মুক্তিযুদ্ধে ওসমানী মেডিকেল কলেজ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুধু রণাঙ্গনের সাহসিকতার গল্প নয়; এটি মানবতা, দায়িত্ববোধ এবং আত্মত্যাগের এক গভীর মহাকাব্য। এই মহাকাব্যের এক অনন্য কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত অধ্যায় হলো সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক, শিক্ষার্থী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অবদান। ১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্মম গণহত্যা চালাচ্ছিল, তখন সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়ে ওঠে আহত মানুষের শেষ আশ্রয়। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, ওষুধের সংকট এবং প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ঝুঁকিÑসবকিছু উপেক্ষা করে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবন বাজি রেখে সেবা দিয়ে গেছেন। এই মানবিক সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. শামসুদ্দীন আহমদÑএকজন চিকিৎসক, নেতা এবং মানবতার প্রতীক। মার্চ মাসের শুরুতেই তিনি সম্ভাব্য সহিংসতার পূর্বাভাস দিয়ে হাসপাতালে একটি জরুরি ব্লাড ব্যাংক ও ইমার্জেন্সি স্কোয়াড গঠন করেন। তার এই দূরদর্শিতা পরে অসংখ্য আহত মানুষের জীবন বাঁচাতে সহায়ক হয়।
২৫ মার্চের গণহত্যার পর যখন সিলেটেও রক্তপাত শুরু হয়, তখন তিনি দিনরাত হাসপাতালে থেকে আহতদের চিকিৎসা দেন। তিনি তার ছাত্রদের বলেছিলেনÑএই বর্বরতার একমাত্র সমাধান স্বাধীনতা। তার এই আহ্বানে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক শিক্ষার্থী সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। শুধু চিকিৎসা নয়, মানবতার এক বিরল দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছিলেন তিনি। হাসপাতালে ভর্তি আহত পাকিস্তানি সৈন্যদেরও তিনি চিকিৎসা দেন এবং তাদের ওপর আক্রমণ না করার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের অনুরোধ করেন। চিকিৎসানীতির প্রতি তার এই অবিচল অবস্থান তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
যুদ্ধ তীব্রতর হলে সিলেট শহর প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। মানুষ গ্রামে আশ্রয় নেয়। কিন্তু হাসপাতাল তখনো ভরে উঠছিল গুলিবিদ্ধ মানুষের আর্তনাদে। অধিকাংশ চিকিৎসক নিরাপত্তার কারণে চলে গেলেও ডা. শামসুদ্দীন হাসপাতাল ছাড়েননি। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার রোগীদের ফেলে আমি কোথাও যাব না।’ তার পাশে ছিলেন কয়েকজন সাহসী সহকর্মী, শিক্ষানবিস চিকিৎসক ডা. শ্যামল কান্তি লালা, অ্যাম্বুলেন্সচালক কোরবান আলী, নার্স মাহমুদুর রহমানসহ কয়েকজন। তারা জানতেন মৃত্যুর ঝুঁকি রয়েছে, তবু মানবতার সেবায় অবিচল ছিলেন।
১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল সকাল। সিলেট মেডিকেল কলেজের আশপাশে তীব্র যুদ্ধ চলছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের একটি আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি কনভয়ের ক্ষয়ক্ষতি হয়। এর প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তানি সেনারা হাসপাতাল ঘিরে ফেলে। তারা ভেতরে ঢুকে অপারেশন থিয়েটার থেকে ডা. শামসুদ্দীন আহমদ ও তার সহকর্মীদের বের করে আনে। তখনো তিনি সাদা অ্যাপ্রোন পরে চিকিৎসা করছিলেন। নিজের পরিচয় দিয়ে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে তারা শুধু চিকিৎসক, কিন্তু কোনো যুক্তিই কাজ করেনি। হাসপাতালের প্রাঙ্গণে তাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। শহীদ হন ডা. শামসুদ্দীন আহমদ, ডা. শ্যামল কান্তি লালা, কোরবান আলী, মাহমুদুর রহমানসহ অনেকে। এই হত্যাকাণ্ড শুধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেই নয়, বরং বিশ্বের যুদ্ধ ইতিহাসেও মানবতার বিরুদ্ধে এক জঘন্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার মতো। এই হত্যাযজ্ঞে থেমে থাকেনি দখলদার বাহিনী। ১৪ এপ্রিল সিলেট মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডা. আবুল ফজল জিয়াউর রহমানকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, যিনি পরে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন। একই সময়ে আরো বহু চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে শহীদ হন।
তবে এই প্রতিষ্ঠানের অবদান শুধু শহীদ হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তৎকালীন সিলেট মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গিয়ে মেডিকেল কোরে যোগ দেন। তারা মেঘালয় ও ত্রিপুরার শরণার্থীশিবির এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে ফিল্ড হাসপাতাল পরিচালনা করেন। অনেকেই অস্ত্র হাতে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন এবং সেক্টর ৪ ও ৫-এ যুদ্ধ করেন।
অন্যদিকে, কলেজের ছাত্র ও কর্মচারীরা গোপনে হাসপাতালের স্টোর থেকে ওষুধ, ব্যান্ডেজ ও সার্জিক্যাল সরঞ্জাম সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। রাতের অন্ধকারে, কারফিউ উপেক্ষা করে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই কাজ সম্পন্ন করা হতো। ধরা পড়লে মৃত্যু ছিল নিশ্চিতÑতবু তারা থেমে থাকেননি।
এই প্রতিষ্ঠানের ত্যাগ শুধু চিকিৎসকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নিম্নপদস্থ কর্মচারী, নার্স এবং সাধারণ ছাত্ররাও শহীদের তালিকায় স্থান পেয়েছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শহীদ মাহমুদুর রহমান, কোরবান আলী এবং অনেকে, যারা মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় বিভিন্নভাবে সহায়তা করে গেছেন।
কারফিউ শিথিল হওয়ার পর শহীদদের মরদেহ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়। আজ সেই স্থানই একটি সংরক্ষিত বধ্যভূমি ও শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ। প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ সেখানে এসে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এই স্মৃতিসৌধ শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি এক ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। সিলেট মেডিকেল কলেজের এই আত্মত্যাগ ছিল সেক্টর-৫-এর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা ও শক্তির উৎস। চিকিৎসা সহায়তা, রসদ সরবরাহ এবং মানবিক সহমর্মিতাÑসব মিলিয়ে এই প্রতিষ্ঠান মুক্তিযুদ্ধে এক অনন্য ভূমিকা পালন করেছে।
আজ স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পরে এই ইতিহাস আমাদের নতুন করে ভাবায়। চিকিৎসকরা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেননি, কিন্তু আহত মানুষের পাশে থেকে যে সাহস, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তা যেকোনো বীরত্বের চেয়ে কম নয়। এই ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা জরুরি। কারণ এখানে আমরা দেখি মানবতার সেবা কখনো ভয়কে স্বীকার করে না আর দায়িত্ববোধের সামনে মৃত্যু পর্যন্ত তুচ্ছ হয়ে যায়।
শেষ কথা : সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñস্বাধীনতা শুধু যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় না, এটি রক্ষা পায় মানবতার মাধ্যমে। যে মানুষগুলো সেদিন হাসপাতাল ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারতেন, তারা থাকলেন। কারণ ভেতরে তখনো কেউ বাঁচতে চাইছিল।
আর সেই থাকার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে গভীর অর্থ।
কিন্তু এই প্রশ্নও থেকে যায়Ñ
এই আত্মত্যাগ কি আমরা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পেরেছি? সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক, শিক্ষার্থী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের এই অসামান্য অবদান এখনো জাতীয় পর্যায়ে প্রাপ্য স্বীকৃতি পায়নি। অথচ তাদের এই আত্মোৎসর্গ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নয়; এটি পুরো জাতির নৈতিক শক্তির প্রতীক। এই আত্মত্যাগের জাতীয় স্বীকৃতি শুধু অতীতের প্রতি সম্মান জানানোই হবে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। তরুণ চিকিৎসক, শিক্ষার্থী ও নাগরিকরা শিখবেÑপেশা শুধু জীবিকা নয়, এটি এক দায়বদ্ধতা; এটি মানবতার সেবা করার এক অঙ্গীকার। একটি জাতি তখনই পরিপূর্ণভাবে বড় হয়ে ওঠে, যখন সে তার সত্যিকারের নায়কদের চিনতে পারে, তাদের সম্মান দিতে পারে এবং তাদের আদর্শকে ধারণ করতে পারে। সেই স্বীকৃতিই হতে পারে আমাদের আগামী দিনের মানবিক, নৈতিক ও দায়িত্বশীল বাংলাদেশ গড়ার এক শক্ত ভিত।
লেখক : প্রিন্সিপাল, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ, সিলেট