দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সীমান্তবর্তী সংযোগস্থলে অবস্থিত বঙ্গোপসাগর এরই মধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি কৌশলগত হাব হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বিশেষত বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বিভিন্ন দেশের কৌশলগত অবস্থানের পাশাপাশি নৌবাণিজ্য, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ দেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত করেছে। এই বাস্তবতায় বিশ্বরাজনীতিতে সম্ভাব্য আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের সুযোগ বেশ জোরেশোরেই হাতছানি দিচ্ছে।
বর্তমান বিশ্বরাজনীতির একটি বড় কাঠামো হলো ইন্দো-প্যাসিফিক (আইপিএস) ধারণা। যুক্তরাষ্ট্র তার ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্ডো-প্যাসিফিক (এফওআইপি)’ কৌশলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন (ইউএনসিএলওএস-১৯৮২) মেনেই এই অঞ্চলে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং সমুদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। তাদের মূল উদ্বেগের জায়গা হলো চীনের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক প্রভাব।
দক্ষিণ চীন সাগর দিয়ে বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ, অর্থাৎ আনুমানিক ৫ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য পরিবাহিত হয়। এই রুট মালাক্কা প্রণালি হয়ে ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করে এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ভান্ডারের সঙ্গে পূর্ব এশিয়ার শিল্পাঞ্চলের সংযোগ স্থাপন করে। চীনের প্রায় ৬০ শতাংশ তেল আমদানি পারস্য উপসাগর অঞ্চল থেকে আসে এবং এর প্রায় ৮০ শতাংশ মালাক্কা প্রণালি অতিক্রম করে, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণে ‘মালাক্কা ডিলেমা’ হিসেবে পরিচিত। এই কৌশলগত ঝুঁকি মোকাবিলায় চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) মেরিটাইম সিল্ক রোড অংশের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বন্দর ও অবকাঠামো বিনিয়োগ জোরদার করেছে। পাকিস্তানের গোয়াদর, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা ও মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ প্রকল্প তারই অংশ। বঙ্গোপসাগর এই সমগ্র করিডোরের কেন্দ্রীয় অবস্থানে থাকায় এর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ভারতও এ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে নেই। ‘নেবারহুড ফার্স্ট’ ও ‘অ্যাক্ট ইস্ট (পুবে তাকাও)’ নীতির মাধ্যমে ভারত বঙ্গোপসাগরকে তার প্রভাববলয়ের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। এই নীতির বাস্তবায়নে মিয়ানমার ভারতের জন্য একটি কৌশলগত সেতু, যার মাধ্যমে পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ জোরদার করা সম্ভব। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র চীনের প্রভাব মোকাবিলায় ভারতকে সমর্থন দিচ্ছে। বাংলাদেশের ট্রানজিট ব্যবহার করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্যের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগ স্থাপন এবং বঙ্গোপসাগর ঘিরে কৌশলগত উপস্থিতি বাড়ানো—এই দুই লক্ষ্যই ভারতের আঞ্চলিক নীতির কেন্দ্রবিন্দু, যার মাধ্যমে চীনের সামুদ্রিক সিল্ক রুটের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে ভারত।
ফলে বঙ্গোপসাগর এখন ত্রিমুখী শক্তির স্বার্থের সংযোগস্থল, আর বাংলাদেশ এই ত্রিভুজের মাঝখানে অবস্থান করছে। তাই আমাদের কৌশলগত ভুলের সুযোগ খুব সীমিত।
ব্লু ইকোনমি বা নীল অর্থনীতির ধারণা এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সামুদ্রিক মৎস্য, অফশোর গ্যাস-তেল, শিপিং, জাহাজ নির্মাণ, সামুদ্রিক পর্যটন ও নবায়নযোগ্য শক্তি মিলিয়ে এটি একটি সমন্বিত সামুদ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো। বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত ‘সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড’ বিশ্বের অন্যতম গভীর সামুদ্রিক খাদ, যা তিমি, ডলফিন ও কচ্ছপের প্রজননক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। এখান থেকে প্রতিবছর প্রায় ছয় লাখ টন সামুদ্রিক মাছ আহরণ করা হয়, যা দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ১৮ শতাংশ। একইসঙ্গে এখানে তেল-গ্যাস ও অন্তত ১৩ ধরনের খনিজ সম্পদের সম্ভাবনার কথা বলা হয়। এমনকি ৩০ থেকে ৮০ মিটার গভীরতায় সিমেন্টশিল্পে ব্যবহৃত বিশেষ ধরনের কাঁচামালেরও সন্ধান মিলেছে।
তথ্যমতে, বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা একই—প্রায় ৯ হাজার কোটি ডলারের আমদানি-রপ্তানি সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয় এবং বছরে সাড়ে চার হাজারের বেশি বিদেশি জাহাজ এই বাণিজ্যে অংশ নেয়। অর্থাৎ বঙ্গোপসাগর আমাদের অর্থনীতির প্রধান জীবনরেখা। এই বাস্তবতায় চট্টগ্রাম, পায়রা ও মাতারবাড়ী বন্দরের সম্প্রসারণ বেশ কৌশলগত গুরুত্বই বহন করে। চট্টগ্রামের দক্ষিণে মাতারবাড়ীতে জাপানের সহায়তায় দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণাধীন, যা জাপানের ‘বে অব বেঙ্গল শিল্প উন্নয়ন বলয়’-এর অংশ। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি এটি আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলার সঙ্গে বাংলাদেশের সংযুক্তির একটি কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে বড় শক্তিগুলো সাধারণ অর্থনৈতিক সহায়তার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে। সেক্ষেত্রে চীন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চীনের ঋণকেন্দ্রিক কূটনীতির অভিজ্ঞতা অনেক দেশকে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ হারাতে বাধ্য করেছে। তাই বাংলাদেশের জন্য উন্নয়ন ও নির্ভরতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অপরিহার্য।
বিশ্ব রাজনীতিতে দুটি কৌশল গুরুত্বপূর্ণ—১. ব্যান্ডওয়াগনিং অর্থাৎ এমন এক কৌশল, যেখানে একটি দুর্বল রাষ্ট্র শক্তিশালী কোনো শক্তির বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে বরং তার সঙ্গেই হাত মেলায়। সহজ ভাষায়, যেদিকে পাল্লা ভারী, সেদিকেই পাড়ি। ২. ব্যালেন্সিং অর্থাৎ শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল কিংবা অনুন্নত দেশগুলোর জন্য ব্যালেন্সিং কিংবা পাইলট ফিস বিহেভিয়র নীতিতে চলা বাঞ্ছনীয়, যেখানে সতর্কতা ও কৌশলগত বিচক্ষণতা দুই-ই বজায় থাকে। চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগ যেমন আমাদের গ্রহণ করা যেতে পারে, তেমনি নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাটাও জরুরি। এটি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার সবচেয়ে কার্যকর পথ। যেমনটা ভারত পশ্চিমের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রেখে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক অটুট রেখেছে। যদিও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিমসটেক বঙ্গোপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আসিয়ানভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সংযোগ বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। সক্রিয় সামুদ্রিক কূটনীতি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মার্কিন নৌ-কৌশলবিদ আলফ্রেড থায়ার মাহান বলেছিলেন, সমুদ্রবাণিজ্য বা নৌশক্তি যেভাবেই হোক—সমুদ্র যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে তার পক্ষে পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বাস্তবতাও দেখিয়েছে, সামুদ্রিক দূরদর্শী নীতি ও দক্ষ বন্দর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হয়েও হংকং কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো দেশ কীভাবে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার করতে পারে। বঙ্গোপসাগরও বাংলাদেশের জন্য সেই সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে আমরা সেই সুযোগ কতটা লুফে নিতে পারব, তা সময়ই বলে দেবে।
লেখক : সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়