মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত অবসানে চলমান পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান শান্তি উদ্যোগ এ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকার ও তার বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলায় জেলে যাওয়া থেকে রক্ষা পেতে তার আরো যুদ্ধের প্রয়োজন। কাজেই এই ‘শান্তি আলোচনা’ যেন কাউকে বোকা না বানায়। কেননা এই আলোচনা থেকে কোনো শান্তি আসবে না। বড়জোর, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত আমরা একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতি দেখতে পারি।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই নেতানিয়াহুর প্রধানমন্ত্রী পদে টিকে থাকার এবং ১০ বছরের জন্য কারাগারে পচে না মরার জামিন ও একমাত্র রক্ষাকবচ। কাজেই নেতানিয়াহু এতটা বোকা নন, তিনি তার নিজের হাতে গড়া একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্টের কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে দেবেন। অন্যদিকে, রিপাবলিকান পার্টি নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস নিয়ে চলতে, অভিশংসিত না হতে এবং পদে টিকে থাকতে ট্রাম্পেরও নেতানিয়াহুকে প্রয়োজন, যাতে তিনি এপস্টাইন ফাইলসের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো জনসমক্ষে না আনেন।
বর্তমানে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প দুজনেই নিজ নিজ দেশে জানগণের চাপের মুখে আছেন। একটি বর্ধিত যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া এবং মার্কিন অর্থনীতির ওপর মুদ্রাস্ফীতির চাপ কমানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ইতোমধ্যে জনগণের যে তীব্র চাপ রয়েছে, তা খুব সহসাই কমে যাবে না। মনে হচ্ছে, শুধু ডেমোক্রেটিক পার্টিই তাদের রাজনৈতিক অসাড়তা থেকে জেগে উঠছে না, বরং রিপাবলিকান পার্টিও লক্ষ্য করেছে, জায়নবাদের গভীর প্রভাবাধীন থাকাটা তাদের নিজেদের এবং দেশের জন্য চিরদিনের বা অনন্তকালের জন্য লাভজনক নয়।
এটা উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ ছিল না
উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতা ও গণমাধ্যমকর্মীরা এটা বুঝে গেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হওয়ার চেয়েও খারাপ হলো দেশটির বন্ধু হওয়া। কিছুদিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক সৌদি কর্মকর্তার একটি উক্তি ভাইরাল হয়ে যেখানে তিনি বলেছেন, তাদের তেল শোধনাগারে ইরান হামলা চালানোর পর তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাহায্য চেয়েছিল। কিন্তু মার্কিন কর্মকর্তারা সাড়া দেওয়ারও প্রয়োজন মনে করেননি। সৌদি কর্মকর্তাটি বলেন, ‘এখন যখন আমরা ইরানের সঙ্গে শান্তি স্থাপন ও উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছি, তখন আমেরিকা ইচ্ছাকৃতভাবে এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ঘাত করছে।’ কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কেন এটা করে? এর কারণ হিসেবে সৌদি কর্মকর্তাটি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ চায়, ‘কারণ ইসরাইল যুদ্ধ চায়, সংঘাত ছাড়া তারা টিকে থাকতে পারে না।’
ট্রাম্প এবং তার কুকুরের মতো বাধ্য অনুচররা ইসরাইলের সমর্থনে একটি ইরানি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প, সামরিক স্থাপনা এবং পারমাণবিক স্থাপনার ওপর গোলাবর্ষণের জন্য তাদের উৎক্ষেপণ মঞ্চ হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোকে ব্যবহার করেছে। এর বিনিময়ে উপসাগরীয় আরবরা কী পেল?
আরব প্রতিবেশীদের এটি জানা উচিত ছিল, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে তাদের শুধু ইসরাইলকে একটি স্বাভাবিক দেশ ও একটি বর্ণবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করতে রাজি করানোই যথেষ্ট ছিল। যদি ইসরাইলকে ১৯১৭ সালে ফিলিস্তিনের আদিবাসী আরব জনগণের সব জমি, শহর, নগর, খামার এবং বাড়িঘর চুরি করার জায়নবাদী উদ্দেশ্য ত্যাগ করতে বাধ্য করা যেত, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো যুদ্ধ হতো না এবং কোনো নাকবা (‘মহাবিপর্যয়’, যা ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনিদের ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ও সম্পত্তিচ্যুতিকে বোঝায়) হতো না। ফিলিস্তিন একটি বহু-জাতিগত ও বহু-সাংস্কৃতিক সমাজ হিসেবেই থেকে যেত। আত্মরক্ষার জন্য কিংবা ইসরাইলকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাও তৈরি হতো না।
ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং জেল থেকে দূরে থাকার জন্য নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত ধূর্ততা তাকে মসিহবাদী জায়নবাদের সঙ্গে অন্তহীন যুদ্ধের ধারণার অংশীদার করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নতুন করে আঁকার নব্য রক্ষণশীলদের কদর্য, ভয়াবহ পরিকল্পনার জন্যও এক নরকীয় জোট তৈরি করে দিয়েছে। নব্য রক্ষণশীলরা যে বোকার স্বর্গের স্বপ্ন দেখে, তা আসলে তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় অন্তহীন অভ্যুত্থান, শাসন পরিবর্তন এবং তাদের পুতুলদের উসকানি দেওয়ার পাইকারি উত্তর।
ট্রাম্প ভেবেছিলেন, এপস্টাইন ফাইলগুলো বিস্মৃত হয়ে যাবে এবং নেতানিয়াহুর হাতে সেগুলো পড়বে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, পরিস্থিতি তার প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোয়নি। বরং হামাস, হিজবুল্লাহ, হুতি ও পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে ইরানের সঙ্গে কথা বলার পরিবর্তে ট্রাম্পকে দুবার ইরানের ওপর বোমা ফেলতে হয়েছে। এখন পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা থেকে চূড়ান্ত ফল কী আসবে বা স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে কি না, তা কারোরই জানা নেই। ইসলামাবাদ আলোচনা থেকে স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদি কোনো শান্তির আশা করার মতো পরিস্থিতি বাস্তবিকভাবেই দৃশ্যমান হচ্ছে না। যত দিন ট্রাম্প নেতানিয়াহুর একজন জিম্মি সমর্থক হয়ে থাকবেন এবং যত দিন নেতানিয়াহু নব্য রক্ষণশীল ও জায়নবাদীদের নোংরা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা করবেন, ততদিন আমেরিকান জনগণের, বিশেষ করে পশ্চিমা সমাজের আই-জেন প্রজন্মের এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরব ও ইহুদিদের জন্য পরিত্রাণ লাভের একমাত্র পথ হলো ‘এরেৎজ ইসরাইল’ (ইসরাইলের ভূমি) পুনর্গঠন করা। কিন্তু আমাদের কি সত্যিই এতটা পেছনে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন আছে?
জায়নবাদ থেকে উদ্ভূত সমস্যা
আমরা জানি শার্টের প্রথম বোতামটি ভুলভাবে লাগালে কী হয়। সোভিয়েত নেতা ভ্লাদিমির লেনিন ১৯০১ সালে একটি প্রবন্ধে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কোথা থেকে শুরু করা যায়’, যা পরে রুশ সাম্রাজ্য এবং সমগ্র ইউরোপের ইহুদিদের ফিলিস্তিনে অভিবাসনের জন্য একটি পথনির্দেশিকা হয়ে ওঠে।
ইহুদিরা বৈষম্য থেকে (এবং রাশিয়ায় মৃত্যু থেকে) একটি আশ্রয় খুঁজছিল। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ‘রাজনৈতিক জায়নবাদ’ আত্মনিয়ন্ত্রণের একটি জাতীয় আন্দোলন হিসেবে রূপ নেয়। এর ভিত্তি ছিল এই ধারণা যে, সমগ্র ইহুদি সম্প্রদায় একটি একক জাতীয় সত্তা এবং এই জাতীয় সত্তার তার পৈতৃক মাতৃভূমি এরেৎজ ইসরাইলের (ইসরাইলের ভূমি) ওপর মালিকানার দাবি রয়েছে। কিন্তু এ দুটি ধারণাই ধর্মীয় কল্পকাহিনির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। বাস্তবতা হচ্ছে—ইহুদি ধর্ম নিছকই একটি ধর্ম, এর কোনো জাতীয় পরিচয় ছিল না এবং এই ধর্মে বিশ্বাসীদের কোনো পৈতৃক মাতৃভূমিও ছিল না।
এ কারণেই আজ ইসরাইলের ইহুদিদের মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ নিজেদের জায়নবাদী হিসেবে পরিচয় দেয়। ইহুদি ধর্মের একজন সত্যিকারের অনুসারী কখনোই হত্যা, চুরি এবং বিশেষভাবে ফিলিস্তিনিদের গণহারে বাস্তুচ্যুতি ও সম্পত্তি কেড়ে নেওয়ায় বিশ্বাসী হতে পারেন না। এ কারণেই ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করার জন্য ১৯৩৭ সালের সেই পরিকল্পনা, যা কখনো বাস্তবায়িত হয়নি, তার আদলে ‘ইসরাইলকে নতুন করে গড়া’ প্রয়োজন।
প্যালেস্টাইন ম্যান্ডেট (১৯২০-৪৮) ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের লীগ অব নেশনস প্রদত্ত একটি ব্রিটিশ প্রশাসনিক ব্যবস্থা, অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর যার মাধ্যমে ফিলিস্তিন অঞ্চলটি পরিচালনার দায়িত্ব যুক্তরাজ্যকে দেওয়া হয়েছিল। এই ম্যান্ডেট অনুযায়ী ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য ‘জাতীয় আবাস’ প্রতিষ্ঠা এবং স্থানীয় আরব জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার শর্ত ছিল। কিন্তু ইউরোপ, রাশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা কট্টরপন্থি জায়নবাদী সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা ও তাদের বাড়িঘর ও জমি দখল করতে থাকে।
এই পরিস্থিতিতে সেই ম্যান্ডেটের ব্রিটিশ হাইকমিশনার স্যার হ্যারল্ড ম্যাকমাইকেল লন্ডনে পাঠানো একটি ব্যক্তিগত চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আমি বিভাজন ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প দেখি না। ...ইহুদি এবং আরব উভয়ই তাদের নিজ নিজ ভূখণ্ডের মালিকানা উপভোগ করবে।’ কিন্তু লন্ডন ও ইউরোপের অন্যান্য রাজধানী কিংবা ওয়াশিংটন কারোরই জায়নবাদী সন্ত্রাসীদের ফিলিস্তিন থেকে বিতাড়িত করার এবং ইহুদিদের জন্য একটি স্বদেশভূমি তৈরি করা থেকে বিরত রাখার কোনো ইচ্ছাই ছিল না।
বর্তমানে নেতানিয়াহু পরবর্তী যুদ্ধের জন্য ও ইসরাইলের গণতন্ত্রকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য তার মনোযোগ নিবদ্ধ করেছেন। তিনি এবং তার পোষা চাটুকাররা যুদ্ধ শেষ না করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। কারণ যুদ্ধই তাদের বিরোধীদের দমন করার নিয়মিত উপায় হয়ে উঠেছে। সে জন্যই দুই যুদ্ধবাজ নেতা ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু আদালতের ওপর তাদের সরকারের আক্রমণ এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর চাপ আরো বিস্তৃত করছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক শান্তি ও শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হলে সমস্যাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতে হয়, যা ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ক্ষেত্রে অনেক বেশি প্রযোজ্য।
ডেইলি সাবাহ অবলম্বনে মোতালেব জামালী