হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

জবাবদিহি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা

আলী ওসমান শেফায়েত

প্রতিবছরের মতো এ বছরও ৩ মে বিশ্বজুড়ে ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে’ বা ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস’ পালিত হয়। ১৯৯১ সালে ইউনেসকোর উইন্ডহক ঘোষণার মধ্য দিয়ে যে যাত্রার শুরু, ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের স্বীকৃতিতে তা বৈশ্বিক রূপ পায়। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে দিবসটির বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য—‘শান্তিময় ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ’। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শান্তির এই ভবিষ্যৎ কি আদৌ সম্ভব, যদি সংবাদপত্রের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ থাকে? বাংলাদেশে দিবসটির স্থানীয় প্রতিপাদ্য ‘জবাবদিহি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম’ নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবতার চিত্রটি আজও অমীমাংসিত এক গোলকধাঁধায় বন্দি।

প্যারিসভিত্তিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) ২০২৬ সালের যে বৈশ্বিক গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচক প্রকাশ করেছে, তাতে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫২তম। গত বছর এ অবস্থান ছিল ১৪৯তম। অর্থাৎ এক বছরে আমাদের তিন ধাপ অবনতি হয়েছে। যদিও ২০২৪ সালের ফ্যাসিবাদী শাসনের শেষ সময়ের ১৬৫তম অবস্থানের তুলনায় আমরা এখনো ১৩ ধাপ এগিয়ে আছি, তবে এই সাম্প্রতিক অবনতি আমাদের জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। প্রতিবেশী ভারত (১৫৭) ও পাকিস্তান (১৫৩) আমাদের পেছনে থাকলেও এই তুলনামূলক বিচারে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। কারণ, আরএসএফের মতে বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা গত ২৫ বছরের মধ্যে এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বাংলাদেশের সংবাদপত্রের স্বাধীনতার লড়াইটি ঐতিহাসিক। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই প্রতিটি শাসনব্যবস্থায় গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন মাত্র চারটি পত্রিকাÑইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ অবজারভার ও বাংলাদেশ টাইমস—ছাড়া সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়ার সেই কালো অধ্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন শাসনামলে প্রেসের টুঁটি চেপে ধরার অপপ্রয়াস আমরা দেখেছি। তবে সংবাদপত্রের প্রকৃত বিকাশে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং পরে খালেদা জিয়ার শাসনকালকে উদার ও গণতান্ত্রিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন সেসব অর্জনকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়।

বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ওপর যে কালো মেঘ জেঁকে বসেছিল, তার রেশ আজও কাটেনি। ৫৯ সাংবাদিক খুন হয়েছেন এ সময়ে; যার মধ্যে সাগর-রুনি দম্পতি হত্যার বিচার আজও হয়নি।

শুধু সংবাদপত্র নয়, ফ্যাসিবাদী সরকার সম্প্রচারমাধ্যম বা টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর ওপরও খড়গহস্ত চালিয়েছিল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণবিপ্লবের পর প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গণমাধ্যমের হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারে কাজ শুরু করে। সেই সময় সাংবাদিকরা অভূতপূর্ব স্বাধীনতা ভোগ করেছেন। ২০২৫ সালের সূচকে বাংলাদেশ এক লাফে ১৬ ধাপ এগিয়ে ১৪৯তম স্থানে উঠে এসেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা তিন ধাপ পিছিয়েছি।

গত মাসেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুদিনে ১২ সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন। ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক কর্মীদের অসহিষ্ণুতা ও পেশিশক্তির দাপট যে কমেনি, এ ঘটনা তারই প্রমাণ। এ ধরনের বিচারহীনতামুক্ত সাংবাদিকতার পথকে বারবার রুদ্ধ করছে।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় পরাধীনতার আসল রোগটি শুধু আইনি নয়, বরং অর্থনৈতিকও। বেসরকারি খাতের অধিকাংশ বড় গণমাধ্যম এখন গুটিকয়েক করপোরেট ব্যবসায়ীর মালিকানাধীন। তারা গণমাধ্যমকে জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে নয়, বরং নিজেদের ব্যবসার সুরক্ষা ও সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। ফলে সম্পাদকীয় স্বাধীনতার চেয়ে করপোরেট স্বার্থই সেখানে মুখ্য।

গণমাধ্যমকে সমাজের দর্পণ এবং গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে দেখা হয়। এই স্তম্ভটি তখনই মজবুত থাকে, যখন তা ক্ষমতাবানদের প্রভাবমুক্ত বা স্বাধীন, অন্যদিকে জনস্বার্থ রক্ষায় সমানভাবে দায়িত্বশীল।

‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস’-এ আমাদের করণীয় স্পষ্ট। ডিজিটাল ও সাইবার জালের মতো কালাকানুন থেকে মুক্তি পেতে হলে ঐক্যবদ্ধ লড়াই জারি রাখতে হবে। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতাকে নিছক প্রতিপক্ষ না ভেবে রাষ্ট্রের সংশোধনী শক্তি হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা রাজনৈতিক দলগুলোকে গড়ে তুলতে হবে। সাংবাদিকতার সুরক্ষা এবং অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করাই হোক এবারের অঙ্গীকার। সত্য এবং সত্যবাদীরা সুরক্ষিত থাক—এটাই হোক আমাদের শপথ।

লেখক : শিক্ষক

মা দিবস: ভালোবাসা, ইতিহাস ও আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক

কলকাতায় হিন্দুত্ববাদ

জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে তরুণদের দায়িত্ব

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কি বিকল্প নেই

তেল রাজনীতির মেরূকরণ

নতুন সংসদে কেন রাজনীতির পুরোনো বিতর্ক?

যুক্তরাষ্ট্রকে কি বিশ্বাস করা যায়

ঐক্যই সার্বভৌমত্বের শক্তি

অপরাজেয় ইরান ও মুসলিম নেতৃত্ব

নদী-জলাশয় বাঁচলেই ঢাকা বাঁচবে