ইতিহাসের পাতা উল্টালে বহু বীরের নাম খুঁজে পাই। কিছু নাম সময়ের ধুলোয় চাপা পড়ে যায়, স্মৃতির প্রান্তে ঠাঁই নেই। বাংলার আত্মমর্যাদার এমনই এক নীরব অভিভাবক মুসা খান। মুসা খান এমন এক নাম, যা ইতিহাসের পাতায় বড় করে লেখা হয়নি, কিন্তু তার জীবন আমাদের শেখায় সাহস, সংগ্রাম ও প্রতিরোধ। মুসা খানের প্রতিরোধ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা সহজে অর্জিত হয় না; এটি সাহস, ঐক্য আর আত্মত্যাগের ফসল।
ষোড়শ শতকের শেষভাগে বাংলা ছিল রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দু। দিল্লির মোগল সাম্রাজ্য বাংলাকে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের অধীনে নিতে বদ্ধপরিকর। সে সময়ে গড়ে ওঠে বারো ভূঁইয়ার ঐতিহাসিক প্রতিরোধ। এ প্রতিরোধের প্রধান নেতৃত্বে ছিলেন ঈসা খান; তার মৃত্যুর পর দায়িত্ব এসে পড়ে বড় ছেলে মুসা খানের ওপর। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই নেতৃত্ব কেবল পারিবারিক ছিল না, ছিল আদর্শ ও চেতনার ধারাবাহিকতা। অসাধারণ সংকল্প ও দৃঢ় মনোবল তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। শিক্ষার প্রতি তার ভালোবাসা, সামাজিক অন্যায়ের প্রতি প্রতিরোধ মনোভাব এবং জাতীয় অধিকার রক্ষার অদম্য লড়াই তাকে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করে তোলে। মুসা খান সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন—নদীমাতৃক বাংলার ভূগোলকে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৬১১ সালে তিনি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, বাংলা মাথা নত করতে জানে না সহজে।
আজ হয়তো পাঠ্যবইয়ে তার নাম ছোট হয়ে গেছে, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তিনি এক অমর প্রতিরোধের প্রতীক। আমরা ইতিহাসের বইগুলোয় দিল্লিকেন্দ্রিক মোগল সাম্রাজ্যের (আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান) ইতিহাস যতটা ঘটা করে পড়ি, বাংলার স্থানীয় সুলতান-সর্দার-জমিদার-নবাবদের প্রতিরোধের কথা ততটা পড়ি না। মুসা খান ছিলেন সেই বীর, যিনি মোগলদের বিরুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতার শেষ প্রদীপটি জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু বিজয়ী মোগলদের ইতিহাস লিখতে গিয়ে দরবারি ঐতিহাসিকরা মুসা খানকে কেবল একজন ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে চিত্রিত করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের পেছনে মুসা খানের মসজিদ ও কবর আজ জীর্ণ অবস্থায় টিকে আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে হওয়া সত্ত্বেও অনেকেই জানে না, এটি বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বীরের সমাধি। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাগুলো অবহেলায় পড়ে থাকায় নতুন প্রজন্মের কাছে তার নাম পৌঁছাচ্ছে না।
মুসা খানের বাবা ঈসা খানের বীরত্ব এবং মানসিংহের সঙ্গে তার যুদ্ধের কাহিনি (বিশেষ করে লোকগাথা ও নাটকে) এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়েছে যে, তার যোগ্য পুত্র মুসা খানের লড়াই অনেকটা তার ছায়ায় ঢাকা পড়ে গেছে। অথচ মুসা খান ১৫৯৯ থেকে ১৬১০ সাল পর্যন্ত মোগল নৌবাহিনীকে নাজেহাল করে রেখেছিলেন।
মুসা খান যখন মোগল সুবেদার ইসলাম খার কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন, তখন বলেছিলেন, তিনি রাজ্যের লোভে নয়, বরং বাংলার স্বাধীনতা (আজাদি) রক্ষার জন্যই লড়াই করেছিলেন।
সম্প্রতি বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ও আমার দেশ পাঠকমেলা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মিলিত উদ্যোগে একটি আলোচনার আয়োজন করা হয়। আয়োজনটি শুরু হয় মুসা খান মসজিদে জুমার নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়ে। নামাজ শেষে ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কবর জিয়ারত করা হয় এবং আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় মুসা খান মসজিদের সামনে মুসা খানের অবহেলিত কবর প্রাঙ্গণে। সভায় প্রধান আলোচক ছিলেন শাহাদত ইউসুফ, কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা ও আমার দেশ পাঠকমেলা। আরো উপস্থিত ছিলেন আমার দেশ পাঠকমেলার কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও বিটিসিএলএফ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার বর্তমান উপদেষ্টা মো. খালেদ সাইফুল্লাহ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন। সদস্যদের মধ্যে ছিলেন শাহানুর আক্তার সেতু, আকবর শান্ত ও অন্যান্য সদস্য।
শিক্ষার্থী, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ