ইউক্রেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে রাশিয়া জোরজবরদস্তি বাংলাদেশসহ ২৯টি দেশের নাগরিকদের ব্যবহার করছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন এই তথ্যবোমাটি ফাটিয়েছে। অথচ আমরা চুপ বসে আছি।
টুঁ শব্দটিও করছি না। রাশিয়াকে কিছু বলা যেন বারণ।
সময় কীভাবে বদলায়! আশি ও নব্বই দশকে বাংলাদেশের একদল ধর্মপ্রাণ তরুণ স্বেচ্ছায় ফিলিস্তিনিদের পক্ষে লেবাননে, মার্কিন ও রুশ বাহিনীর বিপক্ষে আফগানিস্তানে জনগণের জন্য লড়েছিল। রাষ্ট্র, মিডিয়া, সুশীল সমাজ তাদের ‘জঙ্গি’, ‘মৌলবাদী’ আখ্যা দিয়েছিল। দেশে ফেরতের পর তাদের জেল পর্যন্ত খাটিয়েছিল। তাদের পরিবারগুলোকে তীব্র ভর্ৎসনায় সমাজচ্যুত করার অপপ্রয়াস পেয়েছিল।
সমাজ, অর্থনীতি আর নৈতিকতার বদলা-বদলিতে আমরা এখন অস্থির। বেকারত্ব থেকে বাঁচতে প্রবাসী চাকুরে হওয়ার স্বপ্নে প্রচণ্ড বিপর্যয় ঘটতে শুরু করেছে। বাংলাদেশিরা ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারাচ্ছেন। মালয়েশিয়ার জঙ্গলে আটকে আছেন; ইউরোপের বন্দিশিবিরে বন্দি, মধ্যপ্রাচ্যে নারী প্রবাসীরা পীড়নের শিকার হচ্ছেন। প্রায় প্রতিদিন এয়ারপোর্টে নামছেন প্রতারণার শিকার প্রবাসীরা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কম পেরেশান নয়। এই প্রবাসীদের টাকায় আমরা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে গড়ছি ডলারের বড় মজুত, গ্রামে গ্রামে উঠছে টাইলসের পাকা বাড়ি। অনেক পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছেন তারা।
রাশিয়ায় বাংলাদেশিদের চাকরির নামে নিয়ে গিয়ে রণাঙ্গনে পাঠানোর বিক্ষিপ্ত কিছু রিপোর্ট বেরিয়েছে। তবে জাতিসংঘের ইউক্রেনবিষয়ক স্বাধীন তদন্ত কমিশন চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ৪৮টি দেশের নাগরিকদের রুশ সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ-সংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখে ২৯টি দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রতারণা বা জোরাজুরির প্রমাণ পেয়েছে। তাদের চাকরি এবং উঁচু বেতনের লোভ দেখিয়ে রাশিয়া নেওয়া হয়েছিল। তাদের বহিরাগমনে সরকারও অনাপত্তি সার্টিফিকেট দিয়েছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী গত তিন বছরে ৫৪ বাংলাদেশি রণাঙ্গনে নিহত হয়েছেন। তাদের ১৭ জনের মৃত্যু ঘটেছে যুদ্ধের প্রথম দিনে। মাত্র কয়েক দিনের সমর প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের যুদ্ধে পাঠানো হয়। রাখা হয় ফ্রন্ট লাইনের সম্মুখসারিতে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও প্রবাসী মন্ত্রণালয় যথেষ্ট তৎপর প্রবাসীদের স্বার্থরক্ষায়। কিন্তু প্রবাসীরা সন্তুষ্ট নন। আশ্চর্যের বিষয় হলো মধ্যপ্রাচ্যসহ অনেক দেশেই প্রবাসীদের কষ্টে দুর্ভোগে আমরা সোচ্চার। বিশেষত মুসলিম দেশগুলোর ক্ষেত্রে আমরা যথেষ্ট সচেতন। ত্রিশ লাখেরও বেশি প্রবাসী যেই সৌদি আরবে, যেখানে সম্প্রতি দুই বাংলাদেশি নাগরিকের শিরশ্ছেদ নিয়ে মিডিয়া ও সুশীল সমাজের উদ্বেগে আমরাও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে জিজ্ঞেস করা হয়, তাদের বিষয়ে বাংলাদেশকে কেন আগে জানানো হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে নারী কর্মীদের নিয়ে আমাদের উৎকণ্ঠা যুক্তিসংগত। মিডিয়াতে এর প্রতিফলন ঘটে। যেমনিভাবে মাদরাসায় ব্যভিচারজনিত ঘটনা উচ্চমাত্রায় কভারেজ পায়। কিন্তু রাশিয়ার ব্যাপারে আমাদের নীরবতা কেন? সেখানে বাংলাদেশিদের জোর করে যুদ্ধে নামানো হচ্ছে। কিন্তু আমরা প্রতিবাদ বা রুশ রাষ্ট্রদূতকে তলব করছি না কেন? বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাশিয়া সফর শেষে বলেছিলেন, সে দেশে জনশক্তি রপ্তানির উল্লেখযোগ্য বাজার আছে। মনে পড়ে যায়Ñজেমস বন্ডের একটা নামকরা সিনেমা ছিল! ফ্রম রাশিয়া উইথ লাভ।
আমাদের সমাজে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নমনা একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠী আছে। আর ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারকে পুতিন শুধু সহায়তাই করেননি; বরং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে নজিরবিহীন দুর্নীতি ঘটাতে সাহায্য করেছেন। এর অর্ধেক খরচে রাশিয়া ভারতে একই ক্ষমতার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছে। রূপপুর অচিরেই বিদ্যুৎ বানাবে, সেখানে অনেক রুশ বিশেষজ্ঞ কর্মরত। সেজন্যই কি রাশিয়ার অমানবিকতা নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলছি না? সৌদি আরবের মতো ঘনিষ্ঠ বন্ধুদেশের রাষ্ট্রদূতকে তলব করতে পারলে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত কেন তলবের অযোগ্য হয়ে পড়লেন? ওই বাংলাদেশিদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরানোর কাজটি জরুরি ভিত্তিতে করা উচিত। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, নিহতদের লাশও আমরা পাই না। ইসলাম ধর্মে জীবিত বা মৃত উভয়ের গুরুত্ব ও মর্যাদা সমান। আজ যদি ইউক্রেন-রাশিয়া সীমান্তে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন থাকত আর বাংলাদেশি কোনো সৈন্যের প্রাণহানি ঘটত, তবে তার প্রত্যাবর্তন ও দাফন হতো রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়।
আগেই বলেছি, ইসরাইল, আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে মুসলমানদের যুদ্ধে একসময় ধর্মপ্রাণ বাংলাদেশের তরুণরা জান বাজি রেখে লড়েছিল। পূর্ববঙ্গের বাংলাভাষী মুসলিম সমাজ যে ‘মার্শাল রেইস’ তার প্রমাণ সিপাহি বিদ্রোহে ‘বেঙ্গল ল্যানচার্স ’-এর ভূমিকা, প্রথম যুদ্ধে বাঙালি পল্টন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাদের রণ-নৈপুণ্য, ১৯৪৮ সালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পত্তন, ১৯৬৫ সালে ভারতের বিরুদ্ধে বেঙ্গল টাইগারদের বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ, একাত্তর সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি হিসেবে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের নেতৃত্ব।
আমাদের বীর সৈনিক সাবেক এমপি গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) সাইফুল আযম ইসরাইলের ওপর বিমান হামলায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশকে গর্বিত করে গেছেন। কোনো কোনো পশ্চিমা সরকার মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য কয়েকজনের নাগরিকত্ব কেটে দিয়েছে।
কথা হচ্ছে, নৈতিক ও স্বেচ্ছা যুদ্ধের পাশাপাশি জোর করে অনৈতিক যুদ্ধে ঠেলে দেওয়া এক নয়। একসময়ের নিষিদ্ধ ঘোষিত ‘হরকাতুল জিহাদ’-এর কিছু তরুণ ওইসব যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। তাদের তখন বলা হতো মুজাহিদÑঅর্থাৎ যারা জিহাদ করেন। জিহাদ শব্দটি জুহদ ধাতু থেকে এসেছে। অর্থ হচ্ছে পরিশ্রম ও কষ্ট স্বীকার ও কোনো কাজে কঠিন দুঃখ-কষ্ট সহ্য করা। তাই জিহাদের সংজ্ঞা হচ্ছে, প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে দুশমনের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য নিজের পূর্ণ শক্তি ব্যয় করা। ইসলামের মূল উদ্দেশ্য দুনিয়ায় সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং অসত্য ও অন্যায়ের বিলোপ সাধন। আমর বিল মা’রুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার।
প্রতিটি আনুগত্যের জন্য একটি বিদ্রোহ, প্রতিটি মিত্রতার জন্য একটি শত্রুতা এবং প্রতিটি বিনয়ের জন্য একটি দাম্ভিকতা ও অহংকার অপরিহার্য। আপনি কোনো এক মালিকের চাকর হতেই পারেন না, যতক্ষণ অন্যসব মালিকের মালিকানা অস্বীকার না করেন। সুতরাং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর আনুগত্যের জন্য প্রথম কাজই হচ্ছে, যা ছাড়া আর যত শক্তি তাদের আনুগত্যের জন্য ডাকছে, সবার সঙ্গে বিদ্রোহ ঘোষণা করা। (যে সত্যের মৃত্যু নেই : ভারতের অন্যতম বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মরহুম মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, ভাষান্তর : আখতার ফারুক)।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মৌলবাদী রাজনীতির যেমন গ্রহণযোগ্যতা নেই, তেমনি ‘হরকাতুল জিহাদ’-এর অনেক কর্মকাণ্ড সমর্থনযোগ্য ছিল না। আশ্চর্যের বিষয় হলো, হরকাতুল জিহাদ প্রতিষ্ঠার সময় যেসব কারণের উল্লেখ করা হয়েছিল, সেসবের একটি ছিল, হাইকোর্ট কর্তৃক ফতোয়াকে নিষিদ্ধ করা। ওই বিতর্কিত রায়টি দিয়েছিলেন এমন এক মরহুম বিচারপতি, যার পূর্বকালের রাজনীতি ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের আদর্শকেন্দ্রিক। এই মানসিকতার অভিজাত সমাজ এখনো আছে। তাদের গ্যাঁড়ামি এমন ছিল যে, বিলুপ্ত জাতীয় দৈনিক ‘দৈনিক বাংলা’য় কাজ করতেন ওই সময় এক সিনিয়র সহ-সম্পাদক। সোভিয়েত নেতা গর্বাচেভ যেদিন ‘পেরেস্ত্রোইকা’ ও ‘গ্লাসনস্ত’-এর ঘোষণা দিলেন, ওই খবরটি আর পরদিন দৈনিক বাংলায় ছাপা হলো না। কী ব্যাপার? অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো ওই সিনিয়র সাংবাদিকের হাতে পড়েছিল টেলিপ্রিন্টারে আসা খবরটির স্লাগ বা কাগজটি। তিনি মনে করলেন, মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি সাম্রাজ্যবাদী প্রচারণার অংশ হিসেবে গর্বাচেভের বরাতে ভুয়া নির্দেশ করেছে। গরবাচেভ তো তাদের চোখে সোভিয়েতের বেঈমান। অতঃপর আমাদের ওই ভাই বোগাস বলে স্লাগটি ছিঁড়ে ফেলে দিলেন। কাউকে কিছু জানালেন না।
লেখক: জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও
উইকলি ইকোনমিক টাইমস সম্পাদক