হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

হামাস কি বিলুপ্তির পথে

তামের আজরামি

ছবি: সংগৃহীত

২০০৭ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় সরকার গঠন করেছিল হামাস। এরপর দুই দশক ধরে ছোট এই ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ করায়ত্তে রেখেছিল তারা। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নজিরবিহীন হামলার পর ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসন ও গণহত্যার কারণে হামাসের সেই নিয়ন্ত্রণ এখন আর নেই। গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে; সংগঠনটির অনেক সিনিয়র নেতা, সামরিক কমান্ডার, শত শত যোদ্ধা নিহত হওয়ায় এর সামরিক কাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শাসনকাজ পরিচালনার সক্ষমতাও হ্রাস পেয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইসরাইলের সঙ্গে অস্ত্রবিরতি চুক্তির পর হামাস গাজার প্রকাশ্য প্রশাসনিক শাসনভার হস্তান্তর ও সরকারি কমিটিগুলো বিলুপ্ত করেছে। এখন হামাসের অস্ত্র সমর্পণ করা নিয়ে আলোচনা চলছে। বর্তমানে সামরিকভাবে হামাস দুর্বল এবং শাসনক্ষমতা পরিচালনার চেয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। সামগ্রিক এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে যে, হামাসের বিলুপ্তি কি নিশ্চিত হয়ে গেল?

কিন্তু ওপরের এই তথ্যগুলোর ওপর ভিত্তি করে হামাসের বিলুপ্তি ঘটেছে—এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সঠিক কোনো বিশ্লেষণ হবে না বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, আংশিক সামরিক পরাজয়ের অর্থ কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের সমাপ্তি নয়। শাসনক্ষমতা কমে যাওয়ার অর্থ প্রভাবের বিলুপ্তি নয়। আর জনসমর্থনের একাংশ হারানোর অর্থ এই নয় যে, হামাস ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে বিদায় নিয়েছে।

কাজেই হামাসের বিলুপ্তি ঘটেছে—এমন মতামতের সঙ্গে একমত হওয়ার চেয়ে বরং এ কথা বলাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত যে, গাজা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে হামাস একটি ভিন্ন ধরনের সংগঠন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু এ কথা বলা যাবে না, হামাস বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কেননা গাজায় হামাসের কোনো বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি এবং এমন কোনো ফিলিস্তিনি শক্তি সামনে আসেনি, যারা হামাসের শূন্যস্থান পূরণ করতে সক্ষম।

এখন প্রশ্ন হলো—গাজা ও ফিলিস্তিনি আন্দোলনের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা কি হামাসের এখনো আছে, নাকি সংগঠনটি তা হারিয়েছে? এক্ষেত্রে উত্তরটি হচ্ছে—বন্দিবিনিময়, যুদ্ধবিরতির আলোচনা, গাজার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং যুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে যেকোনো আলোচনায় হামাস এখনো প্রাসঙ্গিক। এমনকি যারা হামাসকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চায়, তারাও সংগঠনটির ভূমিকা, অস্ত্র বা প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে এদের সঙ্গে আলোচনা করতে বাধ্য হচ্ছে। কেবল এটুকু থেকেই বোঝা যায়, হামাসের বিলুপ্তি ঘটেনি এবং তা সম্ভবও নয়।

দৈনন্দিন প্রশাসনিক ক্ষমতা হারানো এবং একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের সমাপ্তির মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য আছে। হামাস হয়তো আর আগের মতো গাজা শাসন করতে পারবে না। কিন্তু সংঘাতের সমীকরণে হামাসের হাতে এখনো গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি আছে তা হলো—তাদের ছাড়া অন্য কারো পক্ষে সহজে গাজা শাসন করা কখনোই সম্ভব হবে না। এটি হামাসের সামান্য কোনো ক্ষমতা নয়।

এমনকি ইসরাইলও পারবে না। বরং নিরস্ত্রীকরণ, হামাসের প্রত্যাবর্তন ঠেকানো, নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতির বিষয়ে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে এখনো কথা বলছে ইসরাইল। এর অর্থ হলো—ইসরাইলের নানা বাগাড়ম্বর সত্ত্বেও দেশটি জানে, হামাস এখনো গাজার সামগ্রিক সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের বাদ দিয়ে কিছু করা যাবে না।

তবে এ কথাও ঠিক, গাজার ভেতরের পরিস্থিতি অনেকটাই জটিল। সেখানে ব্যাপক জনরোষ রয়েছে। কেউ কেউ বর্তমান বিপর্যয়ের জন্য হামাসকে আংশিকভাবে দায়ী করেন। কিন্তু এই ক্ষোভের অর্থ এটা নয় যে, ফিলিস্তিনিরা প্রতিরোধ বা স্বাধীনতার অধিকার ত্যাগ করেছে। গাজার কোনো বাসিন্দা যুদ্ধকে প্রত্যাখ্যান করলেই তিনি যে আত্মসমর্পণকে সমর্থন করছেন বা কোনো ফিলিস্তিনি হামাসের সমালোচনা করলেই তিনি যে ইসরাইলের সমর্থক, তা মনে করা হবে বড় ভুল। হামাস তার জনসমর্থন হারিয়েছে—এমন দাবির ক্ষেত্রেও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। গণহত্যামূলক যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসা সমাজে সহজে কোনো স্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি হয় না। মানুষ কথা বলে তাবুর ভেতর থেকে, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এবং গভীর শোক ও স্বজন হারানোর বেদনা থেকে। ফলে তাদের ক্ষোভ যৌক্তিক। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, তারা প্রতিরোধ আন্দোলন সমর্থন করে না।

এর কারণ, হামাস গাজায় কেবল একটি সরকার নয়, এটি একটি সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা-বিষয়ক নেটওয়ার্ক। এটি ফিলিস্তিনি স্মৃতির এমন একটি অংশ, যা হামাসের অস্তিত্বের আগেই শুরু হয়েছিল। কাজেই নির্বিচার হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ এবং গণহত্যার মাধ্যমে হামাসের বিলুপ্তি ঘটানো সম্ভব নয়। দখলদারিত্বের মধ্যে গড়ে ওঠা সংগঠনগুলো কেবল নেতাদের হত্যা বা কাঠামোগত আঘাতের কারণে বিলুপ্ত হয়ে যায় না। তারা সংকুচিত, পরিবর্তিত এবং পুনর্গঠিত হতে পারে। তারা নতুন নাম ও নতুন কৌশল নিয়ে ফিরে আসতে পারে। হামাসও বর্তমানে সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলছে।

বিলুপ্তি মানে ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যাওয়া। আর রূপান্তর মানে পরাজয়, ক্ষয়ক্ষতি ও নতুন বাস্তবতার চাপে সংগঠনটির নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলা। হামাস এখন সেই স্তরে আছে। যেসব কারণে হামাসের উদ্ভব হয়েছিল, সেই কারণগুলোর কোনোটিই শেষ হয়ে যায়নি, এখনো আগের মতোই আছে। দখলদারিত্বের অবসান ঘটেনি, অবরোধ ওঠেনি, থামেনি বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি, শরণার্থীরা ফিরে আসেনি, আর গাজা মুক্ত ও নিরাপদ স্থানেও পরিণত হয়নি। যতদিন এই কারণগুলো বিদ্যমান থাকবে, ততদিন হামাস বা এর নতুন সংস্করণ কিংবা প্রতিরোধের অন্য কোনো রূপ টিকে থাকবে।

এ কারণেই হামাসের বিলুপ্তির প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। বরং সঠিক প্রশ্নটি হলো—এই যুদ্ধের পর হামাস কোন রূপ ধারণ করবে? তারা কি শাসন পরিচালনাকারী সংগঠন হিসেবেই টিকে থাকবে, নাকি কেবল একটি রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে? তারা কি তাদের সামরিক শাখা পুনর্গঠন করবে, নাকি বৃহত্তর কোনো জাতীয় কাঠামোর স্বার্থে নিজেদের ভূমিকা সংকুচিত করবে? অন্যদিকে ইসরাইল যখন হামাসের বিরুদ্ধে তার বিজয়ের কথা বলতে চায়, তখন তারা দাবি করে, হামাসের বিলুপ্তি ঘটেছে। আবার যখন গাজায় হামলার যৌক্তিকতা প্রমাণের প্রয়োজন হয়, তখন ইসরাইল বলে, হামাস এখনো শক্তিশালী।

হামাসের কোনো কোনো প্রতিপক্ষ সংগঠনটির বিলুপ্তি ঘোষণা করতে চায়, কারণ তারা একে একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে দেখে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—হামাসের বিলুপ্তি ঘটেনি; তবে সংগঠনটি আর আগের মতো সামরিক ও সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে নেই। এখন তারা ফিলিস্তিনি রাজনীতি ও আঞ্চলিক সমীকরণের একটি পক্ষ হিসেবে নিজেদের অবস্থান ও প্রভাব বজায় রাখতে চাইছে। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত না হওয়া পর্যন্ত হামাস অস্ত্র সমর্পণ করা বা সংগঠন বিলুপ্ত করবে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, হামাসের সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক কমিটি বিলুপ্ত করা বা বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্ব গাজা উপত্যকার প্রশাসনের জাতীয় কমিটির হাতে তুলে দেওয়া কেবলই কোনো প্রশাসনিক রদবদল নয়, বরং এসবের ভেতরে লুকিয়ে আছে হামাসের নতুন কোনো কৌশল। প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তরকে হামাসের পিছু হটা বা পরাজয় হিসেবে বিবেচনা করলে তা কোনোভাবেই ফিলিস্তিনের দীর্ঘদিনের লড়াই-সংগ্রামের কৌশলের সঙ্গে মেলানো যাবে না। বরং এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে হামাস এটাই স্পষ্ট করে দিতে চায়, তারা ইসরাইলের সঙ্গে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি পরিপূর্ণভাবে মেনে চলতে চায়। আবার একইসঙ্গে সংগঠনটি এ কথাও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, গাজা উপত্যকায় একজন ইসরাইলি সেনা থাকা পর্যন্ত তারা অস্ত্র সমর্পণ করবে না।

কাজেই অস্ত্রবিরতি চুক্তি মেনে চলার অর্থ এটা নয় যে, হামাসের বিলুপ্তি ঘটছে। ইসরাইলের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাসে গাজায় এবারের মতো এত ভয়াবহ হামলা, ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যার ঘটনা আগে ঘটেনি। কিন্তু তারপরও ইসরাইল তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। হামাসের ব্যাপক ক্ষতি করলেও সংগঠনটিকে পুরোপুরি নির্মূল করা ইসরাইলের পক্ষে সম্ভব হয়নি। আগামীতেও দেশটি তা পারবে বলে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। কেননা হামাস তার নিজস্ব শক্তিতেই টিকে আছে এবং আগামীতেও ইসরাইলের বিরুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে টিকে থাকবে।

মিডল ইস্ট মনিটর অবলম্বনে মোতালেব জামালী

সুখী দেশের তালিকায় কেন পিছিয়ে মুসলিমরা

চিকেনস নেকে ভারতের ত্রিকোণীয় নিরাপত্তা গ্রিড

আগেভাগেই পাট কাটতে বাধ্য হলেন যশোরের চাষিরা

ঠাকুরগাঁওয়ে হত্যা মামলার আসামি দুই আ.লীগ নেতাকে জামিন

স্বর্ণের দামে বড় লাফ, ভরিতে বাড়ল ৫৪৮২ টাকা

ক্ষেতলালে গভীর নলকূপের মালিকানা দ্বন্দ্বে সেচ বন্ধ, বিপাকে কৃষক

হরমুজে জাহাজ চলাচল কমেছে ৮০ শতাংশ

জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রপতির শ্রদ্ধা

ট্রাম্পের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করল কানাডা

শিপইয়ার্ড দুর্ঘটনার পর প্রশ্নের মুখে মালিকদের সংগঠন