ইসলাম আল্লাহর মনোনীত একটি সুন্দর, সহজ ও স্বভাবজাত ধর্ম। যেখানেই বান্দা কষ্ট বা সমস্যার সম্মুখীন হবে সেখানেই রয়েছে সুযোগ ও বিকল্প সহজ ব্যবস্থা। মোজার উপর মাসেহের বিষয়টিও অনুরূপ।
অনেকেরই দীর্ঘক্ষণ জুতা/মোজা পরিধান করে থাকতে হয়। বারবার জুতা/মোজা খোলাও বিরক্তিকর ও কষ্টকর। উম্মতের এমন বিড়ম্বনা লাঘবে রাসূল স. মোজা না খুলেই তার উপর মাসেহ করার সুযোগ প্রদান করেছেন। তিনি নিজেও মোজার উপর মাসেহ করেছেন। এটা উম্মতের জন্য বিশেষ সুযোগ ও ছাড়। তবে বিশেষ সুবিধাটি পেতে কিছু শর্তও মানতে হবে। বলা বাহুল্য যে, মোজার উপর মাসাহের ব্যাপারে বর্ণিত হাদিসগুলো মুতাওয়াতির তথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত। এর প্রামাণ্যতার ব্যাপারে প্রশ্ন তুললে ঈমানচ্যুতির সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। (সহীহুল বুখারি: হাদিস নং ১৮২)
কোন ধরনের মোজার উপর মাসেহ করা যাবে?
হাদিস শরীফে মোজা বলতে সাধারণত চামড়ার মোজাকে বোঝানো হয়েছে। যা মোটা, পুরু, ভারসাম্য রক্ষাকারী ও অনায়াসে পায়ের সাথে সেঁটে থাকে। অতএব, চামড়া বা চামড়াজাত মোজার উপর মাসেহ করা বৈধ। কিন্তু চামড়া বা চামড়াজাত ছাড়া কটন, নায়লন বা পশমের তৈরি যেসব মোজা সচরাচর পাওয়া যায় এর উপর মাসেহ করা বৈধ নয়। হ্যাঁ, কটন, নায়লন বা পশমের তৈরি মোজায় নিম্নোক্ত শর্তগুলো পাওয়া গেলে তার উপর মাসেহ বৈধ হবে।
শর্তগুলো হচ্ছে-
ক) মোজা এমন মোটা ও পুরু হওয়া যে, জুতা ছাড়াই শুধু মোজা পায়ে দিয়েই (ফেটে যাওয়া ও ছিঁড়ে যাওয়া ব্যতীত) তিন মাইল পর্যন্ত হাঁটা যায়। (আদ্দুররুল মুখতার : ১/৫০০ আযহার; হিন্দিয়া : ১/৮৫ যাকারিয়া)
খ) কোনো কিছুর সাহায্য ছাড়াই মোজা পায়ের সাথে সেঁটে থাকে এবং গোড়ালীসহ পুরো পায়ের পাতার উপর-নিচ আবৃত রাখে। শুধু মোজা পরেই ধারাবাহিক হাঁটা-চলা করা যায়। (মাজমাউল আনহুর: ১/৭৫ আল-মানার, আল মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা আল কুয়েতিয়্যা : ৩৭/২৬৪)
গ) মোজা এমন মোটা যে, তা পানি চোষে না এবং তা ভেদ করে পায়ে পানি পৌঁছায় না। (আদ্দুররুল মুখতার : ১/৫০০ আযহার)
ঘ) মোজা পরিধান করার পর উপর থেকে পায়ের মোজাবৃত অংশ পরিলক্ষিত হয় না। সচরাচর ব্যবহৃত কটন, নায়লন বা পশমের মোজায় যেহেতু এসব শর্ত পাওয়া যায় না, তাই এর উপর মাসেহ সহীহ হবে না। (আদ্দুররুল মুখতার : ১/৫০০ আযহার; আল-মুহিতুল বুরহানি: ১/৩৪২ ইদারাতুল কুরআন)
একবার পরিধান করে কতো দিন মাসেহ করা যাবে?
পবিত্র হয়ে মোজা পরিধান করার পর মুকীমের জন্য একদিন এক রাত তথা ২৪ ঘণ্টা। আর মুসাফিরের জন্য তিন দিন তিন রাত তথা ৭২ ঘণ্টা উক্ত মোজার উপর মাসাহ করা বৈধ। এ সময়ের মাঝে পা না ধুয়ে মোজার উপরিভাগে মাসাহ করার দ্বারাই পবিত্রতা সম্পন্ন হয়ে যাবে। (আল-মুহিতুল বুরহানি: ১/৩৪২ ইদারাতুল কুরআন, তানভীরুল আবসার: ১/৫০২ আযহার)
মোজার উপর মাসেহ করার পদ্ধতি:
দুই হাতের ভেজা আঙ্গুলগুলো দুই পায়ের আঙ্গুলের উপরিভাগে রাখবে। এরপর হাত দুইটি পায়ের গোছার দিকে টেনে আনবে। ডান পা ডান হাত দিয়ে মাসেহ করবে; বাম পা বাম হাত দিয়ে মাসেহ করবে। মাসেহ করার সময় হাতের আঙ্গুলগুলো স্বাভাবিক ফাঁকা রাখবে। হাতের ছোটো তিন আঙ্গুল পরিমাণ মাসাহ করা ফরয, সবগুলো আঙ্গুল দ্বারা মাসাহ করা সুন্নাত। মোজার উপর ভিন্ন কিছু পরিধান করা থাকলে, মাসেহের সময় তা খুলে সরাসরি মোজার উপর মাসেহ করতে হবে। (রদ্দুল মুহতার: ১/৪৯৬ আযহার, জাওয়াহিরুল ফিক্হ:২/৩২২ দারুল উলুম করাচি)
যে কারণে মোজা মাসেহ বাতিল গণ্য হয়:
* শরীয়ত নির্ধারিত মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে। (আল-মুহিতুল বুরহানি: ১/৩৫৩ ইদারাতুল কুরআন, তানভীরুল আবসার: ১/৫০৮ আযহার)
* মোজা খুলে ফেললে। (আল-মুহিতুল বুরহানি: ১/৩৫৩ ইদারাতুল কুরআন, তানভীরুল আবসার: ১/৫০৮ আযহার)
* মোজা ছিঁড়ে গিয়ে বা ফেটে গিয়ে পায়ের ছোট তিন আঙ্গুল পরিমাণ প্রকাশ পেলে। (আল-আশবাহ ১/১১৪, আল মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা আল কুয়েতিয়্যা : ৩৭/২৬৫)
* গোসল ফরয হয় এমন কোনো কাজ সংঘটিত হলে। (মুনিয়াতুল মুসল্লি: ১/৩২৩ দারুল কুতুব)
* প্রত্যেক মোজার একাধিক জায়গা ফেটে গেলে বা ছিঁড়ে গেলে সব স্থান মিলিয়ে পায়ের ছোট তিন আঙ্গুল পরিমাণ হলে। (তানভীরুল আবসার: ১/৫০৫ আযহার, জাওয়াহিরুল ফিক্হ: ২/৩২২, দারুল উলুম করাচি)
বুট জুতার উপর মাসাহ করার বিধান
বুট জুতার মাঝে যেহেতু মাসাহ বৈধ হওয়ার সকল গুণাগুণ পাওয়া যায়, তাই তার উপর মাসাহ করা বৈধ। তবে তা জুতা হিসাবে ব্যবহার হওয়ায় বা মসজিদের সম্মান ক্ষুণ্ন হওয়ায় তা পরিধান করে নামায পড়া উচিত নয়। (ইমদাদুল ফাতওয়া: ১/২৯৬, যাকারিয়া বুক ডিপো)
লেখক: সিনিয়র মুফতি ও শিক্ষাসচিব, শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা