হোম > ধর্ম ও ইসলাম

বিদায়ের প্রহরে রমজান

আমীনুর রহমান নড়াইলী

এক বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যে মহিমান্বিত মাসটি আমাদের জীবনে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে আসে, সেই পবিত্র রমজান আবার বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। কিছুদিন আগেও সাহরির নিস্তব্ধতা, ইফতারের ব্যস্ততা, মসজিদে তারাবির সুর আর কোরআন তিলাওয়াতের ধ্বনিতে মুখর ছিল চারপাশ। কিন্তু দিন গড়াতে গড়াতে এখন রমজান শেষের পথে। স্বভাবতই একটি প্রশ্ন সামনে আসে—এই মহিমান্বিত মাসটি আমাদের কী শিক্ষা দিয়ে গেল? আমরা কি শুধু কিছুদিনের ইবাদতেই সীমাবদ্ধ ছিলাম, নাকি জীবনের জন্য কোনো স্থায়ী শিক্ষা অর্জন করতে পেরেছি?

রমজানের প্রথম ও প্রধান শিক্ষা হলো তাকওয়া অর্জন। তাকওয়া মানে শুধু আল্লাহকে ভয় করা নয়; বরং প্রতিটি কাজে আল্লাহর উপস্থিতির অনুভূতি ধারণ করা। রোজা আমাদের শেখায়—মানুষ চাইলে নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সারাদিন ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করে আমরা প্রমাণ করি যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মানুষের পক্ষে অনেক কিছুই ত্যাগ করা সম্ভব। যখন কেউ নির্জনে থেকেও পানাহার থেকে বিরত থাকে, তখন সে আসলে আল্লাহর প্রতি তার আনুগত্যের প্রমাণ দেয়। এই অনুভূতিই তাকওয়ার ভিত্তি গড়ে তোলে।

রমজানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো আত্মসংযম ও ধৈর্য। রোজা শুধু খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকার নাম নয়; এটি মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠনের এক অনন্য অনুশীলন। এই মাসে আমরা শিখি—অপ্রয়োজনীয় কথা বলা থেকে বিরত থাকতে, রাগ দমন করতে, অন্যকে কষ্ট না দিতে এবং নিজের আচরণকে সংযত রাখতে। অনেক সময় ক্ষুধা ও ক্লান্তি মানুষকে উত্তেজিত করে তোলে, কিন্তু একজন রোজাদার চেষ্টা করেন ধৈর্য ও সহনশীলতার মাধ্যমে সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে। ফলে রমজান আমাদের চরিত্রকে পরিশীলিত করার এক অসাধারণ সুযোগ এনে দেয়।

এই মাস আমাদের কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক নবায়নের শিক্ষাও দেয়। কারণ রমজান হলো কোরআন নাজিলের মাস। তাই এ সময় মুসলমানরা বিশেষভাবে কোরআন তিলাওয়াত, শ্রবণ ও অধ্যয়নে মনোযোগী হয়। অনেকেই এই মাসে পুরো কোরআন খতম করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক যদি শুধু রমজানেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। রমজান আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñকোরআন আমাদের জীবনের পথনির্দেশিকা। তাই এই পবিত্র গ্রন্থের শিক্ষা যেন আমাদের চিন্তা, আচরণ ও সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।

রমজান আমাদের মানবিকতা ও সহমর্মিতারও শিক্ষা দেয়। সারাদিন ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট অনুভব করার মাধ্যমে আমরা দরিদ্র ও অসহায় মানুষের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারি। তাই এই মাসে দান-সদকা, জাকাত ও ফিতরার মাধ্যমে সমাজের অভাবগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। ইফতার বিতরণ, গরিবদের সহায়তা এবং বিভিন্ন মানবকল্যাণমূলক উদ্যোগ সমাজে এক ধরনের সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতার পরিবেশ তৈরি করে। রমজান আমাদের শেখায়—মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করাও এক মহান ইবাদত।

সময়ের মূল্য উপলব্ধি করার ক্ষেত্রেও রমজান আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। সাধারণ সময়ে আমরা অনেকেই সময়ের অপচয় করি, কিন্তু রমজানে দেখা যায়—একজন মানুষ ইচ্ছা করলে দিনের প্রতিটি মুহূর্তকে অর্থবহ করে তুলতে পারে। সাহরি থেকে ইফতার পর্যন্ত ধৈর্যের অনুশীলন, তারাবির নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও জিকির—সব মিলিয়ে সময়কে সুন্দরভাবে কাজে লাগানোর এক অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি হয়। এই অভ্যাস যদি আমরা সারা বছর ধরে বজায় রাখতে পারি, তাহলে আমাদের জীবন অনেক বেশি শৃঙ্খলাবদ্ধ ও অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।

রমজানের আরেকটি গভীর শিক্ষা হলো—ইবাদতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। এই মাসে মসজিদগুলো মুসল্লিদের পদচারণে মুখরিত হয়ে ওঠে, অনেকেই নিয়মিত নামাজ পড়তে শুরু করেন, কোরআন তিলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে ওঠে। কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি এসব আমল ধীরে ধীরে কমে যায়, তাহলে রমজানের প্রকৃত শিক্ষা অপূর্ণ থেকে যায়। আল্লাহর কাছে প্রিয় আমল হলো সেই আমল, যা নিয়মিত করা হয়—যদিও তা পরিমাণে কম হোক। তাই রমজানের প্রকৃত সফলতা তখনই, যখন এই মাসের ইবাদতের ধারাবাহিকতা আমাদের জীবনের স্থায়ী অংশ হয়ে ওঠে।

আজ রমজান বিদায়ের প্রহরে দাঁড়িয়ে আমাদের আত্মসমালোচনার সময় এসেছে। আমরা কি সত্যিই এই মাস থেকে কিছু শিখেছি? আমাদের চরিত্র, আচরণ ও জীবনধারায় কি কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে? যদি রমজান আমাদের পাপ থেকে দূরে থাকতে, মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে এবং আল্লাহর প্রতি আরো বেশি অনুগত হতে উদ্বুদ্ধ করে থাকে, তবে সেটিই হবে এই মাসের প্রকৃত অর্জন।

রমজান বিদায় নিলেও তার শিক্ষা যেন আমাদের জীবন থেকে বিদায় না নেয়। কারণ এ মাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার সুযোগ সবসময়ই খোলা। যদি আমরা রমজানের শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করে সারা বছর সেই আলোকে জীবন পরিচালনা করতে পারি, তাহলে রমজান সত্যিই আমাদের জীবনে এক নতুন পরিবর্তনের সূচনা ঘটাতে সক্ষম হবে।

লেখক : মুহাদ্দিস, দারুল উলুম বাগে জান্নাত, নারায়ণগঞ্জ

জাকাতে সম্পদ বৃদ্ধি ও পবিত্র হয়

সাদাকাতুল ফিতরে রোজার পূর্ণতা

জাকাতের সরকারি ব্যবস্থাপনায়

২৩তম তারাবি: তাকওয়াই শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি

২২তম তারাবি: মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ

বায়তুল মোকাররম মসজিদে একসঙ্গে পাঁচ হাজার মানুষের ইফতার

আল্লাহকে রাজিখুশি করার সাধনা

২১তম তারাবি: আল্লাহর রহমতে নিরাশ হয়ো না

ইবাদতে কাটুক রমজানের শেষ দশক

২০তম তারাবি: কুরআনের উপদেশ সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য