বিশ্বকাপ নিয়ন্ত্রণে ভারতের নগ্ন আধিপত্য, ক্রিকেটে রাজনীতির অপছায়া
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর খুব বেশিদিন বাকি নেই। এর মধ্যেই বাংলাদেশ-ভারত-আইসিসি ত্রিমুখী দ্বন্দ্বে ধোঁয়াটে চারপাশের পরিবেশ। মূলত বাংলাদেশের নিরাপত্তা শঙ্কা ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিশ্বক্রিকেটের উচ্চমহলে নিজেদের নগ্ন প্রভাবের ধোঁয়াটে পরিবেশ সৃষ্টি করেছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। বাংলাদেশের ম্যাচ ভেন্যু পরিবর্তনের দাবি প্রত্যাখ্যান, স্কটল্যান্ডকে বিকল্প দল হিসেবে প্রস্তুত রাখা এবং পাকিস্তানের সম্ভাব্য বয়কট—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ ও আইসিসির গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট নিছক শুধু ক্রিকেটকেন্দ্রিক নয়; এর গভীরে রয়েছে ভু-রাজনীতির প্রভাব ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। ফলে বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র কদিন আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখে। চোখ রাঙাচ্ছে অশনি সংকেত! আদৌই বিশ্বকাপ হবে কিনা- সেই আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) মধ্যকার একচ্ছত্র আধিপাত্যর বিষয় এবং তাদের বৈষয়িক সম্পর্ক ফাঁস করে দিয়েছেন সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক ও লেখক শারদা উগ্রা। দ্য ওয়্যারের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘দ্য ইন্টারভিউ’তে শারদা দ্বিচারিতার অভিযোগ এনে স্রেফ ধুইয়ে দিয়েছেন নিজ দেশের ক্রিকেট বোর্ড ও ক্রিকেটের বিশ্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে। তার ভাষ্য, ‘আজ ক্রিকেট মহলে প্রায় প্রকাশ্য সত্য—আইসিসি আসলে বিসিসিআইয়ের দুবাই অফিসে পরিণত হয়েছে। বিসিসিআই যা চায়, আইসিসি সেটাই করে। আমরা দেখেছি, আইসিসির নির্বাহী বোর্ডও ঠিক একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। তাই এই (বাংলাদেশকে বাদ দেওয়া) সিদ্ধান্ত এসেছে দেখে আমি মোটেও অবাক হইনি।’
কেন এ কথা বলেছেন শারদা উগ্রা? নিরপেক্ষভাবে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে যে কারো কাছেই টলমলে পানির মতো স্বচ্ছ হয়ে ওঠে বিষয়টি। নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানের আইপিএল থেকে বাদ পড়া নিয়ে ঘটনার সূত্রাপাত। যে ঘটনার শঙ্কায় নড়েচড়ে বসে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। যেখানে মোস্তাফিজকেই নিরাপত্তা দিতে পারছে না ভারত, সেখানে পুরো বাংলাদেশ দলকে নিরাপত্তা দেওয়ার প্রশ্ন তো অবান্তরই। উগ্রার মতে, মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়া মূলত কোনো ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং ‘অলিখিত, অনানুষ্ঠানিক নির্দেশে’ এমনটি করা হয়। তার ভাষ্য, ‘এখানে দুটি আলাদা বিষয় আছে। পুরো ব্যাপারটি শুরু হয় অনানুষ্ঠানিক, লিখিত নয়-এমন নির্দেশের মাধ্যমে, যাতে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া হয়। বড় অঙ্কের চুক্তিতে তিনি আইপিএলে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে বাদ দেওয়ার কে এই নির্দেশ দিল, কোথা থেকে এলো—এর কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা নেই।’
উগ্রার ধারণা, এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। যার মাধ্যমে ফায়দা তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। শীর্ষ এই ক্রীড়া সাংবাদিক আরো বলেন, ‘বিসিসিআই ও শাসক ব্যবস্থার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণেই আমি মনে করি নির্দেশটা সেখান থেকেই এসেছে। ভারত-বাংলাদেশ রাজনৈতিক সম্পর্ক ইদানীং উত্তপ্ত। আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন আসছে; সব মিলিয়ে এটা ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত নয়, পুরোপুরি রাজনৈতিক। মোস্তাফিজ খেললে হয়তো কোনো সমস্যাই হতো না। কিন্তু তাকে সরিয়ে দিয়ে বিষয়টিকে রাজনৈতিক বানানো হয়েছে।’
নিরাপত্তা শঙ্কায় ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় খেলতে চেয়েছিল বাংলাদেশ, যেমনটি ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের ক্ষেত্রে প্রায়ই করা হয়। কিন্তু আইসিসি সে দাবি নাকচ করে দেয়, যা কার্যত বাংলাদেশকে কোণঠাসা করার পরিকল্পিত নীলনকশা। বাংলাদেশের ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় সরানোর যৌক্তিক ও নিরাপত্তাভিত্তিক দাবি এক কথায় উড়িয়ে দিয়েছে আইসিসি। অথচ একই সংস্থা ভারত ও পাকিস্তানের জন্য বছরের পর বছর ‘হাইব্রিড মডেল’ চালু রেখেছে। উগ্রাও আইসিসির এই সিদ্ধান্তকে ‘দ্বিচারিতা’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার প্রশ্ন-ভারত ও পাকিস্তানের জন্য যে ‘হাইব্রিড মডেল’ সম্ভব, তা বাংলাদেশের জন্য কেন নয়? উত্তরটাও নিজেই দিয়েছেন, ‘বিসিসিআইয়ের প্রভাব, আইসিসিতে তাদের আর্থিক শক্তি এবং অন্য বোর্ডগুলোর নতজানু আচরণ-সব মিলিয়েই এই সংকট তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ আপত্তি তুললে তা আমলে নেওয়া হয়নি, অথচ ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে নিয়ম বারবার বদলানো হয়। এটা খুবই দুর্বল ও ভণ্ডামিপূর্ণ যুক্তি।’
ভারতের দাদাগিরির কারণে বিশ্বকাপের গ্রহণযোগ্যতা ইতোমধ্যেই তলানিতে পৌঁছেছে বলে উগ্রার দাবি। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ইস্যুতে এই পুরো সংকট ক্রিকেটকে আবারও রাজনৈতিক লড়াইয়ের মঞ্চে দাঁড় করিয়েছে। উগ্রার মতে, ক্রিকেট আর ‘শেয়ার্ড কালচারাল প্ল্যাটফর্ম’ নেই; বরং এটি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক অবস্থান প্রদর্শনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তাতে আইসিসির ভাবমূর্তি ও ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে! তাদের ক্ষতিটা হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি। অলিম্পিকে ক্রিকেট অন্তর্ভুক্তির প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মহলে আইসিসির শাসনব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। একসময় নিরপেক্ষ অভিভাবক হিসেবে পরিচিত সংস্থাটি এখন ক্ষমতাধর বোর্ডের প্রভাবমুক্ত থাকতে পারছে কি না—সে প্রশ্নই এখন মুখ্য। একসময় ক্রিকেটের অভিভাবক হিসেবে পরিচিত আইসিসি আজ প্রশ্নবিদ্ধ, দুর্বল ও পক্ষপাতদুষ্ট। আর এই পতনের কেন্দ্রে রয়েছে একটিই নাম-ভারতীয় আধিপত্য।