হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

মার্কিন বাহিনীতে ভর্তির বয়স কেন ৪২ করা হচ্ছে

ব্রায়ান অসগুড

মার্কিন সেনাবাহিনী সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তাদের লোকবল নিয়োগ করার ক্ষেত্রে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। বিশেষ করে ১৯৭৩ সালের পর থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ লোকবল বা নিয়োগ সংকটে ভুগছে। কোভিড-১৯ মহামারিতে এই সংকট আরো তীব্র হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় দেশটির তরুণ প্রজন্ম এর বিরোধিতা করার পাশাপাশি তারা সেনাবাহিনীতে যোগদানেও অনীহা প্রকাশ করছে। এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীতে যোগ্য প্রার্থীদের সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যে গত মাসে সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, সামরিক বাহিনীতে আমেরিকানদের যোগদান বা নাম তালিকাভুক্তির সর্বোচ্চ বয়স ৩৫ থেকে বাড়িয়ে ৪২ বছর করা হবে। গত ২০ মার্চ ইউএস আর্মি রেগুলেশন ৬০১-২১০-এর একটি সংশোধিত সংস্করণে এই পরিবর্তনের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গাঁজা বা মাদকদ্রব্য রাখার দায়ে একবার দোষী সাব্যস্ত হওয়া ব্যক্তিদের সশস্ত্র বাহিনীতে তালিকাভুক্তির জন্য ছাড়পত্র নেওয়ার নিয়মটিও বাতিল করার কথা বলা হয়েছে নতুন এই নির্দেশনায়।

দেশটির সরকারি তথ্য থেকে দেখা যায়, মার্কিন সেনাবাহিনী গত দুই বছরে তাদের নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করলেও ২০২২ ও ২০২৩ সালে তা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং আর্মি রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্লেষকরা এই ঘাটতির জন্য বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য কারণকে দায়ী করেছেন। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইল যুদ্ধের বিরুদ্ধে মার্কিন তরুণরা ব্যাপক বিরোধিতা করার প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীতে নতুন লোক ভর্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা বাড়িয়ে নতুন নীতিমালা প্রকাশ করা হয়।

নতুন আইন কখন কার্যকর হবে?

আর্মি রেগুলেশন ৬০১-২১০-এর মার্চ মাসে ঘোষিত এই পরিবর্তনগুলোর সংশোধিত সংস্করণটি আনুষ্ঠানিকভাবে ২০ এপ্রিল সোমবার থেকেই কার্যকর হবে। এই পরিবর্তন শুধু মার্কিন সেনাবাহিনীর জন্য প্রযোজ্য। এর আওতায় রয়েছে রেগুলার আর্মি, আর্মি রিজার্ভ এবং আর্মি ন্যাশনাল গার্ড।

সামরিক সংবাদ সংস্থা ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’ জানিয়েছে, এই পরিবর্তনগুলো সেনাবাহিনীকে সামরিক বাহিনীর অন্যান্য শাখা, যেমন এয়ার ফোর্স, নেভি, কোস্ট গার্ড এবং স্পেস ফোর্সেও সর্বোচ্চ তালিকাভুক্তির বয়সের সঙ্গে আরো বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলবে। বর্তমানে মার্কিন মেরিন বাহিনীতে যোগদানের সর্বোচ্চ বয়স ২৮ বছর।

কোন কারণগুলো এই পরিবর্তন?

যদিও মার্কিন সেনাবাহিনী বয়স বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেনি, তবে ইউএস আর্মি রিক্রুটিং কমান্ডের তথ্য থেকে দেখা যায়, সেনাবাহিনী নিয়োগ-সংক্রান্ত বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। সেনাবাহিনী ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তাদের নিয়োগ লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ পূরণ করেছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে প্রায় ২৩ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ২৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়। ওই তথ্য থেকে আরো দেখা যায়, সেনাবাহিনী টানা ছয় বছর ধরে আর্মি রিজার্ভের জন্য তাদের নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি।

মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্রের দেওয়া তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে সামরিক সংবাদ সংস্থা আর্মি টাইমস জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সেনাবাহিনীতে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের গড় বয়স বেড়ে ২২ দশমিক ৭ হয়েছে, যা ২০০০-এর দশকে ছিল ২১ দশমিক ৭ এবং ২০১০-এর দশকে ছিল ২১ দশমিক ১। কিন্তু এখন তা অনেকটাই বেড়ে যাবে। ইউএস আর্মি রিক্রুটিং কমান্ড সেনাবাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়স ক্রমান্বয়ে বাড়ানোর কারণ হিসেবে শ্রমবাজারের পরিবর্তন, সামরিক পরিষেবা সম্পর্কে সীমিত সচেতনতা ও স্থূলতা এবং মাদক ব্যবহার ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মতো কারণে যোগ্য তরুণদের অভাবের মতো বিষয়গুলোকে দায়ী করেছে।

২০১৮ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, তরুণ-তরুণীরা সেনাবাহিনীতে যোগ না দেওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে সম্ভাব্য যুদ্ধে আঘাত ও মৃত্যুর উদ্বেগ, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি), পরিবার ও বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং অন্যান্য পেশার প্রতি আগ্রহের কথা উল্লেখ করেছে।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে ইরান যুদ্ধের সম্পর্ক আছে?

বিশ্লেষকরা বছরের পর বছর ধরে সেনাবাহিনীতে নিয়োগের বয়স বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছেন, যা নিয়োগের প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলার একটি উপায়। মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক র‍্যান্ড করপোরেশনের ২০২৩ সালের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে ‘বয়স্ক তরুণদের’ ‘গুরুত্বপূর্ণ, বহুলাংশে অনাবিষ্কৃত কিন্তু উচ্চমানের সম্ভাব্য নিয়োগপ্রার্থীর উৎস’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগে বলেছিলেন, তিনি ইরানে স্থলবাহিনী মোতায়েন করতে পারেন। কিন্তু সামরিক বাহিনী তাদের নতুন নিয়োগে বয়স বৃদ্ধির এই পরিবর্তনের সঙ্গে ইরানে মার্কিন-ইসরাইল হামলার কোনো যোগসূত্র থাকার ইঙ্গিত দেয়নি। অবশ্য কিছু সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী বয়স বৃদ্ধির এই ঘোষণার সময় নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য করেছেন। অনলাইন কমিউনিটির কেউ কেউ মজা করে বলেছেন, ইরান যুদ্ধের সমর্থক বয়স্ক আমেরিকানরা এখন সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য প্রলুব্ধ হবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল ভাষ্যকার বেন শ্যাপিরোর একটি ভিডিওর জবাবে একজন এক্স ব্যবহারকারী বলেছেন, ‘তারা সেনাবাহিনীতে যোগদানের বয়স ৪২ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। আপনি এখনো এখানে কেন?’ শ্যাপিরো ইরানে হামলা চালানোর ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করছিলেন। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সিদের তুলনায় তরুণরা ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধের অনেক বেশি বিরোধিতা করে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর জনমত জরিপে দেখা গেছে, বয়স্ক প্রজন্মের তুলনায় তরুণরা বিদেশে মার্কিন হস্তক্ষেপের যৌক্তিকতা নিয়ে অনেক বেশি সন্দিহান।

২০২৪ সালে পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সি মানুষেরাই একমাত্র গোষ্ঠী যারা সামরিক বাহিনীকে ইতিবাচকভাবে দেখার চেয়ে বেশি নেতিবাচকভাবে দেখে। তাদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ বলেছেন, সামরিক বাহিনীর একটি নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে, অন্যদিকে ৪৩ শতাংশ বলেছেন, এর একটি ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর বর্তমান সদস্য কত?

পিউ রিসার্চ সেন্টারের মতে, মার্কিন সামরিক বাহিনীতে বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখ ২০ হাজার সক্রিয় সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীতে সদস্যসংখ্যা সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার। দ্বিতীয় স্থানে আছে নৌবাহিনী, যাদের সদস্যসংখ্যা ৩ লাখ ৩৪ হাজারের বেশি। বিমান বাহিনীতে আছে ৩ লাখ ১৭ হাজারের বেশি। মেরিন কোরের সদস্যসংখ্যা ১ লাখ ৬৮ হাজারের বেশি, কোস্ট গার্ডে প্রায় ৪২ হাজার এবং স্পেস ফোর্সে প্রায় ৯ হাজার ৭০০ জন সদস্য রয়েছেন।

মার্কিন সেনা নিয়োগ কমান্ডের তথ্য থেকে দেখা যায়, ২০২৫ সালে নিয়মিত সেনাবাহিনীতে নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই পুরুষ। ২০২৪ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৭ শতাংশ শ্বেতাঙ্গ। কিন্তু মার্কিন সেনাবাহিনীতে শ্বেতাঙ্গদের সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ, যা তাদের মোট জনগোষ্ঠীর অনুপাতে অনেক কম। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ এবং লাতিন আমেরিকার বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠী ২০ শতাংশ। কিন্তু সেনাবাহিনীতে এই দুই জনগোষ্ঠীর প্রত্যেকটি থেকে নিয়োগপ্রাপ্তদের সংখ্যা প্রায় ২৭ শতাংশ, যা তাদের মোট জনগোষ্ঠীর অনুপাতে অনেক বেশি।

মার্কিন সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ স্থূলতা, মাদক গ্রহণ এবং মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার কারণে সামরিক বাহিনীতে যোগদানের জন্য অযোগ্য বিবেচিত হয়ে থাকে। অন্যদিকে পিউ রিসার্চ সেন্টারের সমীক্ষা অনুযায়ী ১৮-২৯ বছর বয়সি আমেরিকানদের একটি বড় অংশই সামরিক বাহিনীতে যোগদানকে ইতিবাচকভাবে দেখে না। এর বড় একটি কারণ হচ্ছে, যুদ্ধক্ষেত্রে আঘাত, মৃত্যু এবং যুদ্ধ-পরবর্তী মানসিক চাপজনিত ব্যাধি নিয়ে তরুণদের মধ্যে বড় ধরনের উদ্বেগ কাজ করে। এছাড়া আগের তুলনায় বর্তমানের তরুণদের পরিবারে সামরিক বাহিনীর সদস্য থাকার সংখ্যা কম। এছাড়া অবসরপ্রাপ্ত অনেক সেনাসদস্যও তাদের সন্তানদের সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে নিরুৎসাহিত করছেন।

এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংঘাত বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর সম্পৃক্ততা তরুণদের সেনাবাহিনীতে যোগদানে নিরুৎসাহিত করছে। মূলত এসব কারণেই মার্কিন সামরিক বাহিনীতে তরুণদের অংশগ্রহণ কমে যাচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দিয়েও তরুণদের সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে আগ্রহী করে তুলতে পারছেন না সামরিক বাহিনীর নীতিনির্ধারকরা। এতে সামরিক বাহিনীর সদস্যসংখ্যা দিন দিন কমছে, যা আমেরিকান সামরিক বাহিনীর জন্য গুরুতর একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই ঘাটতি পূরণ করার জন্যই সামরিক বাহিনীতে ভর্তির সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ থেকে বাড়িয়ে ৪২ বছর করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

আল জাজিরা অবলম্বনে মোতালেব জামালী

সফল নেতৃত্বের যোগ্যতা ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

ওয়াজেদ আলী খান পন্নী : জাতীয় মুক্তির সিপাহসালার

লুটপাটের মেগা প্রকল্প যখন জনগণের গলার কাঁটা

চিত্তরঞ্জন সুতারের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে শিক্ষা

ন্যায়ের শাসন না ‘মগের মুল্লুক’

নেতানিয়াহু কোত্থেকে পেলেন গণহত্যার লাইসেন্স

তেলের সংকট থেকে আস্থার সংকট বেশি

জ্বালানি কূটনীতির রোডম্যাপ

উচ্চশিক্ষায় সংস্কার ও শিক্ষক নিয়োগের রাজনীতি

বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি ও বেকারত্ব