আধুনিক ফুটবলে আবেগের পাশাপাশি আরেকটি শক্তিশালী ভাষা তৈরি হয়েছে আর সেটি হলো অর্থনীতি। ২০২৬ বিশ্বকাপ মঞ্চে যখন ৪৮টি দেশ শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে নামবে, তখন মাঠে নামবে কয়েক বিলিয়ন ইউরো মূল্যের এক চলমান সম্পদও। এ বিশ্বকাপে এমন অনেক ফুটবলার আছেন, যাদের বাজারমূল্য কোনো কোনো দেশের বার্ষিক বাজেটের চেয়েও বেশি। তাদের পায়ে শুধু বল নয়, ঘুরছে ক্লাব মালিকদের বিনিয়োগ, স্পনসরদের স্বপ্ন আর বিশ্বফুটবলের অর্থনীতির বিশাল চাকা
বাজারমূল্যের নতুন রাজারা
এক সময় ট্রান্সফার বাজার মানেই ছিল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি কিংবা নেইমার। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন ফুটবলের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তরুণ প্রতিভারা। বিশ্বকাপের সবচেয়ে দামি একাদশ সাজাতে গেলে সামনে আসবে কয়েকটি পরিচিত নাম—জুড বেলিংহ্যাম, লামিনে ইয়ামাল, কিলিয়ান এমবাপ্পে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, জামাল মুসিয়ালা, ফ্লোরিয়ান ভিরৎস কিংবা বুকায়ো সাকার মতো তারকারা। তাদের বাজারমূল্য নির্ধারণ হয় শুধু বর্তমান পারফরম্যান্সে নয়; বয়স, সম্ভাবনা, বাণিজ্যিক আকর্ষণ।
সবাইকে টপকে রাজা ইয়ামাল
আসন্ন বিশ্বকাপের আগে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড় হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন স্পেনের উদীয়মান তারকা লামিনে ইয়ামাল। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া গবেষণা কেন্দ্র (সিআইইএস) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে ইয়ামালের বাজারমূল্য প্রায় ৩৪৩ মিলিয়ন ইউরো, যা তাকে বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলারদের তালিকার শীর্ষে নিয়ে গেছে। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন ম্যানচেস্টার সিটির নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার আর্লিং হ্যালান্ড। তার বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫৫ মিলিয়ন ইউরো। অন্যদিকে এক সময় শীর্ষস্থান দখল করে থাকা ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২০১ মিলিয়ন ইউরো।
বিশ্বকাপ যেন শোরুম
বিশ্বকাপ শুধু ট্রফি জয়ের মঞ্চ নয়, এটি ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনীও। ২০০৬ বিশ্বকাপে ফাবিও কানাভারো, ২০১৪ সালে হামেস রদ্রিগেজ, ২০২২ সালে এনজো ফার্নান্দেজ—বিশ্বকাপ পারফরম্যান্সের পর তাদের বাজারমূল্য আকাশছোঁয়া হয়েছিল। ২০২৬ বিশ্বকাপেও একই দৃশ্য দেখা যেতে পারে। কোনো অখ্যাত তরুণ হয়তো কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ১০০ মিলিয়ন ইউরোর ফুটবলার হয়ে উঠবেন।
অর্থের বাইরে আরেক গল্প
তবুও বাজারমূল্য সবকিছু নয়। বিশ্বকাপের ইতিহাস বলে, সবচেয়ে দামি দল সব সময় চ্যাম্পিয়ন হয় না। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনা ট্রফি জিতেছিল দলগত শক্তিতে। ২০১৮ সালে ফ্রান্স জিতেছিল সংগঠিত ফুটবলে। ২০১০ সালে স্পেনের জয় ছিল দর্শনের জয়। অর্থাৎ, অর্থ ফুটবলকে শক্তিশালী করে; কিন্তু শিরোপা জিতিয়ে দেয় না। ২০২৬ বিশ্বকাপে কোটি কোটি দর্শক গোল দেখবে, নাটক দেখবে, ইতিহাসের জন্ম দেখবে; কিন্তু সেই গল্পের আড়ালে চলবে আরেক অদৃশ্য লড়াইÑবাজারমূল্যের যুদ্ধ। কারণ, আধুনিক ফুটবলে একজন খেলোয়াড় কেবল একজন ফুটবলার নন। তিনি একসঙ্গে ব্র্যান্ড, বিনিয়োগ, সম্পদ এবং স্বপ্ন। আর বিশ্বকাপ? সেটাই সেই মহামঞ্চ, যেখানে কখনো শতকোটি ইউরোর তারকা আলো ছড়ান, আবার কখনো এক অমূল্য মুহূর্ত সব হিসাব-নিকাশ উল্টে দেয়।