের দাম বৃদ্ধি করে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও অন্যান্য কার্ডের ব্যয় মেটাতে হয় তাহলে তো প্রকৃতপক্ষে সামাজিক নিরাপত্তার নামে জনগণের এক পকেটের টাকা অন্য পকেটে নেওয়া হচ্ছে। আমি অর্থনীতিবিদ না হলেও দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে এটুকু অন্তত বুঝি যে এ ধরনের ‘ইকোনমিক ইঞ্জিনিয়ারিং’ রাষ্ট্রের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয়ে সরকারের অনুদানের ওপর জনগণের নির্ভরশীলতা বাড়াবে। আমাদের মতো দরিদ্র দেশে এই নীতি টেকসই নয়। এসব ডেনমার্ক, সুইডেনের মতো কম জনসংখ্যার তথাকথিত ‘কল্যাণ রাষ্ট্রে’ হয়তো চলতে পারে। আমাদের ক্ষেত্রে মাসিক ভাতা প্রদান নয়, বরং কর্মসংস্থানের ‘প্ল্যান’ করতে হবে।

সরকারের একজন হুইপের মালিকানাধীন কালবেলা পত্রিকার শিরোনাম অনুযায়ী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘দেশে জ্বালানি তেলের দাম এখনো অনেক কম!’ আমি এখন ইস্তানবুলে আছি, তাই নিশ্চিত করে বলতে পারব না রিজভী ঠিক কী বলেছেন। যদি কালবেলার শিরোনাম সঠিক হয়ে থাকে তাহলে শুধু এটুকু বলব, সরকারকে রক্ষা করতে গিয়ে রিজভী সীমিত আয়ের জনগণের কষ্টকে রীতিমতো উপেক্ষা করেছেন। এটা তার কাছ থেকে আমি প্রত্যাশা করিনি। রিজভীর রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে এই বক্তব্য একেবারেই বেমানান। বর্তমান বিএনপির থিংকট্যাংকের অন্যতম সদস্য এবং প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত প্রভাবশালী ‘স্ট্র্যাটেজিক উপদেষ্টা’ ডাক্তার জাহেদ উর রহমান বেশ সততার সঙ্গে সরাসরি সুবিধাবাদী অবস্থান নিয়েছেন। যুগান্তর পত্রিকার খবর অনুযায়ী তিনি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘আমি যদি সরকারে না থেকে অ্যাক্টিভিস্ট হতাম, তাহলে এর প্রতিবাদ করতাম। হাসিনার সময় হলে শুধু প্রতিবাদ নয়, হাসিনার পদত্যাগ চাইতাম। এখন চাওয়া উচিত হবে না।’

ডাক্তার জাহেদ উর রহমানকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না বললেই চলে। কাজেই তার কথা নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। ভবিষ্যতে জনগণ ইউটিউব কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং অ্যাক্টিভিস্ট ডাক্তার জাহেদের সঙ্গে বিশিষ্ট উপদেষ্টা ডাক্তার জাহেদের বক্তব্য ও আচরণের পার্থক্যের বিচার করবেন। কিন্তু, অনিন্দ্য ইসলাম এবং রুহুল কবির রিজভীর কথা আলাদা। তাদের সাথে বিএনপির অনেক নেতার মতো অতীতে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। অনিন্দ্য ইসলামের বাবা আমাদের তরিকুল ভাই আমার সুহৃদ ছিলেন। এক-এগারো পরবর্তী সময়ে ঢাকা এবং যশোরে দেখা হলে আমরা অনেক বিষয় নিয়েই আলোচনা করতাম। আমি ২০১৮ সালে কুষ্টিয়ার আদালতে আওয়ামী গুন্ডাদের আক্রমণে গুরুতর আহত হলে অনিন্দ্য ইসলাম অর্থাৎ অমিত যশোর বিমানবন্দরে ডাক্তার পাঠিয়েছিলেন। রিজভীর সঙ্গে কাশিমপুর জেলে বন্দিজীবন কাটানো ছাড়াও তাকে এখনো অনেকটা ছোট ভাই তুল্যই মনে করি। নির্ভেজাল শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে দুজনার প্রতি অতীতের দিকে তাকানোর পরামর্শ থাকল। তাদের সামনে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন পড়ে আছে। অতএব, বুঝেসুঝে মন্তব্য করা ভালো।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ইতিহাস ভালো নয়। ১৯৭৩ সালের কারচুপির নির্বাচনে একচেটিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রাপ্তির জোরে শেখ মুজিব বাংলাদেশের প্রথম স্বৈরাচারে পরিণত হয়েছিলেন। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাকে ভয়াবহ পতন থেকে রক্ষা করতে পারেনি। ১৯৮২ সালে হাসিনার ভাই ও সখা জেনারেল এরশাদের প্রেসিডেন্ট সাত্তারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলের সময় সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। তাতে সেনা অভ্যুত্থান প্রতিহত করা যায়নি।

ইতিহাসের অমোঘ বিচারে ১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থানে একই জেনারেল সাহেবের পতনের সময় সংসদ তার প্রতিষ্ঠিত এবং বর্তমানে প্রায় কবরস্থ জাতীয় পার্টির একচ্ছত্র দখলে ছিল। ২০০৬ সালে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট পুরো মেয়াদ পার করলেও কয়েক মাসের মধ্যে মইন-মাসুদের এক-এগারো ঠেকানো যায়নি। ২০০৮ সালে ভারত, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং নির্বাচন কমিশনের সম্মিলিত উদ্যোগের সাজানো নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে দুই-তৃতীয়াংশ আসন বন্দোবস্ত করে দেওয়ার পরিণতিতে বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘ পনেরো বছর ফ্যাসিবাদের জোয়ালে নিষ্পেষিত হয়েছে। জুলাই বিপ্লবে জনগণ কেবল সেই দুই-তৃতীয়াংশের সরকারকে উৎখাতই করেনি, দানবীয় সরকারপ্রধানকে দিল্লিতে পালিয়ে প্রভুর কাছে আশ্রয় নিতে হয়েছে। ক্ষমতাবানরা কোনো সতর্কবার্তা পছন্দ করেন না জেনেও একটা শেষ কথা বলি। ক্ষমতা হাতে পেয়ে কদাপি জনগণকে বোকা ভাবার মতো বোকামি করবেন না।

ইসরাইল যেভাবে তুরস্ক ও হিজবুল্লাহকে কাছাকাছি আনছে

ভাইভা আর ভেরিফিকেশন ‘আমরা দেখব’

অস্ত্র আছে সৌদি আরবের, কৌশল কি আছে

সম্মানিত পদ থেকে অসম্মানিত অব্যাহতি

মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান জরুরি

তালা বদলায়, দরজা বদলায় না—আর কত!!

জলাতঙ্ক নীরব ঘাতক, কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য

মোবাইল ফোনের দাসত্ব নাকি উন্মুক্ত শৈশব

বিশ্বমঞ্চে তারেক রহমানের অভিষেক ও প্রত্যাশা

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আঞ্চলিক সমীকরণ