একজন শ্রমিকের ঘামেই সচল থাকে শিল্প কারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উৎপাদনব্যবস্থা। তাদের শ্রমে পণ্য উৎপাদিত হয়, ব্যবসার প্রসার ঘটে, মালিকের মুনাফা বাড়ে। অথচ অনেক ক্ষেত্রে সেই শ্রমের যথাযথ মূল্য দেওয়া হয় না। কেউ সময়মতো বেতন দেন না, কেউ পাওনা আটকে রাখেন, আবার কেউ কাজের তুলনায় অপ্রতুল মজুরি দিয়ে দায়িত্ব শেষ মনে করেন। অথচ শ্রমিকের ন্যায্য পারিশ্রমিক কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি তার অর্জিত অধিকার।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় শ্রমিকের জীবন আরো কঠিন হয়ে উঠেছে। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, গ্যাস, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু অনেক শ্রমিকের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে মাস শেষে সংসার চালাতে গিয়ে তাদের ঋণগ্রস্ত হতে হচ্ছে। এ অবস্থায় শ্রমিকের পাওনা আটকে রাখা কিংবা ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করা কতটা যুক্তিসংগত? ইসলাম এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে।
শ্রমিকের মজুরি আটকে রাখা জুলুম
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।’ (সুরা আন-নাহল, ১৬:৯০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহ তিন শ্রেণির মানুষের বিরুদ্ধে বাদী হবেন। তাদের একজন সেই ব্যক্তি, যে শ্রমিকের কাছ থেকে পুরো কাজ আদায় করে অথচ তার মজুরি পরিশোধ করে না।’ (বুখারি : ২২২৭)
এই হাদিস শ্রমিকের পাওনা আত্মসাতের ভয়াবহ পরিণতি তুলে ধরে। নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর মজুরি পরিশোধ করা মালিকের দায়িত্ব। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বেতন আটকে রাখা, অযৌক্তিক কর্তন কিংবা পাওনা নিয়ে টালবাহানা করা স্পষ্ট জুলুম। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমানত তার হকদারের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা আন-নিসা, ৪:৫৮)
শ্রমিকের বেতনও তার প্রাপ্য অধিকার। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সামর্থ্যবান ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করা জুলুম।’ (বুখারি : ২৪০০; মুসলিম : ১৫৬৪)
কিয়ামতের দিন জবাবদিহি
মানুষের অধিকার নষ্ট করার হিসাব আখিরাতে কঠিন হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিঃস্ব ব্যক্তির পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে আসবে অথচ দুনিয়ায় মানুষের অধিকার নষ্ট করেছে, তার নেকি ক্ষতিগ্রস্তদের দিয়ে দেওয়া হবে। নেকি শেষ হলে তাদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।’ (মুসলিম : ২৫৮১)
অতএব, শ্রমিকের পাওনা আটকে রেখে শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মাধ্যমে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ নেই। যার অধিকার নষ্ট হয়েছে, তার পাওনা ফিরিয়ে দিতে হবে এবং অন্যায়ের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে।
ন্যায্য মজুরি ও বর্তমান বাস্তবতা
মজুরি নির্ধারণে কাজের ধরন, কর্মঘণ্টা, শ্রমের পরিমাণ, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনা করা জরুরি। একজন শ্রমিক যেন নিজের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারেন, সেই বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু মালিকের মুনাফা বিবেচনা করে মজুরি নির্ধারণ ন্যায়সংগত নয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা মানুষের প্রাপ্য বস্তু কম দেবে না।’ (সুরা আল-আ’রাফ, ৭:৮৫)
এই নির্দেশনার মূল শিক্ষা হলো, মানুষের অধিকার পূর্ণভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। তাই বাজারদর ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত মজুরি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
শ্রমিকের আন্দোলন ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
ন্যায্য মজুরি, বকেয়া বেতন ও কর্মক্ষেত্রে অধিকার আদায়ের জন্য শ্রমিকরা দাবি জানাতে পারেন। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ মন্দ কথা প্রকাশ করা পছন্দ করেন না, তবে যার ওপর জুলুম করা হয়েছে সে ব্যতীত।’ (সুরা আন-নিসা, ৪:১৪৮)
অর্থাৎ, জুলুমের শিকার ব্যক্তি নিজের প্রতি হওয়া অন্যায়ের কথা প্রকাশ করতে এবং ন্যায়বিচার চাইতে পারেন। তবে আন্দোলনের নামে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস কিংবা সাধারণ মানুষের ক্ষতি করা গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সীমালঙ্ঘন করো না।’ (সুরা আল-বাকারা, ২:১৯০)
তাই শ্রমিকের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করা যেমন অন্যায়, তেমনি দাবি আদায়ের নামে অন্যের অধিকার নষ্ট করাও অন্যায়।
মালিক, শ্রমিক ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব
মালিককে যথাসময়ে ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও চুক্তি অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, শ্রমিককেও সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমানরা তাদের শর্তাবলির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।’ (আবু দাউদ : ৩৫৯৪)
শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শ্রম আইন বাস্তবায়ন, বকেয়া বেতন পরিশোধ নিশ্চিত করা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। শ্রমিক যেন নিজের পাওনা আদায়ের জন্য দিনের পর দিন দ্বারে দ্বারে ঘুরতে বাধ্য না হন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (বুখারি : ৮৯৩; মুসলিম : ১৮২৯)
শ্রমিকের শ্রমে মালিকের প্রতিষ্ঠানের চাকা ঘোরে, সচল থাকে অর্থনীতিও। তাই তার ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করা মালিকের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। শ্রমিকের ঘাম শুকিয়ে গেলেও তার শ্রমের মূল্য শেষ হয়ে যায় না। ইসলাম প্রত্যেককে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এই নির্দেশনা বাস্তবায়িত হলে কর্মক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে, শ্রমিকের পরিবারে স্বস্তি ফিরবে এবং সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য গড়ে উঠবে।