ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ৯ দিন। সারা দেশের মতো বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনি মাঠে নেমেছে। চট্টগ্রামে ১৬টি আসনের মধ্যে মাত্র একটি আসনে গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া রাজনৈতিক দল এনসিপির প্রতিনিধিত্ব থাকলেও নির্বাচনের মাঠে দেখা নেই অভ্যুত্থানের পরিচিত মুখগুলোর। এতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
চট্টগ্রামের নির্বাচনি হালচাল বলছে, বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলনসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো উৎসবমুখর পরিবেশে চট্টগ্রাম নগরের পাঁচটি ও জেলার ১০টি আসনে নির্বাচনি মাঠে সরব আছে। পাশাপাশি যোগ দিয়েছে শিবির, ছাত্রদলসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠন। তবে নির্বাচনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চট্টগ্রামে অনেকটাই নিষ্প্রভ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে সামনের সারিতে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং তাদের ছাত্র ও যুব সংগঠন জাতীয় ছাত্র শক্তি ও যুবশক্তি। এতে বর্তমানে নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছে এনসিপির সাংগঠনিক কার্যক্রম।
অথচ নির্বাচনের তফসিলের আগে এনসিপির প্রার্থীরা জেলার ১৬টি আসনে সরব থাকলেও ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে সমঝোতায় তাদের প্রার্থিতা নিশ্চিত হয় মাত্র একটি আসনে। সেখানেও জামায়াত প্রার্থী মাঠে থেকে যাওয়ায় নির্বাচনি প্রচারে সুবিধা করতে পারছে না এনসিপির প্রার্থী।
জানা যায়, ১১ দলীয় জোটে এনসিপির জোবাইরুল হাসান আরিফকে চট্টগ্রাম-৮ আসনে জোটের প্রার্থী করা হয়। সেখানে জামায়াতের প্রার্থী ডা. আবু নাসের প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করেই নির্বাচনি মাঠ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়। তবে ভেতরে ভেতরে তার পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন কর্মী-সমর্থকরা। এতে জোবাইরুল আরিফের প্রচারে সমর্থকদের তেমন উপস্থিতি নেই। এখন পর্যন্ত জামায়াতের বড় কোনো নেতাকে জোবাইরুল আরিফের পক্ষে ভোট চাইতেও দেখা যায়নি। জোবাইরুলও বারবার অনলাইনে ও অফলাইনে তাকে সমর্থন না করার অভিযোগ তুলেছেন জামায়াত প্রার্থীর বিরুদ্ধে।
সবশেষ গত সোমবার এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়্যা চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর ফুলতলায় আসলেও বড় ধরনের জমায়েত করতে পারেনি দলটি। দলীয় প্রধান নাহিদ ইসলাম আসার কথা থাকলেও পরে কর্মসূচি পরিবর্তন করা হয়। এসব কারণে চট্টগ্রামে এনসিপির কর্মীরাও এই আসনে অনেকটাই প্রচারবিমুখ বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া গণভোটের প্রচারেও তেমন দেখা যাচ্ছে না এই দলের নেতাদের।
রাজনৈতিক সচেতন মহল বলছে, চব্বিশের ৫ আগস্ট-পরবর্তী চট্টগ্রাম বন্দরে, বিভিন্ন থানায় নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জেলাজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। তারাই পরে মহানগর, জেলা শাখা এনসিপি, যুবশক্তি ও ছাত্রশক্তিতে বিভিন্ন পদে আসেন। এসব সংগঠনের নেতাদের কারো আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল, কারো চাঁদাবাজির রেকর্ড ফাঁস, কেউবা সাংবাদিককে হুমকি, আওয়ামী লীগ নেতার কাছে ব্যবসার ভাগ দাবি করা, মামলাবাণিজ্য, মব সৃষ্টি, বহিষ্কার, পাল্টা বহিষ্কার, কমিটি নিয়ে নাটকীয়তা, বন্দরে চাঁদাবাজিসহ নানা কারণে নেতিবাচক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছেন।
এছাড়া বিভিন্ন সভা-সম্মেলনে দুপক্ষ হাতাহাতিসহ প্রকাশ্যে কোন্দলে জড়িয়ে পড়েন এনসিপি, ছাত্রশক্তি, যুবশক্তিরা নেতাকর্মীরা। এখনো তাদের মধ্যে কোন্দল বিদ্যমান। এছাড়া বড় বড় সভা-সমাবেশ ডেকে নির্ধারিত সময়ে কর্মসূচি শুরু করতে না পারায় দলটির ওপর বিরক্ত অনেকেই।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ব্যানারে ছাত্রদের নেতৃত্ব দেন কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও বর্তমানে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা মো. রাসেল মাহমুদ ও ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় নেতা খান তালাত মাহমুদ রাফি। এছাড়া বেশ কয়েকজন সমন্বয়ক শিবিরসহ বিভিন্ন দলের হওয়ায় তারা নিজ সংগঠনে ফিরে গেছেন। তবে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সেসব সমন্বয়কের বড় একটি অংশ নির্বাচনে মাঠে নেই। এর আগে চাকসু নির্বাচনেও তাদের দেখা যায়নি।
জানা যায়, এর আগে ১০ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন চট্টগ্রামের ৯টি আসনে দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে। ঘোষিত তালিকায় রয়েছেন চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) মহিউদ্দিন জিলানী, চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) মো. জোবাইরুল হাসান আরিফ, চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) মো. রিয়াজুল আনোয়ার চৌধুরী সিন্টু, চট্টগ্রাম-১০ (বন্দর-পতেঙ্গা) সাগুফতা বুশরা মিশমা, চট্টগ্রাম-১১ (ডবলমুরিং-হালিশহর) মো. আজাদ দোভাষ, চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) জুবাইরুল আলম মানিক, চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ) মো. হাসান আলী, চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আবদুল মাবুদ সৈয়দ ও চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) মীর আরশাদুল হক। এর মধ্যে জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ার পরপরই এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন মীর আরশাদুল হক। তিনি ইতোমধ্যে বিএনপিতে যোগ দিয়ে দলটির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ করেছেন।
এ বিষয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক মো. রাসেল মাহমুদ জানান, এনসিপি গঠনের পর আমাদের দল সিদ্ধান্ত নেয় সংগঠন মজবুতের জন্য যে যার এলাকায় গিয়ে রাজনীতি করবে। এ কারণে অনেকে বর্তমানে চট্টগ্রামের বাইরে। আমরা তখন আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে নেতৃত্বে ছিলাম। কিন্তু এনসিপি চট্টগ্রামে আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। আমরা জনগণকে নিরাশ করতে চাই না। আমরা আগামীবার ৩০০টি আসনে নির্বাচন করব। জামায়াতের সঙ্গে জোট রাজনৈতিক। এটি কোনো আদর্শিক জোট নয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ডিন অধ্যাপক ড. এনায়েত উল্লাহ পাটোয়ারী বলেন, এনসিপির নেতারা চট্টগ্রামে গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকলেও তারা এখন ভোটের মাঠে নেই। এটি অবশ্যই দুঃখজনক। তারা চাঁদাবাজিসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে সমালোচিত হয়েছে। এরপরও তাদের নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা আছে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম-৮ আসনে ১১ দলীয় জোট থেকে তারা প্রার্থী পেলেও তেমন কোনো কোনো তৎপরতা নেই। নেই কোনো প্রচার। আমি মনে করি সিদ্ধান্ত নিয়ে এই আসনে জামায়াতকে ছেড়ে দিলে ভালো হয়। আর অন্য আসনগুলোতে ভোটের মাঠে তাদের ভাটা পড়েছে। তবে তারা অন্য দলের সঙ্গে মিলে সবকটি আসনে ভোট উৎসবে যোগ দিতে পারে। কিন্তু তাদের একেবারে নীরব থাকাটা মোটেও উচিত হচ্ছে না। এটা স্থানীয় নির্বাচনে তাদের ভোগাবে।