জন্ম থেকেই বিদেশি শক্তির মদতে এ ভূখণ্ডে ‘বাংলাদেশবিরোধী’ এমন একটি শ্রেণি সৃষ্টি হয়েছে, যারা শুরু থেকেই এদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি, অকার্যকর ও ব্যর্থ রাষ্ট্র তথা আধিপত্যবাদীদের করদ রাজ্য প্রমাণে মরিয়া। সেই স্বার্থান্ধ কুখ্যাত চক্রের ষড়যন্ত্রের ফলে এদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নানাভাবে বারংবার হুমকির মুখে পড়েছে। অবৈধভাবে গোপন আঁতাতের মাধ্যমে পেছনের দরজা দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের ঘটনা ঘটেছে, যার কারণে ৫৫ বছরেও আমরা, এই জাতি, শান্তিপ্রিয় জনতা স্বাধীনতার সুফল পাইনি। সেই আগ্রাসী শক্তির প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তাদের পেইড এজেন্টরা ইতিহাস বিকৃতি ও অপরাজনীতির মাধ্যমে এ জাতিকে বিভক্তির চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে। দলান্ধতার কারণে রাজনীতিতে স্যাবোটাজ একটি মুখ্য হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।
রাষ্ট্রের বৃহত্তর প্রয়োজনে স্পর্শকাতর ও জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জাতীয় ঐক্যের তোয়াক্কা না করে আমাদের রাজনীতিকরা বারবার অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রতিপক্ষ তথা ভিন্নমত দমনে সর্বশক্তি নিয়োগে রাষ্ট্রযন্ত্রের দ্বিধা নেই। ফলত, হানাহানি, খুনোখুনি ও নৈরাজ্য সার্বিক পরিস্থিতিকে অনিরাপদ ও আতঙ্কিত করে তোলে। এ অবস্থায় সুযোগসন্ধানী ও সুবিধাভোগী ভিনদেশি রাজনৈতিক প্রভুদের আমাদের ওপর দাদাগিরির পথ প্রশস্ত হয়। তারাই এদেশের নেতৃত্ব ঠিক করে দেওয়ার মূল ক্রীড়নক হয়ে ওঠে। আমাদের সংবিধান তাদের মতে রচিত বা সংশোধিত হয়। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি তাদের স্বার্থরক্ষক। আমাদের জাতীয় সংগীত যেন তাদেরই বন্দনাগীত। বাঙালির চিরায়ত সাংস্কৃতিক স্বকীয়তার ওপর তাদের নগ্ন থাবার ছোবল।
রাষ্ট্রীয় অরগানগুলোর গঠন, বিন্যাস ও পরিচালনা নীতি তাদের ক্যাটেলগে ডিজাইন করা। আমাদের নিউজ এজেন্সি তথা গণমাধ্যমগুলোর মালিক-মহাশয়রা তাদের পরীক্ষিত সুহৃদ। দেশপ্রেমের প্রশ্নে চৌকস ও সমুন্নত ভূমিকা পালনকারী গর্বিত নিরাপত্তা বাহিনীর একাংশকে নগ্ন দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে কীভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে, সে কথা না হয় বাদ দিলাম। মানে সর্বত্র আগ্রাসন, দুর্বৃত্তায়ন ও আধিপত্যবাদের নিকৃষ্টতম উদাহরণ। আমাদের মাঝে ঘাপটি মেরে থাকা বাংলাদেশের স্বাধীন সত্তা অস্বীকারকারী কালো শকুনদের কারণে এটি সম্ভব হয়েছে। যদিও তারা এদেশেরই ভূমিপুত্র। এদের কারণেই যুগে যুগে বাকশাল, স্বৈরাচার ও অগণতান্ত্রিক শাসন বিস্তার লাভ করেছে। কখনো স্বৈরতান্ত্রিক গণতন্ত্র, আবার কখনো গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র এদেশের শাসনতান্ত্রিক ভিতকে নাস্তানাবুদ করে দিয়ে সার্বিক অগ্রযাত্রায় পশ্চাৎপদতার নজির সৃষ্টি করে, যার সর্বশেষ উদাহরণ হলো ফ্যাসিবাদের দীর্ঘ অপশাসন।
এসব অপশক্তি বা অপনেতৃত্বের উৎখাতে অতীতে বহু আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। ধর্ম-দল, মত-পথ, লিঙ্গ-শ্রেণি ও বয়স নির্বিশেষে স্বাধীনচেতা ও শান্তিকামী জনগণ এর জন্য কম ত্যাগ স্বীকার করেনি। কিন্তু নেতৃত্বের কৌশলগত ভুলের কারণেই হোক বা শত্রুপক্ষের সুনীল ষড়যন্ত্রের কারণেই হোক, যৌক্তিক পরিণতির পর্যায়ে পৌঁছার আগেই প্রতিটি আন্দোলনের হালখাতা স্বার্থান্বেষী ও কুচক্রী গোষ্ঠীবিশেষের কুক্ষিগত হয়ে যায়, যার ফলে জনপদের মুক্তিকামী মজলুম জনগণ বারংবার প্রতারিত হতে থাকে।
অবশেষে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট (আন্দোলনের ক্যালেন্ডারে ৩৬ জুলাই) ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণে স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লবের দাবানলের অগ্নিস্ফুলিঙ্গে ফ্যাসিস্ট মসনদের পতন ঘটে। জনতার বিজয়ে সর্বত্র খুশির আমেজ বয়ে যায়।
এ প্রেক্ষিতে নব আকাঙ্ক্ষা, নব বন্দোবস্তের বাংলাদেশ বিনির্মাণে ‘বাংলাদেশপন্থা’ ধারণার উন্মেষ ঘটে। ‘বাংলাদেশপন্থি’ ও ‘বাংলাদেশবিরোধি’ গোষ্ঠীর বিভেদ প্রকাশ্যে আসে। বাংলাদেশপন্থার ধারক হিসেবে পরিবর্তনকামী গোষ্ঠীর অবস্থান ও ভূমিকা নবরূপে জানান দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা অন্তত ২০ বছর আগে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রখ্যাত কলামিস্ট ও বুদ্ধিজীবী শ্রদ্ধেয় মোবায়েদুর রহমানের একটি প্রবন্ধের বিষয় স্মৃতিতে উঁকি দিল। শিরোনাম ছিল ‘বড় বেশি প্রয়োজন একটি বাংলাদেশি আল জাজিরা ও একজন বাংলাদেশি মাহাথিরের’। এর সূত্র ধরে বলছি, দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহচিত্তে আমাদের বাংলাদেশপন্থার ধারক হতে হবে। খাঁটি বাংলাদেশপন্থি হিসেবে গভীর আত্মবিশ্বাসের কষ্টিপাথরে স্বদেশবোধে উদ্বুদ্ধ হতে হবে এবং এর মাধ্যমে অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দৃঢ়চিত্তের প্রকাশ ঘটানো অতি জরুরি।
সুতরাং বংশানুক্রমিকভাবে জন্মসূত্রে বাংলাদেশি হিসেবে নয়, প্রকৃত দেশপ্রেমে দীক্ষিত নাগরিক হিসেবে স্বাধীন-সার্বভৌম, নিরাপদ ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়তে বিশেষত সম্ভাবনাময় তরুণসমাজকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। আর এজন্য ১৬২ শিশুসহ সহস্রাধিক শহীদ ও অগণিত গুরুতর আহত ছাত্র-জনতার রক্তের চড়া মূল্যে অর্জিত চব্বিশের ঐতিহাসিক পট পরিবর্তনের ধারায় মজবুত ও টেকসই পদ্ধতির অবলম্বনে জাতির সামগ্রিক পুনর্গঠনে উদ্যোগী হতে হবে। তা না করতে পারলে পুরো শতাব্দী ধরে এর খেসারত দিতে হতে পারে; বিতাড়িত শক্তির বিপজ্জনক পুনর্বাসন ঘটতে পারে। এ জাতির কপালে আজীবন গোলামির জিঞ্জির রচিত হতে পারে। মনে রাখতে হবে, প্রচলিত ভঙ্গুর, ঘুণে ধরা ও কলুষিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান রেখে রাষ্ট্রের আমূল সংস্কার তথা কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণ অসম্ভব বটে। তাই সৃজনশীল ও আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তা, বুদ্ধিবৃত্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত কর্মপরিকল্পনা, ক্ষুরধার লেখনী ও প্রচারণার মাধ্যমে ব্যাপক পরিসরে জনমত তৈরি করে ‘বাংলাদেশপন্থা’ ধারণাকে জীবনঘনিষ্ঠ করে তুলতে হবে।