হোম > খেলা > ক্রিকেট

পাকিস্তানকে উড়িয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস

এম. এম. কায়সার

পাকিস্তানের শেষ উইকেট তুলে নেওয়ার পর নাহিদ রানাকে জড়িয়ে ধরে পুরো দলের জয়ের উল্লাস। ছবি: এএফপি

টেস্ট ম্যাচ শুরুর আগে সংবাদ সম্মেলন থেকে শুরু করে সর্বত্র সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল একটা নাম—নাহিদ রানা। পাকিস্তানও এই নাম নিয়েই সবচেয়ে বেশি চিন্তিত ছিল। শাহিন শাহ আফ্রিদি তো বলেই বসেন, এই টেস্টে নাহিদ রানা যাতে জ্বলে না উঠেন, সেই আশাই করছেন তারা। ম্যাচের প্রথম ইনিংসে নাহিদ বেশ খরুচে থাকলেন। ২১ ওভারে ১ উইকেটে ১০৪ রান খরচা! কিন্তু তাকে নিয়ে যে পাকিস্তান যে ভয় করছিল সেই রূপ ঠিকই দেখালেন তিনি শেষ ইনিংসের শেষ দিনের শেষ সেশনে। তার বোলিং ঝড়েই উড়ে গেল পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের ডিফেন্স। ৯.৫ ওভারের ঝোড়ো বোলিংয়ে ৪০ রানে ৫ উইকেট নিয়ে নাহিদ রানা আরেকবার জানিয়ে দিলেন তিনি সত্যিকার অর্থেই ম্যাচ জেতানো বোলার!

শেষ দিনে ম্যাচ জিততে পাকিস্তানের সামনে বাংলাদেশ চ্যালেঞ্জিং টার্গেট দেয় ২৬৮ রানের। মাঝের সেশনে ভালো ব্যাটিং করে পাকিস্তান সেই ব্যবধান অনেক কমিয়ে আনে। শেষ সেশনে ম্যাচ জিততে তাদের প্রয়োজন দাঁড়ায় ১৫২ রানের। হাতে জমা ৭ উইকেট, খেলা বাকি ৪৫ ওভারের। সহজ সেই হিসাব কঠিন হয়ে গেল নাহিদ রানার এক স্পেলে। পাকিস্তানের মাঝের তিন ব্যাটার শান মাসুদ, সৌদ শাকিল ও মোহাম্মদ রিজওয়ানকে আউট করে সফরকারীদের কোমর ভেঙে দেন নাহিদ রানা। সুইং এবং রিভার্স সুইংয়ের জাদুকরী স্পেলে খানিকবাদে লেজের সারির বাকি দুই ব্যাটারকে উড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশকে এনে দিলেন ১০৪ রানের বড় জয়। পাকিস্তান গুটিয়ে যায় ১৬৩ রানে। তখনো দিনের আরো ২৩ ওভার খেলা বাকি।

শেষদিনের শেষ সেশনে নাহিদ রানার বোলিংয়ের কোনো জবাবই খুঁজে পায়নি পাকিস্তান। আর টেস্ট ক্রিকেটে পাকিস্তান বেশ লম্বা সময় ধরে বাংলাদেশের সামনে যে দাঁড়াতেই পারছে না। পেছনের টানা তিন টেস্টের স্কোরলাইন এমন—বাংলাদেশ ৩, পাকিস্তান ০! রাওয়ালপিন্ডিতে দুই বছর আগে দুই ম্যাচের সিরিজ বাংলাদেশ জিতেছিল ২-০ তে। এবার দুই টেস্টের সিরিজে এগিয়ে গেল ১-০ তে।

-হিসাব কী দাঁড়াল?

টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ দল পাকিস্তানকে শুধু পাকিস্তানের মাটিতেই নয়, নিজ মাটিতেও হারায় এবং দাপুটে ভঙ্গিতেই! ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং, অধিনায়কত্ব কৌশল—ক্রিকেটের প্রায় সব বিভাগেই ঢাকা টেস্টে পাকিস্তানের ওপর ছড়ি ঘোরায় বাংলাদেশ।

শেষদিনের সকালের সেশনে বাংলাদেশ আগের দিনের ১৭৯ রানের সঙ্গে আর মাত্র ৮৮ রান যোগ করে ৬ উইকেট হারায়। এদিনও ব্যাট হাতে দলের সেরা পারফরমার অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। যেভাবে ব্যাট করছিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক তাতে মনে হচ্ছিল টেস্টের উভয় ইনিংস সেঞ্চুরির বিশ্বরেকর্ড ছুঁতে চলেছেন তিনি। টেস্টের উভয় ইনিংসে এর আগে দুবার সেঞ্চুরির কৃতিত্ব ছিল শান্তর। তিনবার এই কীর্তি গড়ার রেকর্ডটা রয়েছে সুনীল গাভাস্কার, রিকি পন্টিং ও ডেভিড ওয়ার্নারের। কিন্তু শেষদিনের প্রথম সেশনে সেই কীর্তি গড়া থেকে ১৩ রান দূরে থাকতে আউট হয়ে যান শান্ত। প্রিয় রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে এলবিডব্লিউ হন ৮৭ রানে। এই ইনিংসে বাংলাদেশের ২৪০ রানের ইনিংসে সেটাই ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ। একটু মনে করিয়ে দিই, প্রথম ইনিংসেও বাংলাদেশের ৪১৩ রানের মধ্যে একমাত্র সেঞ্চুরির ইনিংসটা ছিল তারই।

শেষদিনে পাকিস্তানকে জয়ের জন্য ২৬৮ রানের যে টার্গেট দিলেন শান্ত সেখানে ঝুঁকি ছিল, চ্যালেঞ্জ ছিল। ৭৬ ওভারে ২৬৮ রান তোলা খুব অসম্ভব কোনো লক্ষ্য না। কিন্তু জিততে হলে ঝুঁকি তো নিতেই হবে। শান্ত সেই হিসেবি ঝুঁকিটা নিলেন এবং ম্যাচ শেষে হাসলেন জয়ের হাসি। ইনিংসের ডিক্লেয়ার প্রসঙ্গে ম্যাচ শেষে অধিনায়ক বলছিলেন, ‘এই কন্ডিশনে বোলিংয়ে ম্যাচ জেতানোর মতো বোলার আমাদের আছে, সেই বিশ্বাস আমার ছিল।’

নাহিদ রানা, তাসকিন, তাইজুল ও মেহেদি মিরাজ অধিনায়কের সেই আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন। বাংলাদেশের ১০৪ রানের বিশাল জয় স্পষ্ট জানাচ্ছে, পাকিস্তান কোনো প্রতিরোধই গড়তে পারেনি।

শেষদিনের বোলিংয়ে বাংলাদেশের জয়ের এই কাহিনি শুরু করেছিলেন তাসকিন। ইনিংসের প্রথম ওভারেই সাফল্য এনে দেন তিনি। পাকিস্তানি ওপেনার ইমাম-উল-হক প্রথম ওভারেই উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে ফিরলেন। লাঞ্চের পরের সেশনে প্রথম ইনিংসে পাকিস্তানের ওপেনার আজান আওয়াইসকে ফেরান মেহেদি মিরাজ। এই সেশনে পাকিস্তান অধিনায়ক নাহিদ রানাকে বিউটি বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন নাহিদ রানা। আর শেষ সেশনে পাকিস্তানের বাকি সাত উইকেটের চারটিই তার শিকার। ইনিংসের একমাত্র হাফসেঞ্চুরিয়ান আব্দুল্লাহ ফজলকে ৬৬ রানে এলবিডব্লিউ করে তাইজুল ইসলাম বাংলাদেশের জয়ের স্বপ্নকে আরো রঙিন করেন।

শেষ সেশনে উইকেটে স্পিনারদের বল কিছুটা গ্রিপ করছিল, ভালো টার্নও পাচ্ছিল। আনইভেন বাউন্সেরও দেখা মিলল। এই ধরনের উইকেটে প্রভাবী বোলিং কেমন করে করতে হয় সেটা বাংলাদেশের বেশ ভালোই জানা। সেই জানা কৌশলই প্রয়োগ করল বাংলাদেশ। আর এই কাজে বল হাতে এই সময়ে সবচেয়ে বেশি দক্ষতা দেখালেন নাহিদ রানা। তার বোলিং তোপে উড়ে গেল পাকিস্তানের শেষ ডিফেন্স!

সংক্ষিপ্ত স্কোর

বাংলাদেশ : প্রথম ইনিংস ৪১৩/১০ (শান্ত ১০০, মুমিনুল ৯১, মুশফিক ৭১, লিটন ৩৩, অতিরিক্ত ৩৭, আব্বাস ৫/৯২, আফ্রিদি ৩/১১৩) ও ২৪০/৯ ডিক্লেয়ার্ড (শান্ত ৮৭, মুমিনুল ৫৬, মেহেদি ২৪, হাসান আলী ৩/৫২, নোমান আলী ৩/৭৬)।

পাকিস্তান : প্রথম ইনিংস ৩৮৬/১০ (আজান ১০৩, ইমাম উল হক ৪৫, আব্দুল্লাহ ফজল ৬০, সালমান আগা ৫৮, রিজওয়ান ৫৯, মেহেদি মিরাজ ৫/১০২, তাসকিন ২/৭০, তাইজুল ২/৪৬) ও ১৬৩/১০ (আব্দুল্লাহ ফজল ৬৬, নাহিদ রানা ৫/৪০, তাসকিন ২/৪০, তাইজুল ২/২২)।

ফল : বাংলাদেশ ১০৪ রানে জয়ী।

ম্যাচসেরা : নাজমুল হোসেন শান্ত।

সিরিজ : বাংলাদেশ ১-০ তে এগিয়ে।

দ্বিতীয় টেস্ট : ১৬-২০ মে, সিলেটে।

মিরপুরের স্কোয়াড নিয়েই সিলেট মিশনে বাংলাদেশ

চেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই : মাসুদ

শান্ত-নাহিদে মুগ্ধ কামরান, ধুঁয়ে দিলেন শান মাসুদদের

টিভিতে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগসহ আরও যত খেলা

ব্যাট হাতে শান্ত এখন অশান্ত

আবারও মিরপুরে নাহিদের গতিঝড়

টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ে দুই ধাপ এগিয়ে ছয়ে বাংলাদেশ

যেখানে মুশফিকের সঙ্গে শীর্ষে শান্ত

ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ

সেরা খেলোয়াড়ের জন্য নতুন পুরস্কার আনছে বিসিবি