আমাদের সমাজের দুর্বল ও সাধারণ মানুষ শক্তিধর ও ক্ষমতাসীনদের দ্বারা নানা অন্যায়-অবিচারের শিকার হয়। এমনই এক অন্যায় ও গর্হিত কাজ চাঁদাবাজি। সাধারণত প্রভাবশালী চক্র জোরপূর্বক কাউকে নিজ কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলার জন্য, অথবা নির্দিষ্ট স্থান অতিক্রম করার জন্য নির্দিষ্ট অথবা অনির্দিষ্ট পরিমাণে চাঁদা দিতে বাধ্য করে। এই কাজটিই চাঁদাবাজি হিসেবে পরিচিত ও জনশ্রুত। বিশেষত আমাদের দেশে বাজার, স্টেশন, বন্দরসহ বিভিন্ন জায়গায় জনসেবা, জনসভা, খাবার বিতরণ ইত্যাদি অজুহাতে লাগামহীনভাবে চাঁদাবাজির মতো অনিয়ম চলে। কিছু মানুষ ক্ষমতার অপব্যবহার করে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে মানুষের অর্থ লুট করে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। এটা ডাকাতি, ছিনতাই বা চুরির মতোই গর্হিত অপরাধ। এরা দেশ ও দশের শত্রু।
এভাবে অন্যের মালিকানায় অবৈধ হস্তক্ষেপ করা এবং স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি ছাড়া তার সম্পদ ভক্ষণ করা জঘন্যতম অন্যায়। ইসলাম ইনসাফ ও মানবতার ধর্ম। ইসলাম সব ক্ষেত্রে ইনসাফ-ন্যায়নীতি ও সাম্য-সমতা প্রতিষ্ঠা করেছে; জুলুম-অবিচার, সীমালঙ্ঘন-বাড়াবাড়ি প্রভৃতি কঠোর হস্তে দমন করেছে। প্রতিটি মানুষের জান, মাল ও ইজ্জত-আব্রুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। অন্যায়ভাবে অপরের মাল আত্মসাৎ করাকে হারাম ঘোষণা করেছে। অন্যের মালিকানায় বেআইনি হস্তক্ষেপকে নিষিদ্ধ করেছে। কারো স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি ছাড়া তার সম্পদ ভক্ষণকে হারাম করেছে। পরকালে এর জন্য কঠিন জবাবদিহি ও শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ কোরো না এবং এ উদ্দেশ্যে বিচারকের কাছে এমন কোনো মামলা করো না যে মানুষের সম্পদ থেকে কোনো অংশ জেনেশুনে গ্রাস করার গুনাহে লিপ্ত হবে।’ (সুরা বাকারা : ১৮৮)। এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে অন্যের সম্পদ অবৈধভাবে গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। এমনকি যদি কেউ বিচারব্যবস্থা ব্যবহার করেও অন্যায়ভাবে কারো সম্পদ গ্রহণ করে, তাও হারামই থাকে, বৈধ হয়ে যায় না।
পৃথিবীতে ন্যায় প্রতিষ্ঠা ইসলামের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। মুসলমানদের একটি প্রধান ও আবশ্যিক বৈশিষ্ট্য ন্যায়পরায়ণতা। কোনো মুসলমান চাঁদাবাজির জুলুমের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে না, বা এই জুলুম সমর্থনও করতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ন্যায় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, হকদারদের হক তাদের কাছে পৌঁছে দিতে। তোমরা যখন মানুষের মাঝে বিচার করবে, তখন ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবে। আল্লাহ তোমাদের কত উত্তম উপদেশই না দিচ্ছেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন।’ (সুরা নিসা : ৫৮)।
মানুষের সম্পদ তার আন্তরিক সম্মতি ও সন্তুষ্টি ছাড়া জোর করে, কিংবা যেকোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করে নেওয়া হারাম। এভাবে অর্জিত অর্থ অবৈধ ও হারাম সম্পদ। কোনো মহৎ বা ভালো উদ্দেশ্যে জনসেবার জন্য বা অসহায় মানুষকে সাহায্য করার জন্য হলেও তা নাজায়েজ। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোনো মুসলমানের সম্পদ তার আন্তরিক সম্মতি ছাড়া হস্তগত করা বৈধ নয়।’ (মুসনাদ আহমাদ : ২০৬৯৫)।
রিজিক উপার্জনের জন্য হালাল উপায় অবলম্বন করা জরুরি। দুর্নীতি, অন্যায়, অসততা, জুলুম বা অন্য কোনো অসদুপায়ে অর্থ উপার্জন করা হারাম; ওই সম্পদ খাওয়া, পরা ও অন্যান্য প্রয়োজনে খরচ করাও হারাম। হারাম সম্পদ খেয়ে মানুষের শরীরে যে রক্ত-মাংস হবে, তা জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হারাম পন্থায় উপার্জিত সম্পদ দ্বারা সৃষ্ট ও পরিপুষ্ট মাংসের জন্য জাহান্নামের আগুনই উপযুক্ত।’ (তিরমিজি : ৬১৪)।
অন্যের সম্পদ চাঁদাবাজি বা যেকোনো জুলুমের মাধ্যমে গ্রাস করে থাকলে তওবা করার পাশাপাশি তা তার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া কর্তব্য। না হয় এই জুলুমের হিসাব কেয়ামতের দিন দিতে হবে। আপনার শত ইবাদত-বন্দেগি এবং নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত—কিছুই আপনাকে সেদিন আজাব থেকে রক্ষা করতে পারবে না। আল্লাহ তায়ালা বান্দার হক ক্ষমা করবেন না। কেয়ামতের দিন নিজের সওয়াব দিয়ে বা অন্যের পাপের বোঝা নিয়ে মানুষের হক ও পাওনা পরিশোধ করতে হবে।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের ওপর জুলুম করেছে, সে যেন তা থেকে মুক্ত হয় (ক্ষমা বা বদলার মাধ্যমে), কেয়ামতের দিন পাওনা পরিশোধের জন্য টাকা-পয়সা থাকবে না। তখন জুলুমের সমপরিমাণ সওয়াব পাওনাদারের জন্য নিয়ে নেওয়া হবে। সওয়াব না থাকলে পাওনাদারের গুনাহগুলো তার ওপরে চাপিয়ে দেওয়া হবে।’ (বুখারি : ৬৫৩৪)।
একদিন নবীজি (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমরা কি জানো প্রকৃত দরিদ্র কে আমার উম্মতের মধ্যে? প্রকৃত দরিদ্র ওই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন বহু সালাত, সাওম ও জাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে।
তবে সে দুনিয়ায় কাউকে হত্যা করলে, মিথ্যা অপবাদ দিলে, কাউকে গাল-মন্দ করলে, কারো সম্পদ আত্মসাৎ করলে, কাউকে মারলে, অথবা কাউকে প্রহার করলে কিয়ামতের দিন ওই ব্যক্তির নেক আমল বা সওয়াব তাদের (তার দ্বারা যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে) দেওয়া হবে। যদি তার নেক আমলের সওয়াব পাওনাদারদের পাওনা পরিশোধ করার আগেই শেষ হয়ে যায়, তখন তাদের গুনাহগুলো তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে এবং তার পর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’ (মুসলিম : ৭৬৮৬)।
বাংলাদেশের পরিবর্তিত ব্যবস্থায় পুরো জাতি যখন ফ্যাসিস্ট পরাজিত হওয়ার পর স্বস্তির স্বাদ পেয়ে সমৃদ্ধি ও শান্তির অন্বেষায় সবেগে সামনে দিকে অগ্রসরমাণ, তখন দেশের অগ্রযাত্রা ও স্বস্তির জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে দেশজুড়ে একদল চাঁদাবাজ। এরা দেশ ও জনগণের শত্রু; জাতি ও ধর্মের শত্রু। এদের সামাজিকভাবে প্রতিহত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তৌফিক দান করুন এবং প্রিয় মাতৃভূমিকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিন।
লেখক : মুশরিফ, আরবি ভাষা বিভাগ, জামিয়া মাদানিয়া, বারিধারা, গুলশান, ঢাকা