ওলবাকিয়া (Wolbachia) ব্যাকটেরিয়াবাহী মশা ব্যবহার করে ডেঙ্গু জ্বর নিয়ন্ত্রণে এক যুগান্তকারী ও সফল গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার জনস্বাস্থ্য গবেষক অধ্যাপক ডা. আদি উতারিনি। এ গবেষণায় সাফল্যের কারণে ২০২০ সালে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’ বিজ্ঞানী আদি উতারিনিকে বছরের সেরা ১০ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান দেয়। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘টাইম’ ম্যাগাজিন বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি দেয় তাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ওলবাকিয়া প্রযুক্তির পাবলিক হেলথ ভ্যালুকে স্বীকৃতি দিয়েছে। বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার বড় বড় শহরে ওলবাকিয়া প্রযুক্তি প্রয়োগ করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে।
ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়ানোর প্রধান বাহক হলো এডিস এজিপ্টি (Aedes Aegypti) মশা। ডা. আদি উতারিনি ও তার দল ল্যাবরেটরিতে এডিস মশার শরীরে ‘ওলবাকিয়া’ নামক একটি প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করান। এই ব্যাকটেরিয়ার বিশেষত্ব হলো, এটি মশার শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি সম্পূর্ণভাবে থামিয়ে বা স্তিমিত করে দেয়। ফলে ওলবাকিয়াযুক্ত মশা মানুষকে কামড়ালেও তার ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। এভাবে ওলবাকিয়া প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, অস্ট্রেলিয়া, চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ অন্তত ১৫টি দেশে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা আইসিডিডিআরবিও ওলবাকিয়া প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করছে। পাশাপাশি সংস্থাটি ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন নিয়েও কাজ করছে। এই গবেষণার সঙ্গে রয়েছেন আইসিডিডিআরবির সিনিয়র বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ শফিউল আলমের নেতৃত্বে একটি বিজ্ঞানী দল।
ইন্দোনেশিয়ায় ডেঙ্গু দমনে ডা. উতারিনির গবেষণার ফলাফল
ডা. আদি উতারিনি (Adi Utarini) ইন্দোনেশিয়ার যোগকার্তার বিখ্যাত গাদজাহ মাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউজিএম) জনস্বাস্থ্য ও নীতি ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক। তিনি তার নিজের জীবনে দুবার মারাত্মক ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বেঁচে ফিরেছেন, যা তাকে এই রোগ নির্মূলে কাজ করতে উৎসাহিত করেছে। তিনি অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটির ওয়ার্ল্ড মস্কিটো প্রোগ্রামের উদ্ভাবিত প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে ইন্দোনেশিয়ায় প্রথম বড় আকারের সফল ট্রায়াল পরিচালনা করেন। তার কাজের মূল বিষয় ছিল ‘ওলবাকিয়া’ নামের প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়ার ব্যবহার। এই ব্যাকটেরিয়া মানুষের জন্য সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিকারক নয়; তবে এটি যখন ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক ‘এডিস এজিপ্টি’ মশার শরীরে প্রবেশ করানো হয়, তখন মশার শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস আর বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। ফলে মশাটি কামড়ালেও মানুষের শরীরে ডেঙ্গু ছড়ায় না।
ডা. উতারিনি ও তার দল ল্যাবরেটরিতে ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়াযুক্ত মশা সৃষ্টি করেন এবং তা ইন্দোনেশিয়ার যোগকার্তা শহরের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় ছড়িয়ে দেন। এই ওলবাকিয়াযুক্ত মশাগুলো সাধারণ বুনো মশার সঙ্গে প্রজনন করে নতুন প্রজন্মের মশার জন্ম দেয়, যা ওলবাকিয়াযুক্ত মশা হিসেবে ছড়ানো হয়। এই গবেষণা ছিল একটি র্যান্ডমাইজড কন্ট্রোলড ট্রায়াল (আরসিটি)। এর ফলাফল ছিল চমকপ্রদ। যেসব এলাকায় ওলবাকিয়াযুক্ত মশা ছাড়া হয়েছিল, সেখানে ডেঙ্গু সংক্রমণের হার প্রায় ৭৭ শতাংশ কমে যায় এবং ডেঙ্গুর কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার হার ৮৬ শতাংশ হ্রাস পায়।
গবেষণার শুরুতে ডা. উতারিনি বাধার সম্মুখীন হন। বসতিপূর্ণ এলাকায় ইচ্ছাকৃতভাবে লাখ লাখ মশা ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি সাধারণ মানুষ সহজে মেনে নেয়নি এবং এটি নিয়ে নানা গুজব ছড়ায়। কিন্তু ডা. উতারিনি নিজে মানুষের ঘরের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে সাধারণ মানুষ, স্থানীয় নেতা এবং জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি প্রাচীরচিত্র, ভিডিও ক্লিপ, ফেসবুক ভিডিও এবং সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে গবেষণার গুরুত্ব বোঝাতে সক্ষম হন এবং তাদের সম্মতি আদায় করেন।
ডা. উতারিনি ল্যাবে তৈরি ওলবাকিয়াবাহী মশার ডিম ও পানিভর্তি ছোট ছোট পাত্র যোগকার্তা শহরের নির্দিষ্ট এলাকাগুলোতে ঘরবাড়ির আশেপাশে রেখে দেন। ল্যাবের ওলবাকিয়াযুক্ত মশাগুলো যখন প্রাকৃতিক সাধারণ বন্য এডিস মশার সঙ্গে মেলামেশা ও বংশবৃদ্ধি করে, তখন তাদের পরবর্তী প্রজন্মের মশার শরীরেও এই ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে এই এলাকায় সিংহভাগ মশা ওলবাকিয়াবাহী হয়ে ওঠে। ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এই ট্রায়াল চলে। ফলে ওই শহরে দেখা যায় ডেঙ্গু-আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৭৭ শতাংশ কমে যায়।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু সংক্রমণ পরিস্থিতি
বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখন দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং বর্তমানে এ নিয়ে মানুষ উদ্বিগ্ন। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ১৬ দিনেই ৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা আগস্ট মাসের পুরো সময়ের মৃত্যুর রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। প্রায় প্রতিদিনই গড়ে এক হাজারের বেশি নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। চলতি ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৫৮ হাজার ৪০০ এবং মারা গেছেন ১৭৬ জন। ডেঙ্গু এখন আর শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নয়, দেশের ৬৪ জেলাতেই ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে পিরোজপুর, খুলনা, পটুয়াখালী, বাগেরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বান্দরবান, চট্টগ্রাম, মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
গবেষণা সংস্থা আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার ডেঙ্গুর ধরনে পরিবর্তন এসেছে। বিগত বছরগুলোতে DENV-2-এর প্রকোপ বেশি ছিল। তবে এ বছর নমুনা পরীক্ষায় ৯১ দশমিক ৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই ডেঙ্গু-৩ (DENV-3) সেরোটাইপ পাওয়া গেছে, যা গুরুতর সংক্রমণের কারণ হতে পারে। কীটতত্ত্ববিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, বর্ধিত বর্ষাকাল ও এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস না করার কারণে পরিস্থিতি আরো জটিল হচ্ছে। কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর তীব্রতা বজায় থাকতে পারে।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু সংক্রমণ কখন থেকে শুরু
বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ১৯৬৫ সালে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তখন এই রোগটি ‘ঢাকা জ্বর’ (Dhaka Fever) নামে পরিচিতি পেয়েছিল। তবে সরকারিভাবে ডেঙ্গুর হিসাব বা বড় আকারের প্রাদুর্ভাবের রেকর্ড রাখা শুরু হয় ২০০০ সাল থেকে। এরপর প্রতি বছরই কমবেশি ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যায়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাসে ২০২৩ সাল ছিল ডেঙ্গু সংক্রমণের সবচেয়ে ভয়াবহ বছর। ২০২৩ সালে ডেঙ্গু জ্বরে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে, যে সংখ্যা ১ হাজার ৭০৫ জন। ওই বছর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি।
গত ১০ বছরের হিসাবে দেখা গেছে, দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু হয়েছে ৩ হাজার ৩০৮ জনের। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩৩১ জন মানুষ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রতি বছর গড়ে ৯০ হাজার থেকে এক লাখ। ১০ বছরের মধ্যে ২০১৬ সালে ১৪ জন, ২০১৭ সালে আটজন, ২০১৮ সালে ২৬ জন, ২০১৯ সালে ১৭৯ জন, ২০২০ সালে সাতজন, ২০২১ সালে ১০৫ জন, ২০২২ সালে ২৮১ জন, ২০২৩ সালে ১ হাজার ৭০৫ জন, ২০২৫ সালে ৫৭৫ জন এবং ২০২৫ সালে ৪১০ জন মারা যান। ডেঙ্গুর প্রকোপ রাজধানী ঢাকাতেই বেশি, মোট আক্রান্তের ৪০ শতাংশ। ঢাকায় বেশি হওয়ার কারণ অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ এবং পরিবেশগত পরিস্থিতি । ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর। বহুতল ভবন, নির্মাণাধীন ভবন, ঘিঞ্জি এলাকা, বেজমেন্ট বা বিভিন্ন জায়গায় পড়ে থাকা পাত্রে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা সবচেয়ে বেশি প্রজনন করে। যত্রতত্র ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক সামগ্রী, কাপ, ডাবের খোসা, চিপসের প্যাকেট, টব, টায়ারসহ বিভিন্ন কিছুতে বৃষ্টির পানি জমে এডিস মশার লার্ভা তৈরি হয়। ঢাকায় বিশাল জনগোষ্ঠীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শতভাগ নিশ্চিত না হওয়ায় এই সমস্যা প্রকট হচ্ছে।
আইসিডিডিআরবিতে ওলবাকিয়া প্রযুক্তি ও ডেঙ্গু ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা
বাংলাদেশের প্রধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবি (icddr,b) ইতোমধ্যে ঢাকার আবহাওয়া ও পরিবেশের উপযোগী ওলবাকিয়াবাহী মশা সফলভাবে উদ্ভাবন করেছে। সংস্থাটির সিনিয়র বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ শফিউল আলম এবং গবেষক হাসান মোহাম্মদ আল আমিনের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী দল ‘wAlbB2-Dhaka’ নামক একটি বিশেষ এডিস মশার স্ট্রেন তৈরি করেছেন। তারা ঢাকার স্থানীয় এডিস মশার সঙ্গে ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়ার সফল মিশ্রণ ঘটিয়েছেন, যা ল্যাবরেটরিতে ডেঙ্গু ভাইরাসের বিস্তার ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত রুখে দিতে পারে। আইসিডিডিআরবি অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল রিসার্চের (QIMR) সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার মাধ্যমে তারা গবেষণার জন্য ওলবাকিয়া মশার সহজ ল্যাব-অ্যাক্সেস পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এখন মাঠপর্যায়ে ট্রায়াল শুরু করার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
বাংলাদেশ সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড মস্কিটো প্রোগ্রামের মধ্যেও একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকা থেকে ওলবাকিয়া মশা ছাড়ার পাইলট প্রকল্প শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ওলবাকিয়া প্রযুক্তির পাশাপাশি ডেঙ্গু ভ্যাকসিনের (যেমন ক্যারোডিল বা কিউডেঙ্গা) লোকাল ট্রায়াল ও অ্যাক্সেস দ্রুত করার জন্য আইসিডিডিআরবি ও সরকার যৌথভাবে কাজ করেছে। এর পাশাপাশি ড্রোন দিয়ে মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করা, নতুন কার্যকর লার্ভিসাইড (যেমন Bti) ব্যবহার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ড. শফিউল আলম পরজীবীবিদ্যা ও বাহকবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গবেষণার জন্য সুপরিচিত। তিনি আমাকে জানান, ডেঙ্গু দমনে একটিমাত্র পদ্ধতির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। আমাদের সমন্বিত বা বহুমাত্রিক পদক্ষেপ (মাল্টিপল অ্যাপ্রোচ) গ্রহণ করতে হবে। ওলবাকিয়া প্রযুক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি গবেষণায় ডেঙ্গু ভ্যাকসিনের দিকেও নজর দিতে হবে।
ভ্যাকসিন প্রসঙ্গে তিনি জানান, আইসিডিডিআরবি ডেঙ্গুর যে ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করছে, সেটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (এনআইএইচ) কর্তৃক উদ্ভাবিত ‘TV005’ নামক একটি টেট্রাভ্যালেন্ট ডেঙ্গু ভ্যাকসিন। এই ভ্যাকসিনের ফর্মুলা বা প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করেই ব্রাজিলের বুটানটান ইনস্টিটিউট তাদের নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করেছে। আইসিডিডিআরবি এই ভ্যাকসিনের বাংলাদেশের সংস্করণ উদ্ভাবনে দ্বিতীয় ধাপের ট্রায়াল শেষ করেছে। আইসিডিডিআরবি ব্রাজিলের বুটানটান ইনস্টিটিউটের সঙ্গে ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরন Den-1, Den-2, Den-3, Den-4 মোকাবিলার জন্য তথ্য আদান-প্রদান করছে।
ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া যেভাবে আবিষ্কৃত হলো
ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া আবিষ্কারের ইতিহাস প্রায় ১০০ বছরের পুরোনো। ১৯২৪ সালের এক সাধারণ মশা পরীক্ষার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই ব্যাকটেরিয়ার ইতিহাস আজ মানবজাতিকে মহামারি থেকে বাঁচানোর অন্যতম বড় হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের বোস্টন এবং মিনিয়াপোলিস এলাকার দুই বিজ্ঞানী কীটতত্ত্ববিদ মার্শাল হার্টিগ এবং প্যাথলজিস্ট সিমিওন বার্ট ওলবাক যৌথভাবে এই ব্যাকটেরিয়া আবিষ্কার করেন। তারা ল্যাবে সাধারণ ঘরের মশা (Culex Pipiens) ব্যবচ্ছেদ করার সময় অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে মশার ডিম্বাশয় এবং শুক্রাশয়ের কোষে এক ধরনের বড় আকৃতির অণুজীব দেখতে পান।
এটি আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানী মার্শাল হার্টিগ এই নতুন অণুজীব নিয়ে আরো বিস্তারিত গবেষণা করেন। অবশেষে ১৯৩৬ সালে তিনি সহকর্মী বিজ্ঞানী সিমিওন বার্ট ওলবাকের সম্মানার্থে এবং সে মশার নামানুসারে এই ব্যাকটেরিয়ার অফিশিয়াল বৈজ্ঞানিক নামকরণ করেন ‘ওলবাকিয়া পাইপিয়েন্টিস’। ওলবাকিয়া নিয়ে পরের বেশ কয়েক দশক কোনো কাজ হয়নি। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে জার্মান বিজ্ঞানী হ্যানেস লাভেন আবিষ্কার করেন, এই ব্যাকটেরিয়াবাহী কিছু পুরুষ মশার সঙ্গে সাধারণ মশার প্রজনন ঘটালে ডিম থেকে বাচ্চা ফোটে না। বিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘সাইটোপ্লাজমিক ইনকমপ্যাটিবিলিটি’ বলে। সত্তরের দশকে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, ওলবাকিয়া খুব চতুরভাবে তার পোষক কীটপতঙ্গদের প্রজনন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এটি মায়ের শরীর থেকে ডিমের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্ম ছড়ায়। কিন্তু কোনো পুরুষ মশা ওলবাকিয়া নিয়ে সাধারণ মশার সঙ্গে মিলন করলে ডিমগুলো অনুর্বর হয়ে যায়। ওলবাকিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মোড় ঘোরে যখন বিজ্ঞানীরা একে ডেঙ্গু, জিকা ও চিকুনগুনিয়া রোগ নিয়ন্ত্রণের কাজে লাগানোর কথা ভাবেন ২০০৮ থেকে ২০১১ সাল নাগাদ। ওলবাকিয়া প্রাকৃতিকভাবে ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস ইজিপ্টি মশার শরীরে থাকে না। অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্কট ও’নিল এবং তার আন্তর্জাতিক গবেষণা দল, যা পরে ওয়ার্ল্ড মস্কিটো প্রোগ্রাম (ডব্লিউএমপি) নামে পরিচিত হয়, দীর্ঘ চেষ্টার পর ল্যাবরেটরিতে ফলমাছিতে থাকা ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া সফলভাবে এডিস মশার শরীরে প্রবেশ করান। এরপর বিজ্ঞানীরা লক্ষ করলেন এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। ওলবাকিয়া থাকার কারণে মশার শরীরে ডেঙ্গু, জিকা ও চিকুনগুনিয়ার মতো ভাইরাসগুলো আর বংশবৃদ্ধি করতে পারছে না। ২০১১ সালে প্রথম ওলবাকিয়াযুক্ত মশা প্রকৃতিতে ছাড়া হয় এবং সেখানে ডেঙ্গু সংক্রমণ শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। সেই গবেষণার সূত্র ধরেই বিজ্ঞানী উতারিনি ইন্দোনেশিয়ায় মাঠপর্যায়ে ট্রায়াল পরিচালনা করে সফল হন, যা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ অনুসরণ করছে।
ওলবাকিয়াবাহী এডিস মশা কামড়ালেও যে কারণে ডেঙ্গু হয় না
ওলবাকিয়া হলো সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া একটি বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়া, যা পৃথিবীর প্রায় ৬০ শতাংশ কীটপতঙ্গ, যেমন মাছি, প্রজাপতি, ফড়িং ও মৌমাছির শরীরে স্বাভাবিকভাবেই বাস করে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগ ছড়ানো প্রধান মশা—এডিস ইজিপ্টি মশার শরীরে এই ব্যাকটেরিয়াটি প্রাকৃতিকভাবে থাকে না। এডিসের শরীরে যখন ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করানো হয়, তখন এটি মশার শরীরের ভেতরের পুষ্টি উপাদান ব্যবহার করে বেঁচে থাকে। ডেঙ্গু ভাইরাসের বংশবৃদ্ধির জন্যও ঠিক একই পুষ্টি উপাদানের প্রয়োজন হয়। ফলে ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ডেঙ্গু ভাইরাস হেরে যায় এবং মশার শরীর আর বড় বা সংখ্যায় বাড়তে পারে না। সহজ কথায়, ওলবাকিয়া মশার ভেতরে ডেঙ্গু ভাইরাসের জন্য একটি দেয়াল বা ঢাল তৈরি করে। ওলবাকিয়াযুক্ত নারী ও পুরুষ মশা যখন ল্যাব থেকে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন তারা বন্য মশার সঙ্গে মিলন শুরু করে দেয়। ওলবাকিয়াবাহী একটি নারী মশা সাধারণ পুরুষ মশার সঙ্গে মিলন করার পর তার ডিম থেকে জন্ম নেওয়া সব মশার শরীরেই ওলবাকিয়া জন্ম নেয়।
ওলবাকিয়াবাহী পুরুষ মশা কোনো সাধারণ নারী মশার সঙ্গে মিলন করলে ডিমগুলো থেকে কোনো বাচ্চা ফুটে বের হয় না। এর ফলে ধীরে ধীরে প্রকৃতির সাধারণ ডেঙ্গু ছড়ানো মশার জায়গা দখল করে নেয় ওলবাকিয়াবাহী নিরাপদ মশা। ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়াটি শুধু কীটপতঙ্গের কোষেই বেঁচে থাকতে পারে। মানুষ, পাখি, মাছ বা অন্য কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর শরীরে বংশবৃদ্ধি করতে পারে না এবং কোনো রোগ ছড়ায় না। তাই ওলবাকিয়াবাহী মশা মানুষকে কামড়ালেও মানুষের শরীরে কোনো ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হয় না, উল্টো মশাটির নিজের শরীরে ডেঙ্গুর ভাইরাস না থাকায় মানুষটি ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া থেকে পুরোপুরি সুরক্ষিত হয়।
ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর জনসচেতনতা কর্মসূচি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১২ সেপ্টেম্বর থেকে দেশব্যাপী ডেঙ্গু বিস্তার রোধে এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে তিন মাসব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করেছেন। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি স্কাউটস, গার্ল গাইডস, বিএনসিসি, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং স্কুল-কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমাবেশে বক্তৃতায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে তাদের সাহায্য কামনা করেন। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে সারা দেশে কিশোর, তরুণ ও ছাত্রছাত্রীরা প্রতি শনিবার এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাচ্ছে।
জাতীয় সংসদ ভবন দেখতে আসা ছাত্রছাত্রীদেরও তিনি বলছেন, তারা যেন নিজের বাড়ি ও ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখে এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করে। তিনি তাদের বলেন, ‘তুমি একজন শিক্ষার্থী এবং একই সঙ্গে পরিবারের একজন সদস্যও। তুমি যদি তোমার ঘরবাড়ির আঙিনা পরিষ্কার রাখো এবং তোমার মতো দেশের প্রতিটি পরিবারে যদি সদস্যরা একইভাবে কাজ করে, তাহলে দেখবে, আমাদের পুরো দেশই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর হয়ে গেছে। তাহলে এডিস মশার সংক্রমণও আর থাকবে না।’
লেখক: বাংলাদেশ সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব