হোম > পাঠকমেলা

ভোরের স্নিগ্ধতা ও দুপুরের রৌদ্রতাপ

নজরুল-রবীন্দ্রনাথ

মিথিলা জসিম তন্নি

বাংলা ভাষা যখন নিজের সৌন্দর্য খুঁজে পেতে শেখেনি, বাংলা সাহিত্য যখন নিজস্ব আকাশের জন্য অপেক্ষা করছিল, ঠিক তখনই বাংলার মাটিতে জন্ম নিয়েছিলেন দুই মহামানব—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম। একজন শব্দকে শিখিয়েছেন অনুভবের গভীরতা, অন্যজন শব্দকে দিয়েছেন বিদ্রোহের অগ্নিশিখা। একজনের কলমে ছিল শান্ত নদীর স্রোত, অন্যজনের কণ্ঠে ছিল বজ্রের গর্জন ।

রবীন্দ্রনাথ যেন বাংলার ভোরবেলা। তার কবিতা পড়লে মনে হয় পৃথিবী যেন হঠাৎ সুন্দর হয়ে ওঠে। আরো মনে হয় শিশিরভেজা ঘাসের উপর দিয়ে কেউ নিঃশব্দে হেঁটে যাচ্ছে। তার গানে প্রেম আছে, প্রকৃতি আছে, বিষাদ আছে, আবার মানবতার গভীর আহ্বানও আছে। তার শব্দে আছে নদীর স্রোত, শিউলি ঝরা ভোর, শ্রাবণের বৃষ্টি, নিঃশব্দ বিকালের দীর্ঘশ্বাস।

তার লেখনী শিখিয়েছে—কীভাবে সৌন্দর্যকে অনুভব করতে হয়, কীভাবে দুঃখের মাঝেও আলো খুঁজে নিতে হয়।

অন্যদিকে কাজী নজরুল ইসলাম যেন আগুনের ভেতর থেকে জন্ম নেওয়া এক দুর্বার উচ্চারণ। তার শব্দে ছিল বিদ্রোহ, তার কণ্ঠে ছিল শৃঙ্খল ভাঙার আহ্বান। তার কবিতা পড়লে মনে হয় সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়ার শক্তি হঠাৎ করেই বুকের ভেতর জন্ম নিচ্ছে। তিনি কেবল বিদ্রোহের কবি নন, তিনি মানুষের মুক্তির কবি। তিনি সেই কণ্ঠস্বর যিনি ধর্মের দেয়াল ভেঙে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শিখিয়েছেন। তার কলম অন্যায়ের বিরুদ্ধে জ্বলে উঠেছিল আগুন হয়ে। তার কলমে যেমন বজ্রের গর্জন আছে, তেমনি আছে প্রেমিক হৃদয়ের কান্নাও। তাই কাজী নজরুল ইসলামকে শুধু বিদ্রোহী কবি বললে ভুল হবে, তিনি একই সঙ্গে প্রেম, দ্রোহ, সাম্য ও মানবতার কবি। তার প্রেমের গান, ইসলামি সংগীত, শ্যামাসংগীত কিংবা গণমানুষের কথা— সবকিছুতেই ছিল এক অনন্য মানবিক সৌন্দর্য।

এই দুই কবির সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো, তারা পুরোনো হন না। সময়ের সঙ্গে পৃথিবী বদলায়, মানুষের রুচি বদলায়, ভাষার ধরন বদলায়; কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গান শুনলে আজও হৃদয় নরম হয়ে আসে, নজরুলের কবিতা পড়লে আজও রক্ত গরম হয়ে ওঠে। কারণ তারা কেবল সাহিত্য সৃষ্টি করেননি, তারা মানুষের অনুভূতির ভাষা তৈরি করেছিলেন। আজকের এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যস্ত সময়ে মানুষ হয়তো বই হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকে না, কিন্তু কোনো এক বৃষ্টিভেজা বিকালে অজান্তেই হৃদয়ে গুনগুন করে ওঠে রবীন্দ্রসংগীত। আবার অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মনে সাহস জোগায় নজরুলের উচ্চারণ। এখানেই তাদের অমরত্ব।

নজরুল জয়ন্তী কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়। আমাদের শিকড়কে স্মরণ করার দিন। এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাংলা ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি আমাদের অনুভূতির আশ্রয়, আত্মপরিচয়ের ঠিকানা। আর সেই ঠিকানাকে বিশ্বদরবারে মর্যাদা দিয়েছেন এই দুজন।

আজও যখন অন্যায়ের কাছে অনেকেই নীরব হয়ে যান, তখন নজরুল শেখান মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস।

হে মহামানব,

তোমাদের গান আজও মানুষের নিঃসঙ্গ রাতের সঙ্গী হয়। তোমাদের কবিতা আজও নতুন প্রজন্মকে শেখায় ভালোবাসা, মানবতা আর প্রতিবাদের অর্থ।

হে মহাগুরু,

তোমাদের জন্মতিথিতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও অফুরন্ত ভালোবাসা। তোমাদের কলমে যে বাংলা জন্ম নিয়েছিল, সেই বাংলা আজও আমাদের স্বপ্ন দেখায়, সাহস জোগায়, কাঁদায় আর জাগায়। তোমাদের সৃষ্টি কেবল সাহিত্য নয়, এটি বাঙালির আত্মার আয়না। জন্মজয়ন্তীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে তাই শুধু শুভেচ্ছা নয়, নতুন করে তোমাদের আদর্শে ফিরে যাওয়ার অঙ্গীকারও রইল।

লেখক : শিক্ষার্থী, বাংলা, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা

mithilajasim@gmail

সৃষ্টি সুখের উল্লাসে চট্টগ্রাম পাঠকমেলা

নরসিংদীতে ‘আমার দেশ’ আন্তঃকলেজ বিতর্ক প্রতিযোগিতা

সীতাকুণ্ড পাঠকমেলার নতুন উদ্যোগ

রোদের শহরে এক বৈশাখের সকাল

সময়ের ধুলায় ঢাকা জাগ্রত বিদ্রোহ

উৎকর্ষের স্বপ্ন নিয়ে

অদম্য কুড়িগ্রাম গ্রন্থাগার ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র

পাঠকমেলার সঙ্গে দেড় যুগ

ইতিহাসের ছায়ায় তরুণ লেখকদের ইফতার

গবিতে পাঠকমেলার যাত্রা শুরু