হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

রাষ্ট্রপতির চিকিৎসাবিলাস ও বেহাল স্বাস্থ্য খাত

ডা. ওয়াজেদ খান

ডা. ওয়াজেদ খান

হাম অনেকটাই মহামারির আকার ধারণ করেছে বাংলাদেশে। ইতোমধ্যে প্রাণহানি ঘটেছে প্রায় অর্ধসহস্র শিশুর। মৃত শিশুর চাদর-মোড়ানো নিথর দেহ নিয়ে হাসপাতাল ছাড়ছেন স্বজনরা—এমন চিত্র যখন সংবাদমাধ্যমে ভাইরাল, তখন দেশের রাষ্ট্রপতি নিজ সুস্থতার ব্যারোমিটার পরখ করতে গেলেন লন্ডনে। সেই পুরোনো দোহাই—দেশে স্বাস্থ্যের উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা নেই; সুচিকিৎসা নেই ভিআইপি, ভিভিআইপিদের। তাই রোগের সামান্য উপসর্গ সর্দি-জ্বর হলেই তারা ছুটে যান সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ব্রিটেন, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে। কী বিচিত্র বৈপরীত্য! যে দেশের অনেক নাগরিক মরণব্যাধি নিয়ে ভ্যানে চড়ে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে, সেই দেশের কথিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ অনায়াসে বিদেশি হাসপাতালে যান এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে উড়ে। দেশের হাসপাতালে জীবনের ঝুঁকি নিতে নারাজ তারা। অথচ ১৮ কোটি মানুষ বেঁচে আছে নিজ দেশের প্রচলিত চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করে। তাদের কোনো স্বাস্থ্যবিমা নেই। জীবনের নেই কোনো মূল্য। অসহায় এই শ্রেণির মানুষের পুরো জীবনটাই কাটে মৃত্যুঝুঁকিতে। অপরদিকে বিত্ত ও ক্ষমতাবানদের জন্য রয়েছে দেশের আধুনিক ও বড় হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ। অসাম্যের এই ভয়াবহতা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে সমাজ ও রাষ্ট্রে।

কী অবাক করা কথা! বাংলাদেশে নাকি রাষ্ট্রপতির চিকিৎসা নেই। তাই শারীরিকভাবে সুস্থ কি না, এটা পরীক্ষার জন্য বছরে একবার লন্ডনে এবং আরেকবার সিঙ্গাপুর যেতে হয় রাষ্ট্রপতিকে। শুধু কি রাষ্ট্রপতি—প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, আমলা ও ধনীদেরও কোনো আস্থা নেই নিজ দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু লন্ডন গিয়েছেন অস্ত্রোপচারের ফলো-আপ হিসেবে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য। রাষ্ট্রপতির লটবহরে সফরসঙ্গী হয়েছেন পরিবারের সব সদস্য, রাষ্ট্রপতির চিকিৎসকবৃন্দ, স্টাফ নার্স ও বঙ্গভবনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ২০২৩ সালের অক্টোবরে কার্ডিয়াক বাইপাস সার্জারি সম্পন্ন হয় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর। তার চিকিৎসার সব রেকর্ড রয়েছে সিঙ্গাপুরে। সে হিসেবে তার ফলো-আপ মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালেই হওয়ার কথা। কিন্তু তিনি গেছেন লন্ডনের একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে। অবশ্য ভিআইপি ও উচ্চবিত্তদের জন্য দেশেই রয়েছে বিশেষায়িত হাসপাতাল। এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে কার্ডিয়াক বাইপাস সার্জারি, কিডনি প্রতিস্থাপনসহ অনেক জটিল রোগের আধুনিক চিকিৎসা হচ্ছে নিয়মিত। জাতীয় সংসদের বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতার কার্ডিয়াক বাইপাস সার্জারি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে দেশের একটি হাসপাতালে। কিন্তু ক্ষমতা ও বিত্তের অধিকারীরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বিদেশে চিকিৎসা করাতে। দেশের চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রতি সামান্যতম ভরসা নেই তাদের। এখানেই আসে দেশপ্রেমের প্রশ্ন। যেসব জটিল রোগের চিকিৎসা দেশের হাসপাতালে নেই, সেসব চিকিৎসার জন্য বিদেশে গেলে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা কিংবা এক দেশের হাসপাতালে সার্জারি করে অন্য দেশের হাসপাতালে ফলো-আপ করতে যাওয়া একটি অস্বাভাবিক ঘটনা। এ কারণেই প্রশ্ন উঠেছে রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর লন্ডন যাত্রা নিয়ে। রাষ্ট্রীয় বিপুল অঙ্কের অর্থে তার এই লন্ডন সফরে পরিবারের সব সদস্য এবং অফিস কর্মকর্তাদের সঙ্গী করা হয়েছে, যা নিতান্তই অপ্রয়োজনীয়। তাছাড়া লন্ডনের হাসপাতালে রাষ্ট্রপতির সফরসঙ্গী ডাক্তার ও নার্সদের কোনো ভূমিকা নেই। ফলে পুরো বিষয়টি পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর চিকিৎসা বিলাসে।

দায়িত্ব পালনকালে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চোখের চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও সিঙ্গাপুর সফর করেছেন। চিকিৎসার নামে রাষ্ট্রপতিদের বিদেশ সফর নিয়ে সমালোচনা হয়েছে অতীতেও।

চিকিৎসা মানুষের মৌলিক পাঁচটি অধিকারের অন্যতম। নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায় রাষ্ট্রের। দেশের সংবিধানেও উল্লেখিত আছে বিষয়টি। গড় আয়ুর বৃদ্ধি সূচকে উল্লসিত হওয়া এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা। মানুষের জীবন শুধুই বেঁচে থাকার জন্য নয়। কথা ছিল স্বাস্থ্যসেবা সর্বজনীন করার। স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও রাষ্ট্র হতে পারেনি কল্যাণমুখী; নিশ্চিত করতে পারেনি স্বাস্থ্য খাতের মান নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসন। ফলে গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থা হয়ে উঠেছে স্বেচ্ছাচারী। স্বাস্থ্যসেবার অর্থ জোগান দিতে গিয়ে স্বাস্থ্য খাতের বৈষম্যমূলক এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রতিবছর নতুন করে দরিদ্র হচ্ছে ৬১ লাখ মানুষ।

দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ অনেকটাই পরিত্যক্ত অবস্থানে। ফলে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল ও ক্লিনিক; কিন্তু সুযোগ সৃষ্টি হয়নি সব নাগরিকের জন্য মানসম্মত চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গিয়ে হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকে কষ্ট করে ভারতে যাচ্ছে চিকিৎসার জন্য। সেখানেও বাংলাদেশি দালালদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে ফিরছে অনেকে। অসুখ মানেই সুখ নেই। মানুষ সবচেয়ে বেশি অসহায় অনুভব করে যখন তাকে কাতরাতে হয় হাসপাতালের বিছানায়। এ সময় সবকিছুর বিনিময়ে হলেও ধরে রাখতে চায় তার জীবন। আর এ অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির হাসপাতাল মালিক, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী লুটে নেয় তাদের সর্বস্ব।

বেহাল স্বাস্থ্য খাতের কারণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং সিংহভাগ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের পরিচালক ও দলীয় আশীর্বাদপুষ্ট একশ্রেণির চিকিৎসক মিলে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার বারোটা বাজিয়েছে এই সিন্ডিকেট; ফোকলা করে দিয়েছে হাসপাতালগুলোর অন্দর-বাহির। বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই সরকারের। চিকিৎসার মান যাচাই-বাছাই করবে, এমন কোনো নিয়মনীতি না থাকায় তারা ফ্রি স্টাইল ব্যবসা করছে রোগীদের জিম্মি করে। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নেই। ল্যাবরেটরি নেই। আইসিইউ নেই। অক্সিজেন সরবরাহ নেই। জীবন রক্ষাকারী ওষুধ নেই। চিকিৎসক নেই। নার্স নেই। নেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মী। পর্যাপ্ত বাজেট নেই। চারিদিকে শুধু ‘নেই, নেই’; আর যা কিছু আছে তা ভরপুর নকল ও ভেজালে।

সরকারের মন্ত্রী ও আমলাদের আনতে হবে জবাবদিহিতার আওতায়। স্বাস্থ্য নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ আইন ছাড়া বেসরকারি হাসপাতাল চলবে এভাবেই। সরকারি হাসপাতালের অবস্থাও তথৈবচ। সময় এসেছে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় ভুল এবং অবহেলাজনিত চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের আইনি শাস্তির আওতায় আনা। উন্নত দেশগুলোয় এই ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকায় চিকিৎসাসেবার মান উন্নত। দেশের চিকিৎসা খাতে বাজেট বাড়ানো, সময়োপযোগী স্বাস্থ্যনীতি প্রবর্তন, দুর্নীতি-অনিয়ম কঠোর হস্তে দমন এবং বেসরকারি হাসপাতাল নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা প্রণয়নের কোনো বিকল্প নেই। বিদেশে ধনবানরা দাতব্য ও অলাভজনক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। নিজ অর্থে প্রতিষ্ঠিত এসব হাসপাতাল দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত করে। আর আমাদের দেশের বিত্তবানরা ব্যাংক-বীমা লুট করে বিদেশে পাড়ি জমান চিকিৎসার জন্য। মানসিকতা ও মানবিকতার পার্থক্য এখানেই। এছাড়া সমাজের অন্যান্য দিকের মতো চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রেও বৈষম্য প্রকট হয়ে উঠেছে দেশে। সরকারের শীর্ষ মহল থেকে শুরু করে একটি শ্রেণি ভোগ করছে অপার সুযোগ-সুবিধা, আর বেশুমার মরছে সাধারণ মানুষ। স্বাস্থ্যসুবিধা পাওয়া নাগরিকদের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার। এ বৈষম্য যতদিন থাকবে, ততদিন সচল থাকবেই মানুষ মারার এসব কলকারখানা। দমন করতে হবে দুর্নীতি, লুটপাট ও অনিয়ম। নিজ রাষ্ট্রের হাসপাতালেই চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে সব নাগরিকের। এজন্য অবশ্যই ঢেলে সাজাতে হবে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা। রাষ্ট্রীয় অর্থের অবাধ শ্রাদ্ধ বন্ধ করতে হবে। শারীরিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি যাচাই করতে হবে চুপ্পু সাহেবদের মানসিক সুস্থতা। সবার আগে গড়তে হবে বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ; সাম্য ফিরিয়ে আনতে হবে সমাজ ও রাষ্ট্রে।

সবশেষে প্রখ্যাত ভারতীয় কবি কাইফি আজমির কবিতার কয়েকটি পঙ্‌ক্তি দিয়ে শেষ করব—

“কারো জন্য উপচে পড়ে সাগর

অন্যদের গ্লাস খালি!

কেমন সময় এটা

কেমন বিষম বাটোয়ারা—ওগো সাকি?

এখনো ধারণ করতে পারনি তুমি

তৃষ্ণার্তের স্বভাব?

দেবার ধরন তোমার বদলাতেই হবে

ওগো সাকি।”

লেখক : সম্পাদক, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ, নিউ ইয়র্ক

ফারাক্কার প্রভাবে ব্রিজের নিচে নদী নেই!

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ঝড় ও বাংলাদেশ

ফারাক্কা মার্চ : মওলানা ভাসানীর আধিপত্যবাদবিরোধী গণপ্রতিবাদ

বাংলার কৃষকদের সেই অবিস্মরণীয় দিন

ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মোক্ষম অস্ত্র

তুরস্ক-সৌদি-মিসর-পাকিস্তান জোটে আলজেরিয়া

হামের প্রাদুর্ভাব ও বিশ্ব স্বাস্থ্যসংকট

হাওরে বোরো ধানের দুর্যোগ মানুষসৃষ্ট

ইসলামি মূল্যবোধভিত্তিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ

ইরানে এক অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের গল্প