হোম > পাঠকমেলা

রোদের শহরে এক বৈশাখের সকাল

নূর সানজিদা স্মৃতি

রাজশাহী শহরে বৈশাখ আসে অন্যভাবে; শুধু নতুন বছর হয়ে নয়—রোদের এক অন্যরকম তেজ নিয়ে, মাটির বুক চিরে ওঠা গরম হাওয়া নিয়ে। বরেন্দ্রের এই প্রান্তরে গ্রীষ্ম আসে আগেভাগে যেন তাড়া আছে তার। বৈশাখ আসার আগেই কৃষ্ণচূড়া ফোটে আগুনলাল হয়ে, রাধাচূড়া ছড়ায় হলুদ আভা, আর শিমুলের তুলো উড়ে বেড়ায় বাতাসে। ভোরের হাওয়ায় মিশে থাকে ফুলের মিষ্টি গন্ধ আর মাটির স্নিগ্ধ ঘ্রাণ। এই গন্ধটুকুই যেন বলে দেয় বৈশাখ এসে গেছে। বৈশাখের ভোরেই আকাশ হয়ে যায় তামাটে। রোদ নামে সোজা যেন কোনো আড়াল নেই । এই শহরে বসন্তকে বিদায় দেওয়ার আগেই গ্রীষ্ম এসে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে।

ছোটবেলায় সেই রোদও লাগত মিষ্টি। মনে হতো এই তাপ হলো বৈশাখের পূর্ণতার বার্তা । পহেলা বৈশাখের ভোরে ঘুম ভাঙত এক অদ্ভুত উত্তেজনায়। মনের ভেতর যেন প্রজাপতি উড়ত। জানালা দিয়ে দেখতাম রাস্তায় সাদা আলো পড়ে চকচক করছে, বাড়ির সামনের কৃষ্ণচূড়া গাছ ভরে ফুল ধরেছে, দূরে কোথাও কোকিল ডাকছে একটানা।

সকালে মা পান্তা সাজাতেন। পাতে থাকত নানা রকম ভর্তা, পাশে ইলিশ মাছ ভাজা। মা আমাকে খুব গুছিয়ে খাইয়ে দিতেন। বৈশাখের সকালে এই খাওয়াটা ছিল আমাদের উৎসবের প্রথম আয়োজন। সেই সাদামাটা পাতে কী যে তৃপ্তি ছিল—এখন ভাবলে মন ভরে যায়। খাওয়া শেষ হতেই বাবা হাসিমুখে বলতেন, ‘আজকে আমরা বেড়াতে যাব।’ এই একটা বাক্যের জন্য সকাল থেকে অপেক্ষায় থাকতাম। আমি আর বাবা দুজনেই লাল-সাদা পোশাকে বের হতাম মেলার উদ্দেশে । বাবার হাত ধরে রাস্তায় নামলে মনে হতো পুরো শহরটা আমাদের।

আমার কাছে বৈশাখ মানে ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সেই মেলা। প্রতি বছর এই একটা দিনের জন্য চারুকলার প্রাঙ্গণ যেন নতুনভাবে সেজে উঠত । গাছের ছায়ায় ছায়ায় বসত রঙিন দোকান, দেয়ালজুড়ে ফুটে উঠত আলপনা, বাতাসে ভাসত বাউলের সুর। দূর থেকেই শোনা যেত নাগরদোলার ক্যাঁচকোঁচ শব্দ আর শিশুদের উচ্ছ্বসিত চিৎকার। নাগরদোলায় উঠলে নিচের পুরো মেলাটা দেখা যেত এক নজরে। মনে হতো এ যেন রঙের এক অপূর্ব সমুদ্র। ওপরে উঠলে বুকে একটু ভয় লাগত, তবুও নামতে চাইতাম না। সেই দোলাচলের অনুভূতি আজও শরীরে লেগে আছে। চারুকলার ছাত্রছাত্রীরা মাসের পর মাস পরিশ্রম করে হরেক রকম জিনিস তৈরি করতেন। পোড়ামাটির ভাস্কর্য, হাতে আঁকা মুখোশ, রঙিন পটচিত্র—সেসব সেদিন সারি সারি সাজানো থাকত। শিশুচোখে সেসব দেখতে দেখতে মনে হতো—পৃথিবীতে এত সুন্দর জিনিস আছে!

মেলায় ঢুকলেই প্রথমে নাকে আসত পোড়ামাটির কোমল গন্ধ। সেই গন্ধে মিশে থাকত বাংলার মাটির একটা আলাদা পরিচয়। পাশেই বাতাসা আর মুড়কির দোকান থেকে ভেসে আসত মিষ্টি সুবাস। বাবা একটা একটা জিনিস হাতে তুলে দিতেন আর বলতেন এর পেছনের গল্প। হাতে বোনা পাখা আর রঙিন মুখোশ ছোট্ট হাতে ধরে দেখতাম, চোখ সরাতে পারতাম না। সবকিছু কিনে নিতে ইচ্ছে হতো। বাবার দিকে তাকালে তিনি মিষ্টি হেসে বলতেন, ‘নাও, তবে বেশি নয়।’

বাইরে তখন বৈশাখের কড়া রোদ পিঠ পুড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু চারুকলার পুরোনো গাছগুলোর ছায়ায় দাঁড়িয়ে সেই রোদটাকেও মনে হতো উৎসবের সাজসজ্জা। ঘামে ভেজা জামা, গরমে লাল হয়ে যাওয়া গাল—কিছুই তখন গায়ে লাগত না। আনন্দের কাছে অস্বস্তি কখনো টিকতে পারে না।

ফেরার পথে পশ্চিম আকাশে লাল রঙ ছড়িয়ে পড়ত। রাজশাহীর সন্ধ্যা মানেই এই দহনশেষের টকটকে আভা, যেন সারা দিনের রোদ শেষবারের মতো বিদায় জানাচ্ছে। সেই আকাশের নিচে দিয়ে বাড়ি ফিরতাম, হাতে মেলার জিনিসপত্র, মনে সারাটা দিনের আনন্দ। রাতে ঘুমানোর আগে কেনা জিনিসগুলো বুকের কাছে নিয়ে ঘুমাতাম যেন ঘুমের মধ্যেও সেদিনটা হারিয়ে না যায়।

সময়ের ধুলায় ঢাকা জাগ্রত বিদ্রোহ

উৎকর্ষের স্বপ্ন নিয়ে

অদম্য কুড়িগ্রাম গ্রন্থাগার ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র

পাঠকমেলার সঙ্গে দেড় যুগ

ইতিহাসের ছায়ায় তরুণ লেখকদের ইফতার

গবিতে পাঠকমেলার যাত্রা শুরু

হাদির স্মরণে গ্রাফিতি

ইডেন কলেজে শাখা কমিটি গঠনের প্রস্তুতি

রাবি পাঠকমেলার ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হই