হোম > খেলা > ফুটবল বিশ্বকাপ

গোলে ত্যাগ আর ভালোবাসার ঋণ শোধ মেরিনোর

নজরুল ইসলাম

টানটান উত্তেজনার ম্যাচ তখন অন্তিম লগ্নে। নকআউট পর্বের এই শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ে স্পেন ও প্রতিপক্ষ পর্তুগাল কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছিল না। ঠিক তখনই যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে প্রতিপক্ষের কড়া ট্যাকলে ফাউলের শিকার হলেন স্প্যানিশ মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনো। তবে মাঠে পড়ে থাকার মতো সময় তখন ছিল না। অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় উঠে দাঁড়িয়ে মেরিনো নিজেই ফ্রি-কিক নিলেন, সতীর্থকে পাস বাড়িয়ে দিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে বক্সের ভেতর পজিশন নিলেন। মাপা পাসটি যখন পুনরায় তার পায়ে ফিরে এলো, চোখের পলকে এক দর্শনীয় স্পর্শে বল জালে জড়িয়ে দিলেন। গোলশূন্য ডেডলক ভেঙে স্পেন এগিয়ে গেল ১-০ গোলে, গ্যালারিতে তখন উৎসবের সুনামি।
বল জালে জড়ানোর পর মেরিনো সোজা দৌড়ে গেলেন মাঠের এক কোণে, যেখানে দাঁড়িয়ে আছে কর্নার ফ্ল্যাগ। নিজের আবেগ আর উল্লাসকে বাঁধভাঙা রূপ দিয়ে মুঠো শক্ত করলেন, মাথা পেছনে হেলিয়ে আকাশের পানে তাকিয়ে সিংহের মতো গর্জে উঠলেন। ডালাস স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজারো দর্শকের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারত—এ কি শুধুই কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করার আনন্দ? আপাতদৃষ্টিতে তা মনে হলেও, এই গোলের পেছনে লুকিয়ে ছিল তিন দশকের এক পারিবারিক আবেগ ও ফুটবলের চিরন্তন এক উত্তরাধিকারের গল্প।

ফিরে যাওয়া যাক ১৯৯১ সালের নভেম্বরের এক শীতের রাতে। জার্মানির স্টুটগার্টে ওসাসুনার হয়ে উয়েফা কাপের ম্যাচে গোল করেছিলেন মিকেলের বাবা মিগুয়েল মেরিনো। গোল করার পর মিগুয়েল ঠিক একইভাবে কর্নার ফ্ল্যাগের চারপাশে নেচে এক ঐতিহাসিক উদ্‌যাপন করেছিলেন। তখনো মিকেলের জন্ম হয়নি, তিনি পৃথিবীতে আসেন ১৯৯৬ সালে। বহু বছর পর ২০২৪ ইউরোতে জার্মানির বিপক্ষে স্টুটগার্টের সেই একই মাঠে দাঁড়িয়ে বাবার মতোই গোল করে সেই একই উদ্‌যাপন উপহার দিয়েছিলেন মিকেল। ম্যাচ শেষে বাবা মজা করে বলেছিলেন, ‘ও তো আমার বিশেষত্ব কেড়ে নিল!’ কিন্তু এবার ডালাসের মাঠে সেই উদ্‌যাপনের গভীরতা যেন আরো এক ধাপ বেড়ে গেল।
মিকেল মেরিনো এখন নিজেও একজন বাবা। টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে তার ঘর আলো করে এসেছে পুত্রসন্তান মার্কো। কিন্তু পেশাদার ফুটবলের কঠোর নিয়মে সন্তানকে ঠিকঠাক কাছে পাওয়ার আগেই তাকে প্রথমে আর্সেনাল ও পরে জাতীয় দলের ক্যাম্পে যোগ দিতে হয়। ছেলের জীবনের প্রথম দুই মাস তিনি পরিবার থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে একা কাটিয়েছেন। শুধু তাই নয়, এই টুর্নামেন্টে আসার পথটাও তার জন্য ছিল রীতিমতো এক অগ্নিপরীক্ষা। জানুয়ারির শেষে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে ম্যাচে গুরুতর চোট পেয়ে ফেব্রুয়ারিতে অস্ত্রোপচারের টেবিলে বসতে হয়েছিল তাকে। দীর্ঘ দুই মাস ক্রাচে ভর দিয়ে চলা মেরিনোর দলে থাকা নিয়েই তৈরি হয়েছিল চরম অনিশ্চয়তা!
সেই কঠিন দিনগুলোতে তার ছায়াসঙ্গী ছিলেন আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী, যিনি নিজে কষ্ট করে মেরিনোকে সিঁড়ি ভাঙতে সাহায্য করতেন। মেরিনো তাই এই গোলের মাধ্যমে মাঠের ভেতর যেন সেই সমস্ত কষ্টের, ত্যাগের ও ভালোবাসার ঋণ শোধ করলেন। ম্যাচ শেষে মেরিনোর আবেগঘন কণ্ঠেই ফুটে উঠল সেই অনুভূতি, ‘এমন একটি বিশেষ মুহূর্তে জীবনের সব ফেলে আসা দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ইনজুরির অন্ধকার সময়, সদ্যোজাত সন্তানকে ছেড়ে হাজার মাইল দূরে থাকার কষ্ট—সবকিছুই আজ মাঠে আমার শক্তির উৎস হয়েছিল।’
ফুটবল মাঠে সাধারণত ছেলেরা বাবাদের অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণ করে, কিন্তু মেরিনো পরিবারের গল্পটা ভিন্ন—এখানে বাবা কোনো অসমাপ্ত স্বপ্ন রেখে যাননি, রেখে গিয়েছিলেন এক টুকরো সুন্দর স্মৃতি। ছেলে মিকেল সেই স্মৃতিকে আরো বড় ক্যানভাসে মেলে ধরলেন। কোনো একদিন যখন ছোট্ট মার্কো তার দাদা আর বাবার এই একই রকমের উদযাপনের ভিডিও দেখবে, তখন সে বুঝতে পারবে—ফুটবলে কিছু কিছু উদযাপন কেবল তিনটি পয়েন্টের জন্য নয়, তা আসলে রক্তের সুতোয় বোনা এক গৌরবময় উত্তরাধিকার।

সিমনের ৬০৯ মিনিটের ‘অভেদ্য’ দুর্গ

মিসরকে কাঁদিয়ে কোয়ার্টারে আর্জেন্টিনা

উন্মোচন হলো ফাইনালের সোনালি ‘ট্রিওন্ডা’

'পায়ে আবার আনন্দ খুঁজে নাও, খেলা চালিয়ে যাও'

পরিসংখ্যানে রোনালদোর বিশ্বমঞ্চের পারফরম্যান্স

অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে মিসরকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা

‘জীবনে ন্যায়বিচারও আছে’—বালোগান ইস্যুতে খোঁচা রাসকিনের

বিশ্বকাপে ব্যর্থতায় পর্তুগালের দায়িত্ব ছাড়লেন মার্টিনেজ

রোনালদোর কাছে ইউরোই বিশ্বকাপ জয়ের সমান

আর্জেন্টিনার বাধা হতে পারবে কি মিশর?