বহু কল্যাণের উৎস মাহে রমজানের অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে। প্রতিটি মুসলিমের জন্য রমজানের বাকি সময়টুকু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রোজার লক্ষ্য হলো মানুষকে মুত্তাকি (আল্লাহভীরু) বানানো। এরশাদ হচ্ছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর ফরজ করা হয়েছে সিয়াম যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্বববর্তী লোকদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ (সুরা বাকারা : ১৮৩)
কোরআনে তাকওয়া শব্দটি এসেছে ১৫ বার। তাছাড়াও অনেকবার আল্লাহ তায়ালা ‘ইত্তাকু’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তাকওয়া কী? তাকওয়া অর্থ আল্লাহভীতি। তাফসিরে এসেছেÑ ‘আল্লাহর আদেশসমূহ পালন ও নিষেধগুলো থেকে বেঁচে থাকাই তাকওয়া।’ (তাফসিরে জালালাইন : ১/৯)। ব্যাপক অর্থে, তাকওয়া তো আল্লাহর ভয়ে হালাল-হারামের বিধানের প্রতি মানবমনের ওই শ্রদ্ধা ও ভীতি যা মানুষের আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে গোপনে অপরাধ করার প্রবণতা থাকে। যেখানে পুলিশ কিংবা কোনো মানুষ পাহারা দিতে পারে না। সেই গোপন অপরাধের জায়গায় আল্লাহর ভয়ের অদৃশ্য পাহারাটাই হলো তাকওয়া। রোজার মাধ্যমে এই পাহারা মজবুত হয়। আল্লাহ তাআলা বিশ্বমানবতার জন্য যে সংবিধান (কোরআন) নাজিল করেছেন তাকওয়ার আদেশের মাধ্যমে তার প্রতি সশ্রদ্ধ করতে চেয়েছেন। কারণ, জনগণ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হলে কোনো আইনই প্রয়োগ করা সম্ভব নয়।
বর্তমানে সমাজ থেকে অপরাধ দমনে দুটি ব্যবস্থা বিদ্যমান। ১. আইন, ২. আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। পৃথিবীর বাস্তবতা বলছে, আইনের প্রতি জনগণ শ্রদ্ধাশীল না হলে শুধু এসব দিয়ে সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল সম্ভব নয়। বরং অনেক সময় তা হয়ে যায় বিপরীত। এর মূল কারণ হলো অধিকাংশ মানুষই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়।
পক্ষান্তরে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই পৃথিবীকে অপরাধ থেকে মুক্ত করার জন্য যে ঐশী ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন তার ধাপ হচ্ছে ৩টি। ১. আইন (কোরআন-সুন্নাহ) ২. তাকওয়া (আইনের প্রতি মানুষকে শ্রদ্ধাশীল করে তোলা)। ৩. আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। ইতিহাস সাক্ষী, এই ব্যবস্থাপত্র শতভাগ সফল হয়েছিল। কারণ এতে মহান আল্লাহ আইন প্রণয়নের পরই মানুষকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়েছেন।
একটি দেশের ক্ষুদ্রতম ইউনিট (একক) হচ্ছে নাগরিক, প্রত্যেকটি নাগরিক যতক্ষণ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হবে ততক্ষণ সে আইন সমাজে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। আইনকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি তথা সবাইকে অপরাধপ্রবণতা থেকে বাঁচানোর জন্যই রোজার ব্যবস্থা। রোজার সংজ্ঞার দিকে তাকালেই বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে। এতে বলা হয়, ‘পানাহার, সহবাস ও সব ধরনের গুনাহের কাজ ছেড়ে দেওয়াই রোজা’। শুধু পানাহার ত্যাগ করে গুনাহের কাজ না ছাড়লে তা কিছুতেই রোজা হবে না। আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘পানাহার বর্জনের নাম সিয়াম নয়; সিয়াম হলো অনর্থক ও অশ্লীল কথা এবং কাজ বর্জন করা। (বায়হাকি: ৪/২৭০)। অর্থাৎ রোজার মাধ্যমে পবিত্র কোরআনে নিষিদ্ধ জিনিসগুলো ছেড়ে দেয়ার প্রশিক্ষণ নিতে হবে। নিজেকে বিরত রাখতে হবে সব ধরনের মিথ্যা ও পাপাচার থেকে।
কোরআনের শান্তির সমাজ গড়ার মিশন বাস্তবায়নের মতো যোগ্য ও তাকওয়াসম্পন্ন (মুত্তাকি) নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি পাপ, মিথ্যা কথা, অন্যায় কাজ ও মূর্খতাসুলভ কাজ ত্যাগ করতে না পারবে তার পানাহার ত্যাগ করাতে আল্লাহ তায়ালার কোনো প্রয়োজন নেই। (বোখারি : ৫/২২৫১)। সিয়াম কোরআনের আইনের প্রতি মানুষের মনে ভীতি ও শ্রদ্ধা তৈরি করবে সযতনে। পানাহারকে নিয়ন্ত্রণ করে আর অপরাধ প্রবণতাকে করবে সমূলে উৎপাটন। রমজান শেষে পানাহার চালু হবে বটে কিন্তু অপরাধ থেকে বেঁচে থাকার যে বাস্তব প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা হয়েছিল তা চলবে সারা বছর। তাকওয়ার মাধ্যমে অপরাধ দমন হবে সমাজ থেকে। মানুষ বাঁচবে মানুষের অনিষ্ট থেকে। কেউ কারো ক্ষতি করবে না। প্রতিষ্ঠিত হবে শান্তির সমাজে।
লেখক : পরিচালক, বাইতুল হিকমাহ একাডেমি, গাজীপুর