ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রেখেছে স্পেন। ১৬ বছর পর আবার বিশ্বজয়ের দোড়গোড়ায় থাকা স্প্যানিশ দলটির এ সাফল্যের নেপথ্য কারিগর তাদের প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। সেমিফাইনালের মহারণ জয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে তার কণ্ঠে ঝরে দলের খেলোয়াড়দের প্রতি অগাধ আস্থা, আত্মবিশ্বাস এবং ফুটবল নিয়ে তার নিজস্ব দর্শনের কথা।
টুর্নামেন্ট শুরুর আগে কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্সকেই ধরা হচ্ছিল হট ফেভারিট। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে ফরাসিদের আক্রমণভাগকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করে জয় ছিনিয়ে নেয় স্পেন। ম্যাচ শেষে দে লা ফুয়েন্তে জানান, ম্যাচ শুরুর আগে শিষ্যদের মনে তিনি আত্মবিশ্বাস বুনে দিয়েছিলেন, ‘আমার বার্তা ছিল-আমরা বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি দলের বিরুদ্ধে খেলতে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু তারাও খেলতে যাচ্ছে বিশ্বের সেরা দলটির বিপক্ষে।’
দলের এই অদম্য যাত্রার পেছনে কোনো একক তারকার দাপট নয়; বরং যৌথ প্রচেষ্টা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে মূল চাবিকাঠি হিসেবে দেখছেন স্প্যানিশ কোচ। তার মতে, দলে কোনো ‘ইগো’ বা অহংকারের জায়গা নেই। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আপনার সহযাত্রী কারা, তা সঠিকভাবে বেছে নেওয়া। সহযাত্রী নির্বাচনে ভুল করলে শেষটা ভালো হয় না। আমাদের এই দলে খেলোয়াড় থেকে শুরু করে স্টাফÑসবাই সাধারণ ও উদার মনের মানুষ। এখানে ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে দলের স্বার্থ সবার আগে।’
খেলোয়াড়দের একাগ্রতার প্রশংসা করে তিনি জানান, যারা মাঠে নামার সুযোগ পাননি, ম্যাচ শেষে তারাও স্বেচ্ছায় অনুশীলনে ঘাম ঝরিয়েছেন। এটাই এই দলের আসল চরিত্র।
২০১০ সালে ইকার ক্যাসিয়াসের নেতৃত্বে স্পেন তাদের প্রথম বিশ্বকাপ জিতেছিল। দীর্ঘ ১৬ বছর পর দে লা ফুয়েন্তে তার এই দলের মাঝে সেই ঐতিহাসিক দলের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমি ড্রেসিংরুমে আনন্দিত মুখগুলো দেখতে পাচ্ছি এবং পুরো দেশ আমাদের সঙ্গে আছে। আমরা ২০১০ সালের সেই সোনালি স্পিরিট আবার ফিরিয়ে এনেছি।’ ইউরো ২০২৪ জয়ের পর টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থাকার ইতালিয়ান রেকর্ড স্পর্শ করলেও দে লা ফুয়েন্তে বিশ্বাস করেন, তার দলের উন্নতির পরিধি সীমাহীন।
ফাইনালের মঞ্চ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দে লা ফুয়েন্তে জানান, ফাইনালে আর্জেন্টিনা দলকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পেতে চান, যার মূল কারণ আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনির সঙ্গে তার ব্যক্তিগত গভীর বন্ধুত্ব। পাশাপাশি অন্য সেমিফাইনালিস্ট ইংল্যান্ডের প্রশংসাও শোনা যায় তার কণ্ঠে।
সাধারণত ফাইনাল ম্যাচ মানেই এক স্নায়ুক্ষয়ী চাপ, কিন্তু দে লা ফুয়েন্তের দর্শন একেবারেই আলাদা। ট্রফি জয়ের চাপের চেয়ে ফুটবলকে উপভোগ করাকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন তিনি, ‘আমি এই তত্ত্বে বিশ্বাস করি না যে, ফাইনাল ম্যাচ শুধুই জেতার জন্য। ফাইনাল খেলা তো উপভোগ করার জন্য। সামনে যা অপেক্ষা করছে, তা হতে যাচ্ছে আমাদের এই দীর্ঘ যাত্রার কেকের ওপর সুস্বাদু চেরি ফলের মতো।’
একটি নিখুঁত প্রক্রিয়া এবং ভালোবাসার হাত ধরে স্পেন আজ বিশ্বমঞ্চের ফাইনালে। দে লা ফুয়েন্তের এই সাধারণ ও বিনয়ী দলটির সামনে এখন শুধু আরেকটি জয়ের দূরত্ব, যা তাদের মাথায় তুলে দিতে পারে দ্বিতীয় বিশ্বসেরা খেতাবের মুকুট।